১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন: গণতন্ত্রের পতনের ইতিহাস

0
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন: গণতন্ত্রের পতনের ইতিহাস
সংগৃহীত ছবি

শৈবাল রহমান: ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার মাত্র ১১ বছরের মাথায়, ১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর দেশটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসে। প্রেসিডেন্ট মেজর জেনারেল ইস্কান্দার মির্জা সংবিধান বাতিল, জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ ভেঙে দেওয়া এবং সামরিক আইন জারির ঘোষণা দেন। নিষিদ্ধ করা হয় রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম। গ্রেপ্তার হন বহু রাজনীতিক। এর মধ্য দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছিল, তা কার্যত স্তব্ধ হয়ে যায়।

কিন্তু সামরিক শাসন জারির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রাখার যে কৌশল মির্জা নিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেটিই তাঁর পতনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। মাত্র ২০ দিনের মাথায়, ২৭ অক্টোবর, সেনাপ্রধান জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ুব খান তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পাকিস্তানের ইতিহাসে এভাবেই সূচনা হয় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক কর্তৃত্বের, যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়ে দেশটির গণতন্ত্র, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালির অধিকার আদায়ের আন্দোলনে।

সংবিধান বাতিল, গণতন্ত্রের পথ রুদ্ধ

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর দীর্ঘ রাজনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্য দিয়ে ১৯৫৬ সালে দেশটির প্রথম সংবিধান প্রণীত হয়। ব্রিটিশ ওয়েস্টমিনস্টার ধারার আদলে তৈরি এই সংবিধানে সংসদীয় সরকারব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। ইস্কান্দার মির্জাও এই সংবিধানের অধীনে পাকিস্তানের প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

১৯৫৯ সালের শুরুর দিকে দেশটিতে প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। সেই নির্বাচন সংসদীয় গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারত। কিন্তু রাজনৈতিক অস্থিরতা, ক্ষমতাকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব এবং নির্বাচনের সম্ভাব্য ফল নিয়ে শঙ্কার মধ্যে মির্জা ভিন্ন পথ বেছে নেন।

১৯৫৮ সালের ৭ অক্টোবর তিনি সংবিধান বাতিল করে সামরিক আইন জারি করেন। একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকার এবং পরিষদগুলো বিলুপ্ত করা হয়। জেনারেল আইয়ুব খানকে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক নিয়োগ করা হয়। ফলে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।

মির্জার এই পদক্ষেপের পেছনে আইয়ুব খানের সহযোগিতা ছিল। সেনাপ্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আইয়ুব প্রতিরক্ষামন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছিলেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় বেসামরিক রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরিবর্তে সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা তাঁদের দুজনের ক্ষমতার সমীকরণকে এক জায়গায় নিয়ে আসে।

ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মির্জার পতন

সামরিক আইন জারির পর ইস্কান্দার মির্জা নিজেকে ক্ষমতার কেন্দ্রে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। কিন্তু প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে আইয়ুব খানের অবস্থান ক্রমেই শক্তিশালী হতে থাকে। একই রাষ্ট্রে দুই ক্ষমতাকেন্দ্রের সহাবস্থান বেশিদিন স্থায়ী হয়নি।

২৭ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে সামরিক কর্মকর্তারা করাচিতে প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবনে গিয়ে মির্জাকে পদত্যাগে বাধ্য করেন। এরপর তাঁকে দেশত্যাগে বাধ্য করা হয়। প্রথমে কোয়েটায় নেওয়া হলেও পরে স্ত্রী নাহিদ মির্জাসহ তাঁকে লন্ডনে নির্বাসনে পাঠানো হয়। জীবনের বাকি সময় তিনি বিদেশেই কাটান; আর পাকিস্তানে ফিরতে পারেননি।

মির্জাকে সরিয়ে আইয়ুব খান প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একই সঙ্গে তাঁর হাতে কেন্দ্রীভূত হয় রাষ্ট্রপতি ও সামরিক শাসকের ক্ষমতা। নতুন মন্ত্রিসভায় সামরিক কর্মকর্তাদের প্রাধান্য থাকলেও কয়েকজন বেসামরিক ব্যক্তিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তরুণ রাজনীতিক জুলফিকার আলী ভুট্টো, যিনি পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

মির্জার পতন প্রমাণ করে, সামরিক বাহিনীর সহায়তায় ক্ষমতা সংহত করার চেষ্টা করলেও সেই বাহিনীর ওপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়নি। বরং যে সামরিক শক্তিকে তিনি নিজের ক্ষমতা রক্ষার হাতিয়ার করেছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই শক্তিই তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে।

বিচার বিভাগের বিতর্কিত ভূমিকা

আইয়ুব খানের ক্ষমতা দখলের পর পাকিস্তানের বিচার বিভাগও বিতর্কের কেন্দ্রে আসে। প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ মুনিরের নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগ ‘প্রয়োজনীয়তার তত্ত্ব’ বা ডকট্রিন অব নেসেসিটি প্রয়োগের মাধ্যমে সামরিক শাসনকে আইনি বৈধতা দেওয়ার পথ তৈরি করে।

এর আগে ১৯৫৪ সালে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদ ভেঙে দিলে স্পিকার মৌলভি তমিজউদ্দিন খান আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু আদালত তাঁর চ্যালেঞ্জ খারিজ করে দেয়। পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসনের বৈধতা প্রশ্নেও একই ধরনের বিচারিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করা হয়।

এই অবস্থান পাকিস্তানের সাংবিধানিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মতো রাজনৈতিক পদক্ষেপকে বিচারিক স্বীকৃতি দেওয়ার ফলে সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়ে।

‘উন্নয়নের দশক’ ও নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র

ক্ষমতায় বসে আইয়ুব খান পাকিস্তানের রাষ্ট্রব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনেন। ১৯৫৯ সালে ইলেকটিভ বডিজ ডিসকোয়ালিফিকেশন অর্ডিন্যান্স বা ইবিডিও জারির মাধ্যমে বহু রাজনীতিককে নির্বাচনী রাজনীতি থেকে দূরে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে প্রশাসন ও সামরিক বাহিনীর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা তাঁর শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে ওঠে।

১৯৬২ সালে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পর সামরিক আইন প্রত্যাহার করা হলেও পূর্ণাঙ্গ সংসদীয় গণতন্ত্র ফিরে আসেনি। নতুন সংবিধানে প্রেসিডেন্টের হাতে ব্যাপক নির্বাহী ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়। সর্বজনীন ভোটাধিকারের পরিবর্তে ‘বেসিক ডেমোক্র্যাসি’ নামে পরিচিত সীমিত নির্বাচকমণ্ডলীর মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়।

প্রায় ৮০ হাজার নির্বাচকমণ্ডলীর সদস্য—যাঁরা ‘বেসিক ডেমোক্র্যাটস’ নামে পরিচিত ছিলেন—প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতেন। ফলে সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনের সুযোগ সীমিত ছিল। জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ থাকলেও নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কার্যকর ভূমিকা বাধাগ্রস্ত হয়।

আইয়ুবের সমর্থকেরা তাঁর শাসনকালকে ‘উন্নয়নের দশক’ হিসেবে তুলে ধরতেন। কিন্তু অর্থনৈতিক অগ্রগতির প্রচারণার পাশাপাশি রাজনৈতিক অধিকার, ক্ষমতার জবাবদিহি এবং পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্য নিয়ে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। মুসলিম লীগকে বিভক্ত করে কনভেনশন মুসলিম লীগ গঠন এবং দলীয় রাজনীতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে আইয়ুব নিজের সমর্থকগোষ্ঠীও তৈরি করেন।

১৯৬৫ সালে ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ এবং পরবর্তী তাসখন্দ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো একসময় আইয়ুব সরকারের ঘনিষ্ঠ সহযোগী থাকলেও পরে তাঁর বিরোধিতায় নামেন। এতে আইয়ুবের রাজনৈতিক অবস্থান আরও চাপে পড়ে।

পূর্ব পাকিস্তানে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান

আইয়ুব খানের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের অভিযোগ তীব্র হয়ে ওঠে। ভাষা আন্দোলনের চেতনা, স্বায়ত্তশাসনের দাবি, অর্থনৈতিক বঞ্চনা এবং কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ববাদী আচরণ বাঙালির মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়।

এই পরিস্থিতিতে শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব পাকিস্তানের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক নেতায় পরিণত হন। বাঙালির স্বায়ত্তশাসনের দাবিকে দমন করতে আইয়ুব সরকার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দায়ের করে। মামলাটিকে শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান থামানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হয়।

কিন্তু এর ফল হয় উল্টো। আগরতলা মামলাকে কেন্দ্র করে পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক গণপ্রতিবাদ গড়ে ওঠে। শেখ মুজিবের প্রতি জনসমর্থন বাড়তে থাকে এবং স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। যে মামলা দিয়ে বাঙালি জাতীয়তাবাদী নেতৃত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়েছিল, সেটিই আইয়ুববিরোধী আন্দোলনকে শক্তিশালী করার অন্যতম অনুঘটকে পরিণত হয়।

১৯৬৯ সালের শুরুতে আইয়ুব সরকার গভীর রাজনৈতিক সংকটে পড়ে। গণআন্দোলনের চাপে আগরত