আবাসন খাতের সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি

0
আবাসন খাতের সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি

শৈবাল রহমান : একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি শুধু বড় শিল্পকারখানা কিংবা রপ্তানি খাতের ওপর নির্ভর করে না। আবাসন শিল্পসহ বিভিন্ন সহযোগী খাতের গতিশীলতার ওপরও নির্ভর করে সামগ্রিক অর্থনীতির সুস্থতা। আবাসন খাতে বিনিয়োগ, নির্মাণকাজ ও ফ্ল্যাট বিক্রির গতি কমে গেলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে রড, সিমেন্ট, সিরামিক, রং, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, বৈদ্যুতিক সরঞ্জামসহ অসংখ্য শিল্পে। ঝুঁকিতে পড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা। তাই আবাসন খাতের সংকট মোকাবিলা এবং বিনিয়োগ ও নির্মাণকাজের স্বাভাবিক গতি ফিরিয়ে আনতে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

বাসস্থান মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা। নিজের সামর্থ্যের মধ্যে একটি স্থায়ী আবাস গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেন প্রায় সবাই। মানুষের এই চাহিদা পূরণে আবাসন প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি, অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা, ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার চাপ এবং বিনিয়োগসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা আবাসন খাতের কার্যক্রমকে বাধাগ্রস্ত করলে তার নেতিবাচক প্রভাব শুধু এ ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকে না; ছড়িয়ে পড়ে অর্থনীতির বিস্তৃত পরিসরে।

আবাসন শুধু ভবন নির্মাণের ব্যবসা নয়

রিয়েল এস্টেট বা আবাসন খাতকে কেবল ভবন নির্মাণ কিংবা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ব্যবসা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, পরিবহন, বিপণন, প্রকৌশলসেবা, স্থাপত্য, অভ্যন্তরীণ সজ্জা এবং নানা ধরনের কারিগরি ও পেশাগত কর্মকাণ্ড। ফলে এ খাতের সংকট তৈরি হলে তার প্রভাব পড়ে বহু শিল্প ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের ওপর।

খাতসংশ্লিষ্টদের দাবি, আবাসন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে আড়াই শতাধিক সহযোগী ও উপশিল্প যুক্ত রয়েছে। এসব শিল্পের মধ্যে রড, সিমেন্ট, ইট, পাথর, বালি, সিরামিক ও টাইলস উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে রং, কাচ, অ্যালুমিনিয়াম, বৈদ্যুতিক তার, সুইচ-সকেট, আলোকসজ্জার সরঞ্জাম, পাইপ ও স্যানিটারি ফিটিংস উৎপাদন এবং সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান।

আবাসন বাজারে মন্দা দেখা দিলে কিংবা ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট বিক্রি কমে গেলে নতুন নির্মাণ প্রকল্পের চাহিদা হ্রাস পায়। এর প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট শিল্পের উৎপাদন ও বিক্রিতে। দীর্ঘদিন এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে উৎপাদন কমানো, ব্যবসা সংকুচিত করা এবং নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রাখার মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন উদ্যোক্তারা। এতে একদিকে শিল্পের সম্প্রসারণ বাধাগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেও স্থবিরতার আশঙ্কা বাড়ে।

কর্মসংস্থান ও জীবিকার ওপর বাড়তি চাপ

নির্মাণ ও আবাসন খাত দেশের কর্মসংস্থাননির্ভর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোর একটি। প্রকৌশলী, স্থপতি, প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও নির্মাণকাজের তদারককারী থেকে শুরু করে রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রি, ইলেকট্রিশিয়ান এবং সাধারণ শ্রমিক—বিভিন্ন পেশার মানুষ এ খাতের সঙ্গে যুক্ত।

এ ছাড়া নির্মাণসামগ্রী উৎপাদন, পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিপণন ও সরবরাহব্যবস্থায়ও বহু মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। ফলে আবাসন খাতে দীর্ঘস্থায়ী মন্দা দেখা দিলে শুধু নির্মাণশ্রমিক নয়, সংশ্লিষ্ট শিল্প ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে কর্মরত মানুষের আয়ও অনিশ্চিত হয়ে পড়তে পারে।

এর প্রভাব পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়, স্থানীয় বাজারে পণ্যের চাহিদা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসার ওপরও পড়তে পারে। তাই আবাসন খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা শুধু উদ্যোক্তাদের স্বার্থ রক্ষার বিষয় নয়; এটি কর্মসংস্থান, শ্রমজীবী মানুষের জীবিকা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

সংকট উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ

বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ এবং আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নে নীতিগত স্থিতিশীলতা, সহজ অর্থায়ন ও নির্মাণ ব্যয় নিয়ন্ত্রণকে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাঁদের মতে, বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন।

প্রথমত, দীর্ঘমেয়াদি ও বিনিয়োগবান্ধব নীতি প্রণয়ন করতে হবে। নীতিগত অনিশ্চয়তা কমিয়ে অনুমোদনপ্রক্রিয়া সহজ, স্বচ্ছ ও সময়সীমাবদ্ধ করা গেলে উদ্যোক্তাদের আস্থা বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আইন ও বিধিবিধানের ধারাবাহিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

দ্বিতীয়ত, সহজ শর্তে গৃহঋণ ও প্রকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা বাড়াতে হবে। উচ্চ সুদ ও কঠিন ঋণশর্ত ক্রেতাদের ফ্ল্যাট কেনার সক্ষমতা সীমিত করতে পারে। অন্যদিকে নির্মাণ প্রকল্পের অর্থায়ন সংকুচিত হলে নতুন প্রকল্প গ্রহণও বাধাগ্রস্ত হয়। তাই ঋণগ্রহীতার পরিশোধক্ষমতা বিবেচনায় সাশ্রয়ী গৃহঋণ এবং টেকসই প্রকল্প অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ প্রয়োজন।

তৃতীয়ত, পরিকল্পিত আবাসন উন্নয়নে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদার করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) আওতায় মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব। তবে এসব প্রকল্পে জমির ব্যবহার, অবকাঠামো, পরিবেশ, স্বচ্ছতা এবং প্রকৃত উপকারভোগী নির্বাচনকে গুরুত্ব দিতে হবে।

চতুর্থত, নির্মাণসামগ্রীর বাজার স্থিতিশীল রাখা জরুরি। রড, সিমেন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এর প্রভাব পড়ে ফ্ল্যাটের দামে এবং শেষ পর্যন্ত ক্রেতার ওপর। তাই বাজার তদারকি, প্রতিযোগিতামূলক সরবরাহব্যবস্থা এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।

পঞ্চমত, সাশ্রয়ী ও পরিকল্পিত আবাসনের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। শুধু উচ্চমূল্যের ফ্ল্যাট নির্মাণ বাড়ালেই আবাসন সমস্যার সমাধান হবে না। মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ আবাসন সরবরাহ, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সমন্বিত উন্নয়নও জরুরি।

নীতিনির্ধারকদের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

আবাসন খাতের সংকট নিরসনে সরকার, নীতিনির্ধারক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোক্তাদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। তবে নীতিসহায়তা যেন কেবল ব্যবসায়িক স্বার্থে সীমাবদ্ধ না থাকে, তা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। আবাসন খাতের বিকাশের পাশাপাশি ক্রেতার স্বার্থ, নির্মাণের গুণগত মান, পরিবেশগত ভারসাম্য এবং নগর পরিকল্পনার বিষয়গুলো সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

নীতিনির্ধারকদের বিবেচনা করতে হবে—কীভাবে নির্মাণ ব্যয় ও অর্থায়নের চাপ কমিয়ে বিনিয়োগ বাড়ানো যায়, কীভাবে মধ্যবিত্ত ও সীমিত আয়ের মানুষের জন্য আবাসনকে আরও সাশ্রয়ী করা যায় এবং কীভাবে এ খাতের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিক ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জীবিকা সুরক্ষিত রাখা যায়।

আবাসন শিল্পের সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর অভিঘাত বহুমাত্রিক হতে পারে। বিপরীতে, পরিকল্পিত বিনিয়োগ, কার্যকর নীতিসহায়তা ও সুশৃঙ্খল বাজারব্যবস্থা এ খাতের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে।

কারণ, গতিশীল আবাসন খাত শুধু মানুষের বাসস্থানের চাহিদা পূরণ করে না; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য শিল্পের উৎপাদন, বিপুল মানুষের কর্মসংস্থান এবং জাতীয় অর্থনীতির সামগ্রিক অগ্রগতি। তাই আবাসন খাতের সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই।