জান্নাতুলের মৃত্যু: মেয়েসন্তান নয়, বদলাতে হবে অনিরাপদ সমাজ

যে প্রশ্ন রেখে গেল সমাজের সামনে

0
জান্নাতুলের মৃত্যু: মেয়েসন্তান নয়, বদলাতে হবে অনিরাপদ সমাজ
জান্নাতুল তাজমিন ও তার মা - লোকসমাজ

শিকদার খালিদ : মাকে বলেছিল, বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছে। কিন্তু ১৫ বছরের কিশোরী জান্নাতুল তাজমিন কি জানত, বাড়ি থেকে বেরিয়ে এই যাত্রাই হয়ে উঠবে তার জীবনের শেষ যাত্রা? যে মেয়েটি ঘরে ফেরার কথা ছিল, চার দিন নিখোঁজ থাকার পর ফিরল তার নিথর দেহ। কুমিল্লার লালমাইয়ের একটি ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হলো তার মরদেহ। একটি পরিবার হারাল তাদের সন্তানকে, আর সমাজের সামনে রেখে গেল এমন কিছু প্রশ্ন, যেগুলোর উত্তর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ি ফেরার পথে সিএনজিচালক সুমন মিয়ার হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় জান্নাতুল তাজমিন। গ্রেপ্তারের পর আসামি আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন বলেও জানিয়েছে পুলিশ। মামলার চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অভিযোগ ও বিচারপ্রক্রিয়ার বিষয়গুলো আইনগতভাবেই বিবেচনা করতে হবে। তবে এই ঘটনার ভয়াবহতা এবং একটি কিশোরীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশের জন্য বিচার শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না।

কিন্তু একটি অপরাধের বিবরণ দিয়েই কি শেষ করা যায় এই মর্মান্তিক ঘটনা? একজন অপরাধীকে আইনের আওতায় আনা জরুরি, অপরাধের বিচার নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। পাশাপাশি ভাবতে হবে, আমাদের সমাজে মেয়েশিশু ও কিশোরীদের নিরাপত্তা কেন এখনো এত বড় উদ্বেগের বিষয়? কেন একটি মেয়ের বাড়ি থেকে বের হওয়া, বন্ধুর সঙ্গে মেলামেশা কিংবা একা পথ চলাকে ঘিরে পরিবারের মনে এত আশঙ্কা কাজ করে?

যশোরের সাংস্কৃতিক ও সমাজকর্মী নবনীতা তপু বলেন, মেয়ের বন্ধুত্ব ও চলাফেরা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন জান্নাতুলের মা। অঘটনের আশঙ্কায় প্রায় ছয় মাস মেয়েকে স্কুলেও যেতে দেননি বলে জানা গেছে। তারপরও মেয়েকে হারাতে হলো তাঁকে। এই বেদনার মধ্যে রয়েছে এক গভীর অসহায়ত্ব—সন্তানকে বিপদ থেকে রক্ষা করতে চেয়েও একজন মা শেষ পর্যন্ত তাঁকে রক্ষা করতে পারলেন না।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে—সন্তানকে আগলে রাখা আর তার সঙ্গে এমন আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলা, যেখানে সে ভয় বা সংকোচ ছাড়াই নিজের কথা বলতে পারে, এ দুটির মধ্যে ভারসাম্য কীভাবে তৈরি হবে? সন্তানকে সতর্ক করা প্রয়োজন, কিন্তু শুধু নিয়ন্ত্রণ আর বিধিনিষেধ দিয়ে কি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব? বরং এমন পরিবেশ গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে কোনো বিপদ, ভয় কিংবা অস্বস্তির কথা সন্তান নির্ভয়ে পরিবারের কাছে জানাতে পারে।

সমাজকর্মী শামীমা সম্পার বক্তব্যেও উঠে এসেছে কিশোর-কিশোরীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। কৈশোর এমন একটি সময়, যখন আবেগ, কৌতূহল ও নতুন অভিজ্ঞতার প্রতি আকর্ষণ স্বাভাবিকভাবেই কাজ করে। এ সময়ে তারা কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে, কখনো বিপদের মুখেও পড়তে পারে। কিন্তু কোনো ভুল সিদ্ধান্ত বা অসতর্কতার কারণে কি তাদের ওপর সংঘটিত অপরাধের দায় তাদেরই নিতে হবে? কখনোই নয়। অপরাধের দায় অপরাধীর; আর শিশু-কিশোরদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের সম্মিলিত দায়িত্ব।

তাহলে প্রশ্ন হলো, আমাদের কিশোরীদের জন্য নিরাপদ যাতায়াত কতটা নিশ্চিত? পথে কিংবা যাত্রাপথে বিপদে পড়লে দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ব্যবস্থা কতটা কার্যকর? কেউ নিখোঁজ হলে দ্রুত অনুসন্ধান, তথ্য আদান-প্রদান এবং সম্ভাব্য অপরাধ প্রতিরোধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি কতটা যথাযথ? এসব প্রশ্নের উত্তর শুধু একটি ঘটনার তদন্তে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। প্রয়োজন সামগ্রিক নিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি চিহ্নিত করা এবং সেগুলো দূর করার কার্যকর উদ্যোগ।

সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ইসসরাত সাহেদ টিপের বক্তব্যে উঠে এসেছে এই ঘটনার সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিক। মেয়েকে চিরতরে হারিয়ে জান্নাতুলের মা বলেছেন, ‘কারও যেন মেয়ে সন্তান না হয়।’ একজন মায়ের মুখ থেকে এমন কথা উচ্চারিত হওয়া কেবল ব্যক্তিগত শোকের প্রকাশ নয়; এটি এমন এক অসহায় যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ, যার গভীরে রয়েছে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে ভয় এবং সমাজের প্রতি জমে থাকা অভিমান।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, মেয়ে সন্তান জন্ম দেওয়া কি অপরাধ? একটি মেয়ের জন্ম কি তার পরিবারের জন্য আজীবন আতঙ্কের কারণ হয়ে থাকবে? নাকি আমাদের প্রশ্ন তোলা উচিত সেই সামাজিক বাস্তবতা নিয়ে, যেখানে মেয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বদলে তার চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করাকেই অনেক সময় প্রধান সমাধান বলে মনে করা হয়?

মেয়েশিশু ও কিশোরীদের নিরাপত্তার দায়িত্ব তাদের পোশাক, চলাফেরা, বন্ধুত্ব কিংবা পরিবারের বিধিনিষেধের ওপর চাপিয়ে দিলে প্রকৃত সমস্যার সমাধান হয় না। প্রয়োজন অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ, আইনের যথাযথ প্রয়োগ, দ্রুত বিচার, নিরাপদ গণপরিবহন, সচেতনতা এবং নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়—এমন মানসিকতা ও আচরণের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা। একই সঙ্গে সন্তানদের সঙ্গে পরিবারের আস্থাপূর্ণ সম্পর্ক, বিদ্যালয়ে নিরাপত্তাবিষয়ক শিক্ষা এবং বিপদে পড়লে কোথায় ও কীভাবে সহায়তা চাইতে হবে, সে বিষয়ে বাস্তবসম্মত প্রস্তুতিও জরুরি।

জান্নাতুল তাজমিন আর ফিরবে না। তার মায়ের শূন্যতা কোনো বিচারিক রায় কিংবা সামাজিক উদ্যোগে পূরণ হওয়ার নয়। তবু তার মৃত্যুর পরও যদি আমরা কেবল শোক প্রকাশ করি, কয়েক দিন আলোচনা করি, তারপর সব ভুলে যাই—তাহলে এই মৃত্যু আমাদের বিবেককে যে প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে, তার উত্তর দেওয়া হবে না।

এখন প্রয়োজন অপরাধের সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, কিশোরীদের নিরাপত্তায় বিদ্যমান দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং পরিবার থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা। সন্তানকে শুধু শাসন নয়, তার কথা শুনতে হবে; শুধু সতর্ক নয়, নিরাপদ পরিবেশও দিতে হবে। আর অপরাধীর পরিচয় যা-ই হোক, আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় তাকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।

একটি মেয়ের মৃত্যু যেন আরেকটি মাকে এমন আর্তনাদ করতে বাধ্য না করে—‘কারও যেন মেয়ে সন্তান না হয়।’

মেয়েসন্তান নয়, বদলাতে হবে অনিরাপদ সমাজ।