জ্বালানি সাশ্রয়ী আবাসনই হতে পারে বাংলাদেশের নগর ভবিষ্যৎ

0
জ্বালানি সাশ্রয়ী আবাসনই হতে পারে বাংলাদেশের নগর ভবিষ্যৎ

শৈবাল রহমান : ঢাকা কিংবা দেশের অন্যান্য শহরের দিকে তাকালে প্রায়ই একটি ভুল ধারণা চোখে পড়ে—উঁচু উঁচু ভবন, ঝলমলে প্রযুক্তি, স্মার্ট ডিভাইস আর আধুনিক অবকাঠামো থাকলেই বুঝি একটি শহর ‘স্মার্ট’ হয়ে যায়। অথচ বাস্তবতা ভিন্ন। একটি শহর তখনই সত্যিকার অর্থে স্মার্ট ও টেকসই হয়ে ওঠে, যখন সেখানে মানুষের জন্য নিরাপদ, সাশ্রয়ী, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদে বাসযোগ্য আবাসনের নিশ্চয়তা থাকে।

বাংলাদেশের নগরায়ণের বর্তমান চিত্র সেই অর্থে খুব আশাব্যঞ্জক নয়। নগর সম্প্রসারণ হচ্ছে, বহুতল ভবন বাড়ছে, নতুন আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠছে; কিন্তু একই সঙ্গে বাড়ছে যানজট, তাপমাত্রা, বিদ্যুৎ ব্যবহার, পানির সংকট এবং বসবাসের ব্যয়। ফলে প্রশ্ন উঠছে—আমরা কি সত্যিই স্মার্ট নগর গড়ে তুলছি, নাকি কেবল কংক্রিটের জঙ্গল বিস্তৃত করছি?

বিশ্বব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই থেকে তিন লাখ নতুন আবাসনের চাহিদা বা ব্যাকলগ তৈরি হচ্ছে। এই বাস্তবতায় শুধু নতুন ফ্ল্যাট নির্মাণ করলেই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন এমন আবাসন, যা মানুষের নাগালের মধ্যে থাকবে, পরিবেশের ওপর কম চাপ সৃষ্টি করবে এবং জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত বোঝা চাপাবে না।

আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—স্মার্ট আবাসন বলতে আমরা কী বুঝি?

আমাদের দেশে স্মার্ট আবাসন নিয়ে আলোচনা হলেই সোলার প্যানেল, সেন্সর, অটোমেশন কিংবা ডিজিটাল প্রযুক্তির প্রসঙ্গ সামনে আসে। কিন্তু বিশ্বের উন্নত নগর পরিকল্পনাবিদরা বহুদিন ধরেই বলে আসছেন, একটি ভবনের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি অনেক সময় প্রযুক্তিই নয়; বরং সঠিক নকশা। এমন একটি ভবন, যেখানে দিনের অধিকাংশ সময় প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা যায়, যেখানে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকায় এয়ার কন্ডিশনারের ওপর নির্ভরতা কমে, যেখানে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ খরচ করতে হয় না—সেই ভবনই প্রকৃত অর্থে স্মার্ট।

বাংলাদেশের আবহাওয়া ও ভৌগোলিক অবস্থান বিবেচনায় এটি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বছরের অধিকাংশ সময় সূর্যের আলো ও প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ। অথচ নগর উন্নয়নের নামে এমন অসংখ্য ভবন তৈরি হয়েছে, যেখানে দিনের বেলাতেও বাতি জ্বালিয়ে রাখতে হয় এবং সামান্য আরামের জন্যও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়। এটি শুধু ব্যক্তিগত ব্যয় বাড়ায় না; জাতীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপরও অপ্রয়োজনীয় চাপ সৃষ্টি করে।

দেশে উৎপাদিত মোট জ্বালানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়। তাই আবাসন খাতে সামান্য দক্ষতা বৃদ্ধিও জাতীয় পর্যায়ে বিশাল সাশ্রয় বয়ে আনতে পারে। প্রশ্ন হলো, সেই সম্ভাবনাকে আমরা কতটা কাজে লাগাতে পেরেছি?

বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড (বিএনবিসি) রয়েছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (স্রেডা) রয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে কতগুলো আবাসিক ভবনে জ্বালানি দক্ষতার মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে? কতগুলো ভবনের নকশা অনুমোদনের সময় প্রাকৃতিক আলো-বাতাস, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ কিংবা শক্তি সাশ্রয়ের বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে? এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর এখনও মেলেনি।

আরেকটি বাস্তবতা হলো, একটি ভবন যতই আধুনিক হোক, যদি সেটি কর্মস্থল, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা বাজার থেকে অনেক দূরে হয়, তাহলে সেটিকে টেকসই আবাসন বলা যায় না। কারণ প্রতিদিনের দীর্ঘ যাতায়াত মানেই বাড়তি জ্বালানি ব্যয়, সময় অপচয় এবং কার্বন নিঃসরণ বৃদ্ধি। তাই আবাসন পরিকল্পনাকে পরিবহন, অবকাঠামো ও জনসেবার সঙ্গে সমন্বিত করতে হবে।

অর্থায়নের বিষয়টিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে মর্টগেজ ফাইন্যান্স জিডিপির মাত্র প্রায় ১ দশমিক ৯ শতাংশের সমান। বিপরীতে চীন ও মালয়েশিয়ায় এই হার কয়েক গুণ বেশি। এর অর্থ হলো, আমাদের দেশে আবাসন অর্থায়নের সুযোগ এখনও সীমিত। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের জন্য মানসম্মত আবাসন অনেক ক্ষেত্রেই অধরাই থেকে যাচ্ছে।

জাপান, সিঙ্গাপুর কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, টেকসই নগরায়ণের ভিত্তি কেবল উন্নত প্রযুক্তি নয়; বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, কঠোর বাস্তবায়ন, সাশ্রয়ী অর্থায়ন এবং পরিবেশবান্ধব নকশা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই বাস্তবতা প্রযোজ্য।

অতএব, স্মার্ট আবাসনের আলোচনাকে কেবল প্রযুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। আমাদের প্রয়োজন এমন আবাসন, যেখানে সূর্যের আলো, প্রাকৃতিক বাতাস, জ্বালানি সাশ্রয়, নিরাপত্তা, সাশ্রয়ী ব্যয় এবং মানুষের জীবনযাত্রার বাস্তব চাহিদা একসঙ্গে বিবেচনায় থাকবে।

স্মার্ট নগরায়ণ কোনো বিলাসিতা নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অপরিহার্য বিনিয়োগ। আর সেই বিনিয়োগের প্রথম ধাপ হতে পারে খুবই সাধারণ একটি বিষয়—ভবনের জানালা দিয়ে যেন আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। কারণ অনেক সময় সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তির চেয়েও প্রকৃতির দেওয়া সমাধানই বেশি কার্যকর, সাশ্রয়ী এবং টেকসই।