ব্যবসা ও দ্বিনদারি: কোরআনের ভারসাম্যের শিক্ষা

0

মাহমুদ কাদির : পবিত্র কোরআন মানবজাতির জন্য হেদায়েতের প্রধান উৎস। মানুষের পার্থিব ও পারলৌকিক জীবনের কল্যাণে এতে রয়েছে বিস্তৃত দিকনির্দেশনা। তাই কোরআনের শিক্ষা শুধু ইবাদত-বন্দেগি কিংবা পরকালীন জীবনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের সামাজিক সম্পর্ক, অর্থনীতি, জীবিকা ও ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কেও এতে গুরুত্বপূর্ণ নীতিমালা দেওয়া হয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে ব্যবসা-বাণিজ্য বৈধ উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম। তবে সেই উপার্জন হতে হবে হালাল, ন্যায়সংগত ও পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে। ব্যবসা যেন মানুষের অধিকার নষ্ট না করে এবং মুমিনের দ্বিনি দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি না করে—সেদিকেও কোরআন বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে কোরআনের ধারণা

পবিত্র কোরআনে ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ‘তিজারা’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। পাশাপাশি বেচাকেনা ও ক্রয়-বিক্রয় বোঝাতে ‘বাই’ এবং ‘শিরা’সহ বিভিন্ন শব্দও এসেছে। এসব শব্দের মাধ্যমে কোরআনে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

কোরআনের আলোচনায় ব্যবসা নিজে কোনো নেতিবাচক বিষয় নয়। বরং বৈধ পন্থায় জীবিকা অর্জনকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তবে ব্যবসার বৈধতা তার পদ্ধতির ওপরও নির্ভরশীল।

ব্যবসা বৈধ, সুদ নিষিদ্ধ

ইসলাম বৈধ ক্রয়-বিক্রয়কে অনুমোদন করেছে এবং সুদকে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

‘আল্লাহ ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।’

—সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৭৫

অর্থাৎ মুনাফা অর্জন নিজে নিষিদ্ধ নয়। কিন্তু সেই মুনাফা অর্জনের পদ্ধতি হতে হবে শরিয়তসম্মত ও ন্যায়সংগত।

লেনদেনে থাকতে হবে পারস্পরিক সম্মতি

ব্যবসায়িক সম্পর্কের অন্যতম মৌলিক নীতি হলো পারস্পরিক সম্মতি। কারও সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রহণ করা ইসলামে অনুমোদিত নয়।

আল্লাহ বলেন—

‘তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না; তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে তা ভিন্ন।’

—সুরা আন-নিসা, আয়াত ২৯

এই নির্দেশ ব্যবসায় প্রতারণা, জবরদস্তি, ভয় দেখানো কিংবা অন্যায় প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রাখে না। একজন ব্যবসায়ীকে যেমন নিজের লাভের কথা ভাবতে হবে, তেমনি ক্রেতার অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

লেনদেন লিখিত রাখার শিক্ষা

ব্যবসায়িক লেনদেনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির গুরুত্ব কোরআনের দীর্ঘতম আয়াত—সুরা আল-বাকারাহর ২৮২ নম্বর আয়াতে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

আল্লাহ বলেন—

‘হে মুমিনরা! তোমরা যখন পরস্পরের মধ্যে নির্ধারিত মেয়াদের জন্য ঋণের লেনদেন করো, তখন তা লিখে রাখো।’

—সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ২৮২

এ নির্দেশ থেকে বোঝা যায়, আর্থিক লেনদেনে মৌখিক বিশ্বাসের পাশাপাশি লিখিত দলিল, হিসাব ও স্বচ্ছতারও গুরুত্ব রয়েছে। আধুনিক ব্যবসায় চুক্তিপত্র, হিসাব সংরক্ষণ ও নথিপত্র ব্যবস্থাপনার যে গুরুত্ব, কোরআনের এই নির্দেশ তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

মাপে-ওজনে কম নয়

ব্যবসায় লাভ করা বৈধ; কিন্তু লাভের জন্য প্রতারণা বৈধ নয়। মাপে-ওজনে কম দেওয়া এবং ক্রেতাকে ঠকানোর ব্যাপারে কোরআনে কঠোর সতর্কবার্তা এসেছে।

আল্লাহ বলেন—

‘দুর্ভোগ তাদের জন্য যারা মাপে কম দেয়।’

—সুরা আল-মুতাফফিফিন, আয়াত ১-৩

অতএব একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর সাফল্যের মাপকাঠি শুধু কত বেশি লাভ করলেন, তা নয়; বরং কতটা সততা ও আমানতদারির সঙ্গে সেই লাভ অর্জন করলেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

জীবিকার সন্ধানে সফর

জীবিকা অর্জনের জন্য ভ্রমণ ও ব্যবসাকে কোরআন নেতিবাচকভাবে দেখেনি। বরং আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানের কথা কোরআনে এসেছে।

সুরা আল-মুজ্জাম্মিলের ২০ নম্বর আয়াতে আল্লাহ মানুষের বিভিন্ন ধরনের কর্মপ্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে জীবিকার সন্ধানে দেশভ্রমণের কথাও রয়েছে।

অর্থাৎ জীবিকার প্রয়োজনে দেশ-বিদেশে যাতায়াত, ব্যবসা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ পথের মধ্যে পড়ে।

সমুদ্রপথেও জীবিকার সন্ধান

মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমুদ্র ও নৌপথের গুরুত্বের কথাও কোরআনে এসেছে। আল্লাহ বলেন—

‘তুমি দেখতে পাও, নৌযান সমুদ্রের বক্ষ চিরে চলাচল করে, যাতে তোমরা তাঁর অনুগ্রহ অনুসন্ধান করতে পারো এবং যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’

—সুরা ফাতির, আয়াত ১২

এ আয়াত মানুষের জীবিকা অনুসন্ধান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আল্লাহর দেওয়া প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহারের দিকটি স্মরণ করিয়ে দেয়।

ব্যবসায় সময় ও সুযোগের গুরুত্ব

সুরা কুরাইশে কুরাইশদের শীত ও গ্রীষ্মকালীন বাণিজ্য সফরের প্রসঙ্গ এসেছে—

‘কুরাইশের আসক্তির কারণে—তাদের শীত ও গ্রীষ্মের সফরের কারণে।’

—সুরা কুরাইশ, আয়াত ১-২

তাফসিরবিদদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কুরাইশরা মৌসুম অনুযায়ী বাণিজ্যিক সফর করত। এতে বোঝা যায়, ব্যবসায় সময়, স্থান, বাজার ও পরিবেশের বাস্তবতা বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যবসা ও দ্বিনদারির মধ্যে ভারসাম্য

ইসলাম ব্যবসাকে বৈধতা দিয়েছে, কিন্তু ব্যবসাকে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য বানাতে বলেনি। একজন মুমিনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে ঈমান, ইবাদত ও আল্লাহর স্মরণেরও সমন্বয় থাকতে হবে।

কোরআনে ঈমান ও আল্লাহর পথে আত্মত্যাগকেও ‘ব্যবসা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন—

‘হে মুমিনরা! আমি কি তোমাদের এমন এক বাণিজ্যের সন্ধান দেব, যা তোমাদের মর্মন্তুদ শাস্তি থেকে রক্ষা করবে?’

—সুরা আস-সাফ, আয়াত ১০

পরবর্তী আয়াতে ঈমান ও আল্লাহর পথে সম্পদ ও জীবন দিয়ে চেষ্টা করার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, মুমিনের প্রকৃত ও চূড়ান্ত সাফল্য হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন।

ইবাদতের সঙ্গে ব্যবসা চলতে পারে

ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে ইবাদতের বিপরীত কোনো কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখেনি। বৈধ উপার্জনের পাশাপাশি ইবাদত পালন করা যায়। হজের প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন—

‘তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ অনুসন্ধান করাতে তোমাদের কোনো অপরাধ নেই।’

—সুরা আল-বাকারাহ, আয়াত ১৯৮

তাফসিরবিদরা এ আয়াতের ব্যাখ্যায় বৈধ ব্যবসা ও উপার্জনের বিষয়টিও উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ মানুষের জীবিকা অর্জন এবং আল্লাহর ইবাদত—দুটিকে পরস্পরবিরোধী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

তবে ব্যবসা যেন আল্লাহর স্মরণ থেকে দূরে না সরায়

সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন ব্যবসা ও অর্থ উপার্জন মানুষের দ্বিনি দায়িত্বকে ছাপিয়ে যায়। কোরআনে এমন পরিস্থিতির ব্যাপারে সতর্ক করা হয়েছে।

সুরা আল-জুমার ১১ নম্বর আয়াতে ব্যবসা ও ক্রীড়া-কৌতুকের কারণে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিচ্যুত হওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করে বলা হয়েছে—

‘বলো, আল্লাহর কাছে যা আছে তা ক্রীড়া-কৌতুক ও ব্যবসা অপেক্ষা উত্তম।’

অর্থাৎ ব্যবসা গুরুত্বপূর্ণ হলেও আল্লাহর স্মরণ ও আখিরাতের দায়িত্বের চেয়ে তা বড় হতে পারে না।

জুমার নামাজের সময় ব্যবসা বন্ধের নির্দেশ

দ্বিন ও ব্যবসার অগ্রাধিকারের বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এসেছে জুমার নামাজের প্রসঙ্গে। আল্লাহ বলেন—

‘হে মুমিনরা! জুমার দিনে যখন নামাজের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহর স্মরণের দিকে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ করো।’

—সুরা আল-জুমুআহ, আয়াত ৯

এখানে ব্যবসা নিষিদ্ধ করা হয়নি; বরং ফরজ ইবাদতের সময় ব্যবসা থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নামাজ শেষ হওয়ার পর আবার আল্লাহর অনুগ্রহ অনুসন্ধানের জন্য পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার কথা বলা হয়েছে।

এখানেই ইসলামের ভারসাম্যের শিক্ষা স্পষ্ট হয়ে ওঠে—ব্যবসা থাকবে, উপার্জন থাকবে, সম্পদ অর্জনের চেষ্টা থাকবে; কিন্তু এসব কিছুই আল্লাহর বিধান ও দ্বিনি দায়িত্বের অধীন থাকবে।

সততাই ব্যবসার প্রকৃত পুঁজি

ইসলামের অর্থনৈতিক দর্শনে ব্যবসার উদ্দেশ্য শুধু সম্পদ বৃদ্ধি নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সততা, আমানতদারি, ন্যায়পরায়ণতা ও মানুষের অধিকার রক্ষা।

একজন মুসলিম ব্যবসায়ীর কাছে তাই প্রশ্নটি শুধু ‘কত লাভ হলো’—এমন নয়। প্রশ্ন হলো, সেই লাভ কীভাবে অর্জিত হলো? কারও অধিকার নষ্ট হলো কি না? লেনদেনে প্রতারণা ছিল কি না? মাপে-ওজনে কম দেওয়া হলো কি না? সুদ বা হারাম কোনো পদ্ধতি এতে যুক্ত হলো কি না? আর ব্যবসার কারণে ফরজ ইবাদত ও দ্বিনি দায়িত্ব অবহেলিত হলো কি না?

কোরআনের শিক্ষা হলো—হালাল উপার্জন মানুষের পার্থিব জীবনকে সমৃদ্ধ করতে পারে, আবার সেই উপার্জন যদি সততা ও আল্লাহভীতির সঙ্গে পরিচালিত হয়, তবে তা মুমিনের জন্য কল্যাণের মাধ্যমও হতে পারে।

তাই ইসলামের দৃষ্টিতে একজন সফল ব্যবসায়ী কেবল বড় ব্যবসার মালিক নন। তিনি এমন একজন মানুষ, যিনি হালাল পথে উপার্জন করেন, লেনদেনে স্বচ্ছ থাকেন, মানুষের অধিকার রক্ষা করেন, প্রতারণা থেকে দূরে থাকেন এবং সম্পদের পাশাপাশি আল্লাহর সন্তুষ্টিকেও জীবনের চূড়ান্ত অর্জন হিসেবে বিবেচনা করেন।

এই ভারসাম্যই ব্যবসা ও দ্বিনদারির মধ্যে কোরআনের শিক্ষা—দুনিয়ার প্রয়োজন পূরণ হবে, কিন্তু আখিরাতের লক্ষ্য বিস্মৃত হবে না।