‘শিবির নেতা গুমের নেপথ্যে তৎকালীন ওসি অপূর্ব হাসান ও সেকেন্ড অফিসার নূর আলম’

0

বেনাপোল (যশোর) সংবাদদাতা ॥ যশোরের বেনাপোলে তৎকালীন ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা রেজওয়ান হোসাইন নিখোঁজের ৯ বছর পর ঘটনাটি তদন্তে মাঠে নেমেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী দল। ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতারের পর থেকে রেজওয়ানের কোনো খোঁজ মিলছে না।

পরিবার ও স্থানীয়দের অভিযোগ, গুমের পেছনে তৎকালীন বেনাপোল থানার ওসি অপূর্ব হাসান ও সেকেন্ড অফিসার নূর আলমের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে।

বুধবার (১৫ অক্টোবর) বেনাপোল পৌর ভূমি অফিসে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঢাকার তদন্ত কর্মকর্তা উপসহকারী পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেনসহ তিন সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত দল উপস্থিত হয়ে সাক্ষ্যগ্রহণ কার্যক্রম শুরু করে। দলটি নিখোঁজ রেজওয়ানের পরিবারের সদস্য, সহপাঠী ও স্থানীয় প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানবন্দী নিচ্ছে।
তদন্তকারীরা বলেছেন, আমরা ঘটনা সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের বক্তব্য নিচ্ছি। তদন্তের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

রেজওয়ানের ভাই বায়জিদ হোসেন বলেন, ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট রাতে বেনাপোল ভূমি অফিসের সামনে থেকে পুলিশ পরিচয়ে কয়েকজন লোক রেজওয়ানকে ধরে নিয়ে যায়। তারা বলে, কিছু জিজ্ঞাসাবাদের জন্যে থানায় নেওয়া হবে। এরপর থেকে তার আর কোনো খোঁজ নেই। থানায় গেলে ওসি অপূর্ব হাসান ও সেকেন্ড অফিসার নূর আলম দুজনই বলেন, আমরা কাউকে আটক করিনি।

গুম হওয়া রেজওয়ান হোসাইনের পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় ব্যক্তিরা কমিশনের কাছে সাক্ষ্য প্রদান করেন। সাক্ষ্য প্রদান করেন রেজওয়ানের পিতা মো. মিজানুর রহমান, ভাই মো. বায়জিদ হোসেন ও মো. রিপন হোসেন, স্থানীয় বাসিন্দা রেজাউল ইসলাম, আনোয়ারুল ইসলাম, গোলাম মোর্তজা ও শফি হোসেন।

এদিকে বেনাপোল থানার বর্তমান কর্মকর্তারা বলেন, ঘটনাটি বহু পুরোনো। থানার বর্তমান কোনো সদস্য তখন দায়িত্বে ছিলেন না। তবে যেহেতু বিষয়টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্তাধীন তাই আমরাও সহযোগিতা করছি।

বেনাপোল পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলর (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক) বলেন, রেজওয়ানের বিষয়টি আমরা কখনও ভুলিনি। সেদিন রাতে অনেকেই দেখেছে, পুলিশি পোশাকে কয়েকজন লোক তাকে ভূমি অফিসের সামনে থেকে ধরে নিয়ে যায়। এখন তদন্তে সত্যি বেরিয়ে আসুক-এটা আমাদের দাবি।

এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঢাকার তদন্ত কর্মকর্তা মোয়াজ্জেম হোসেন কথা বলতে রাজি হননি। তবে তদন্ত দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে তারা ঘটনাস্থল, রেজওয়ানের বাড়ি ও তৎকালীন বেনাপোল থানার আশপাশের স্থানগুলো পরিদর্শন করবেন। এরপর রিপোর্ট তৈরি করে কমিশনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালে জমা দেওয়া হবে।

সাক্ষ্য গ্রহণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বেনাপোল থানা শাখার আমির রেজাউল ইসলাম, সেক্রেটারি মাওলানা ইউসুফ, বেনাপোল পৌর সভাপতি রিয়াছাত আলী, পৌর সেক্রেটারি নুরুল ইসলাম, বেনাপোল থানা ছাত্রশিবির সভাপতি মাহাদি হাসান, পৌর ছাত্রশিবির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২০১২ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ছয় নেতার গুমের ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল চিফ প্রসিকিউটর বরাবরে অভিযোগ দাখিল করেন তাদের পরিবার। সেই ছয় নেতার মধ্যে রেজওয়ান হোসাইন রয়েছেন। ২০১৬ সালের ৪ আগস্ট রাত আনুমানিক ৯টার দিকে বেনাপোল পৌরসভার ভূমি অফিসের সামনে থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিচয়ে রেজওয়ান হোসাইনকে তুলে নেওয়া হয়।

তখন থেকে তিনি নিখোঁজ। পরিবার বহুবার থানায়, জেলা প্রশাসন ও হাইকোর্টে নিখোঁজের অভিযোগ করলেও কোন অগ্রগতি হয়নি। দীর্ঘ অপেক্ষার পর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ তদন্ত দল এ ঘটনায় মাঠে নামায় নতুন করে আলোচনায় এসেছে বেনাপোলের এই গুম রহস্য।