নওয়াপাড়া নৌবন্দরে কোটি টাকার ইউরিয়া লোপাট, আটক- ২

0

স্টাফ রিপোর্টার, অভয়নগর (যশোর)॥ যশোরের নওয়াপাড়া নৌবন্দর থেকে ৯ হাজার ২শ ৮০ বস্তা ইউরিয়া সার লোপাট হয়েছে। এ সারের দাম প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এ ব্যাপারে ১৪ মার্চ অভয়নগর থানায় মামলা হয়েছে।

এরপর যশোর ডিবি ২ জনকে আটক করলেও প্রশাসনের চোখে ধুলো দিয়ে ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়েছে চক্রের হোতারা। সরকারি এ ইউরিয়া সার নির্দিষ্ট বাফার গুদামে পৌঁছে না দিয়ে অন্য স্থানে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনাকে আড়াল করতে প্রশাসনের দৃষ্টি অন্যদিকে ঘোরাতে দুটি চক্র পরস্পরকে দায়ী করে অভয়নগর থানায় অভিযোগ দায়ের করেছে।

অভয়নগর থানায় দেওয়া অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, সম্প্রতি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেসার্স সামিট অ্যাসোসিয়েটস্রে আমদানি করা ইউরিয়া সার পরিবহন ও হ্যান্ডেলিং ঠিকাদার মেসার্স নভো ট্রেড এন্ড ট্রান্সপোর্টের প্রতিনিধি উপজেলার ধোপাদী গ্রামের দীন মোহাম্মাদ মোল্যার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মিল্টন ৪ জনকে আসামি করে থানায় মামলা দায়ের করেন। আসামিরা হলেন উপজেলার ভাঙ্গাগেটের মেসার্স শাহরিয়ার ট্রান্সপোর্টের মালিক (ট্রাক বন্দবস্তকারী) যশোর সদর উপজেলার চাউলিয়া গ্রামের নুর ইসলাম মোল্যার ছেলে মো. মিলন হোসেন, নওয়াপাড়া গ্রামের মো. কেরামত আলী ছেলে মো. আবু বক্কার, বাঘারপাড়া উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের মো. শাহাজান আলীর ছেলে মো. রমজান আলী ও বাঘারপাড়া উপজেলার নারিকেলবাড়িয়া গ্রামের অনাত সাহার ছেলে উজ্জল কুমার সাহা। অভিযুক্তদের মধ্যে মিলন ও উজ্জল আটক হলেও বাকি দুই আসামিকে এখনও আটক করতে পারেনি পুলিশ।

মামলার বিবরণে জানা যায়, মিলন হোসেনের সাথে বাদী মিল্টন সরকারি বিসিআইসির ইউরিয়া সার নওয়াপাড়া নৌবন্দরের সিরাজ মিয়ার ঘাট, মুজিবর রহমান খানের ঘাট ও আজাহার সরদারের ঘাট থেকে ফরিদপুর টেপাখোলা বাফার গোডাউনে পাঠানোর জন্যে চুক্তিবদ্ধ হন।

চুক্তি অনুযায়ী গত ৩ ফেব্রুয়ারি সিরাজ মিয়ার ঘাট থেকে যশোর-ট-১১-১৮৯৭ নম্বর ট্রাকে ৪০০ বস্তা, যশোর-ট-১১-১৬০০ নং ট্রাকে ৪০০ বস্তা, ৪ ফেব্রুয়ারি একই ঘাট থেকে ঢাকা মোট্রো-ট-১৮-৮৫৬৩ নং ট্রাকে ৪০০ বস্তা, ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মোট্রো-ট-১৫-১৬৩৭ নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা, ১০ ফেব্রুয়ারি আজাহার সরদারের ঘাট থেকে সাতক্ষীরা-ট-১১-০২২৩নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা ও মুজিবর রহমান খানের ঘাট থেকে সাতক্ষীরা-ট-১১-০১৬৯ নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা, ১১ ফেব্রুয়ারি আজাহার সরদারের ঘাট থেকে সাতক্ষীরা-ট-১১-০২২৩ নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা ও মুজিবর রহমান খাঁনের ঘাট থেকে সাতক্ষীরা-ট-১১-০১৬৯ নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা, চুয়াডাঙ্গা-ট-১১-০৮৫৮ নং ট্রাকে ৪শ ৮০ বস্তা, ১২ ফেব্রুয়ারি আজাহার সরদারের ঘাট থেকে সাতক্ষীরা-ট-১১-০১৬৯ নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা, ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-৭০৭৭ নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা, ১৩ ফেব্রুয়ারি আজাহার সরদারের ঘাট থেকে যশোর-ট-১১-৫০৪৮ নং ট্রাকে ৬শ৬০ বস্তা, সাতক্ষীরা-ট-১১-০২২৩ নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা, ১৬ ফেব্রুয়ারি মুজিবর রহমান খাঁনের ঘাট থেকে খুলনা মোট্রো-ট-১১-১৭৫৫ নং ট্রাকে ৪শ ২০ বস্তা, মুজিবর রহমান খানের ঘাট থেকে যশোর-ট-১১-৪৮৮২ নং ট্রাকে ৭০০ বস্তা মিলিয়ে সর্বমোট ৭ হাজার ১শ ৪০ বস্তা সরকারি বিসিআইসি ইউরিয়া সার যার ওজন ৩শ ৫৭ মেট্রিক টন সার পাচার হয়। যার বাজার মূল্য প্রতি বস্তা ১ হাজার ৪শ টাকা হারে ৯৯ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। ওই ৭ হাজার ১শ ৪০ সরকারি বিসিআইসি ইউরিয়া সার লোড করে বিবাদী মিলন হোসেন ওই সার ফরিদপুর টেপাখোলা বাফার গুদামে পৌঁছে দেননি।

মিল্টন আরো জানান, আমি উপায় না পেয়ে মিলন হোসেনের সাথে যোগাযোগ করলে মিলন ট্রাকচালকদের সাথে কথা বলে জানাচ্ছি বলে তালবাহানা করতে থাকেন। পরে সকল জায়গায় যোগাযোগ করে জানতে পারি প্রায় ১ কোটি টাকার সার মিলন হোসেন অন্য স্থানে বিক্রি করে আত্মসাৎ করেছেন।

অপরদিকে অভিযোগ রয়েছে মিলন হোসেন ঘটনা ভিন্নখাতে ঘুরাতে তার আরেক সহযোগী অভয়নগর উপজেলার চেঙ্গুটিয়া বাজারের মেসার্স আর রহমান ট্রান্সপোর্ট এন্ড শিপিং এজেন্সির মালিক যশোর জেলার বাঘারপাড়া উপজেলার ছাতিয়ানতলা গ্রামের মো. শাহাজান আলীর ছেলে মো. রমজান আলীকে দায়ী করে অভয়নগর থানায় অভিযোগ করেন।

অভিযোগে বলা হয়, ৩ ফেব্রুয়ারি যশোর-ট-১১-১৮৯৭ নং ট্রাকে ৫০ কেজি ওজনের ৪০০ বস্তা, যশোর-ট-১১-১৬০০ নং ট্রাকে ৪০০ বস্তা, ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেট্রো-ট-১৮-৮৫৬৩ নং ট্রাকে ৪০০ বস্তা, ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেট্রো-ট-১৫-১৬৩৭ নং ট্রাকে ৪শ ৬০ বস্তা, ১১ ফেব্রুয়ারি চুয়াডাঙ্গা-ট-১১-০৮৫৮ নং ট্রাকে ৪শ ৮০ বস্তা পাচার হয়। সর্বমোট ২ হাজার ১শ ৪০ বস্তা সার পাচার হয়। যার ওজন ১শ ৭ মেট্রিক টন। বিসিআইসি সরকারি ইউরিয়া সার নওয়াপাড়ার সিরাজ মিয়ার ঘাট থেকে লোড করে ফরিদপুর টেপাখোলা বাফার গোডাউনে পৌঁছে দেওয়ার কথা থাকলেও ওই সার জমা না দিয়ে অন্যত্র বিক্রি করে দিয়ে আত্মসাৎ করেছে বলে লিখিত অভিযোগে জানানো হয়।

এদিকে ১৫ ট্রাক সার আত্মসাতের ঘটনা জানাজানি হলে পরিবহন ও হ্যান্ডেলিং ঠিকাদার মেসার্স নভো ট্রেড এন্ড ট্রান্সপোর্টের মালিক সৌরভ ও তার সহযোগীরা মিল্টন ও মিলনকে চাপ দিলে তারা ঘটনা ভিন্নদিকে নিতে ও সার তল্লাশির কথা বলে মেসার্স শাহরিয়ার ট্রান্সপোর্টের মালিক (ট্রাক বন্দবস্তকারী) তার অপর সহযোগী নওয়াপাড়া গ্রামের মো. কেরামত আলী ছেলে মো. আবু বক্কারকে কৌশলে খুলনার পরিবহন ও হ্যান্ডেলিং ঠিকাদার মেসার্স নভো ট্রেড এন্ড ট্রান্সপোর্টের অফিসে নিয়ে বেদম মারপিট করে ৩শ টাকার স্ট্যাম্পে অঙ্গীকার করিয়ে নেন যে, আবু বক্কার ১০ ট্রাক ইউরিয়া সার যার মূল্য ৬৭ লাখ ২০ হাজার টাকা তা বুঝিয়ে দেবেন। এ সময় তারা আবু বক্কারের নামের আইএফআইসি ব্যাংকের ১৩টি স্বাক্ষর করা সাদা চেকের পাতা জামানত হিসেবে রেখে দেন।
আবু বক্কার জানান, আমি সরল বিশ্বাসে মিলনের সাথে কাজ করতাম। কিন্তু মিলন এমনভাবে আমাকে ফাঁসিয়ে দেবে ভাবতে পারিনি। আমি এখন কী করব? কোন কূল- কিনারা পাচ্ছিনা। যার ভিডিও রেকর্ড সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এদিকে অভিযোগ রয়েছে, রমজানকে মোটা অংকের টাকা দিয়ে মেসার্স শাহরিয়ার ট্রান্সপোর্টের মালিক (ট্রাক বন্দোবস্তকারী) মো. মিলন হোসেনকে গা ঢাকা দিতে সাহায্য করেছেন।

এ ব্যাপারে অভয়নগর থানার কৃষি কর্মকর্তা লাভলী খাতুন জানান, আমি বিষয়টি শুনেছি। কিন্তু এই চক্র এত বড় যে, এদের কোথা থেকে শুরু করব বুঝতে পারছিনা। তবে মামলা হয়েছে। দুইজন আটক হয়েছে। সব খবর বের হবে। সার নিয়ে কোন কেলেংকারি সরকার সহ্য করবো না।

অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী অফিসার জয়দেব চক্রবর্তী জানান, সার নিয়ে কেলেংকারীতে জড়িয়ে এই মোকাম ও সরকারের ক্ষতি করছে একটি চক্র। তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। দ্রুত সকলকে আইনের আওতায় এনে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।