শারমিনের ভালোবাসার ছোঁয়ায় পরিচয় ফিরল ভবঘুরে আলমগীরের

0
ছবি: লোকসমাজ।

বি এম আসাদ ॥ যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল চত্বরের ওভার ব্রিজের নিচে গত তিন মাস ধরে পড়ে ছিলেন এক উলঙ্গ, পরিচয়হীন মানুষ। তপ্ত রোদে শুধু একটা হাফপ্যান্ট পরা অবহেলার সেই মানুষটিকে সবাই জানত ‘অজ্ঞাত পাগল’ হিসেবে। প্রতিনিয়ত এই হাসপাতাল প্রাঙ্গণে এমন অনেক পরিচয়হীন মানুষ আসেন, কিছুদিন থাকেন; কেউ অবহেলা ও অনাহারে মারা যান, আবার কেউ হারিয়ে যান। তবে এবার গল্পটি ভিন্ন হলো ২৬ বছর বয়সী এক নারীর ভালোবাসায়।

সেই পরিচয়হীন ব্যক্তির সেবায় এগিয়ে আসেন শারমিন আফরোজা। কোনো স্বার্থ বা সংস্থার হয়ে নয়, কেবল মনের প্রশান্তি থেকেই তিনি নিজের হাতে খাবার তুলে দিতে শুরু করেন, পরম মমতায় আগলে রাখেন লোকটিকে।

ভালোবাসার এমন সেবার মাত্র দুই দিনের মাথায় মুখ খোলেন সেই ব্যক্তি। আধো আধো কণ্ঠে জানান তার নাম আলমগীর হোসেন, পিতা মৃত আমজাদ হোসেন, মা আমিরোন নেছা। তার আদি বাড়ি বরিশালের কাউখালীতে এবং জন্ম ১৩ জানুয়ারি ১৯৭৫।

সাবেক এই সোনালী জুট মিল কর্মী খুলনা দীঘলিয়া এলাকায় থাকতেন। তার রনি নামের এক ছেলে ও চাদনী নামের এক মেয়ে রয়েছে। স্বজনদের সুনির্দিষ্ট ঠিকানা না জানা থাকলেও শারমিনের সেবার কারণেই অন্তত এই পরিচয়টুকু সামনে এসেছে।

মানবিকতার প্রতীক এই শারমিন আফরোজা ফরিদপুর গ্রামের নওয়াব আলীর কন্যা। বয়স ২৬ বছর। এক কন্যাসন্তানের জননী শারমিন ব্যক্তিগত জীবনের বিচ্ছেদের পর নিজেকে পুরোপুরি উৎসর্গ করেছেন মানবসেবায়। ১৩ বছরের অকশোরা পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে, তাকে পিতার বাড়িতে রেখে তিনি প্রতিদিন হাসপাতালে এসে নিঃস্বার্থভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন।

শারমিন আফরোজা বলেন, ‘আর কখনো বিয়ে করবো না, বাকি জীবনটা মানবিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত রাখবো।’

এদিকে হাসপাতালে এমন পরিচয়হীন মানুষদের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত।

তিনি জানান, জনবল ও উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে এসব অবহেলিত মানুষকে ওয়ার্ডে রাখা সম্ভব হয় না, কারণ তারা সেখানে পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে পারেন না। চিকিৎসা দিতে আপত্তি না থাকলেও এদের রাখার মতো উপযুক্ত আশ্রয়কেন্দ্র বা সমাজসেবা বিভাগের কোনো কেন্দ্র যশোরে নেই।

এমন এক পরিস্থিতিতে প্রশাসনিক ও সামাজিক সীমাবদ্ধতার মাঝেও শারমিন আফরোজার এই মানবিক উদ্যোগ এক দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। ভালোবাসা ও সামান্য যত্ন পেলে যে এক পথহারা মানুষও স্ব স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, শারমিন ও আলমগীরের এই গল্প সেটাই আরও একবার প্রমাণ করল।