চুয়াডাঙ্গায় মাছের উচ্ছিষ্টে আসছে বৈদেশিক মুদ্রা

0
ছবি: সংগৃহীত।

রিফাত রহমান, চুয়াডাঙ্গা ॥ নদীমাতৃক এ দেশে এক সময় মাছের আঁইশকে বর্জ্য হিসেবে ফেলে দেওয়া হলেও বর্তমানে এটি একটি উচ্চমূল্যের শিল্প কাঁচামাল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনায় মাছের আঁইশ সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণন নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

মাছের আঁইশ বিদেশে রপ্তানির মাধ্যমে দেশের জন্যে বয়ে আনছে বৈদেশিক মুদ্রা। এছাড়া মাছের আঁইশ ছাড়ানো বা মাছ কাটাকে পেশা হিসেবে নিয়ে চুয়াডাঙ্গায় স্বাবলম্বী হচ্ছেন অনেকে।

চুয়াডাঙ্গা জেলা মৎস্য অফিসসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় অনেক ব্যবসায়ীই এখন মাছের আঁইশ ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় বাজার থেকে আঁইশ প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে চলে যাচ্ছে জাপান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়াসহ আরো কয়েকটি দেশে। চুয়াডাঙ্গা শহরের বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ব্যবসায়ীরা মাছের আঁইশ ফেলে না দিয়ে জমিয়ে রাখছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই মাছের আঁইশ দিয়ে তৈরি হচ্ছে লিপস্টিক, প্রসাধনী সামগ্রী, ক্যাপসুলের আবরণ বা ক্যাপসহ বিভিন্ন পণ্য।

ছবি: সংগৃহীত।

যারা বিভিন্ন বাজারে মাছ কাটেন তারা মাছের আঁইশ ফেলে না দিয়ে সংগ্রহ করে রাখছেন। পরে তা ধুয়ে পরিষ্কার করে রোদে শুকিয়ে ঝরঝরে করে বিক্রি করছেন ব্যাপারীদের কাছে। এরপর সেই আঁইশ বছরে দুই থেকে তিনবার ব্যাপারীরা বিক্রি করেন পাইকারি ব্যবসায়ীদের কাছে। প্রতি মণ আঁইশ বিক্রি করা হয় ২ থেকে ৪ হাজার টাকায়।

মাছ কাটা পেশায় জড়িত অনেকে জানিয়েছেন, এ পেশায় তাদের স্বাবলম্বী হওয়ার কাহিনী।

চুয়াডাঙ্গা জিনতলাপাড়ার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বড় বাজারের মাছ কাটেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রায় ১৫-২০ কেজি আঁইশ হয়। এগুলো বিক্রি করে মাসে ৩-৪ হাজার টাকা বাড়তি আয় হয়। এর আগে মাছের আঁইশ তিনি ফেলে দিতেন, কিন্তু এখন সেগুলো বাড়তি আয়ের অংশ।

চুয়াডাঙ্গা বড়বাজারে শরীফ উদ্দীন নামে আরেক মাছ কাটা ব্যবসায়ী বলেন, তিনি প্রতিদিন মণ খানেক মাছ কাটেন। মাছ কেটে যা আয় হয় তার পাশাপাশি বাড়তি আয় হয় আঁইশ বিক্রি করে। এগুলো বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে বলে তিনিও দাম ভালো পাচ্ছেন।

জেলার দামুড়হুদা উপজেলার দর্শনা বাসস্ট্যান্ড বাজারে দীর্ঘ দেড় বছর ধরে মাছ কাটেন শুকুর আলী।

তিনি বলেন, আগে তিনি মাছের আঁইশ ফেলে দিতেন। যখন তিনি জানতে পারেন এগুলো বিদেশে বিক্রি হচ্ছে তখন থেকে আঁইশ জমিয়ে তিনি বিক্রি শুরু করেন। তিনি জানান, ওয়েভ ফাউন্ডেশন থেকে প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম ও আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। মাছের আঁইশের পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন বাজার থেকে আঁশ সংগ্রহ করেন। এরপর বস্তাবন্দি করে ঢাকা, চট্টগ্রাম পাঠিয়ে দেন। সেখানে প্রক্রিয়াকরণ শেষে বিদেশে রপ্তানি হয়।

ছবি: সংগৃহীত।

ওয়েভ ফাউন্ডেশনের মৎস্য কর্মকর্তা সাঈদ-উর-রহমান বলেন, চুয়াডাঙ্গা সদর ও দামুড়হুদা উপজেলার ৬ জনকে পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় মাছ কাটার পর মাছের আঁইশ সংগ্রহের জন্যে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। মাছের আঁইশ একসময় বর্জ্য হিসেবে বিবেচিত হতো। এখন তা একটি সম্ভাবনাময় রপ্তানি পণ্যে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই খাতে উদ্যোক্তা তৈরি হলে একদিকে যেমন পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে তেমন নতুন কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগ তৈরি হবে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফরহাদুর রেজা বলেন, মাছের আঁইশ বিদেশে রপ্তানি শুরু হওয়ার পর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের নতুন একটি পথ সৃষ্টি হয়েছে। তৈরি হয়েছে নতুন আরও একটি পেশা। একটা সময় এটি আবর্জনা ছিল।

এখন এটি সম্পদে পরিণত হয়েছে। মাছের আঁইশ মূলত কোলাজেন সমৃদ্ধ যা বিভিন্ন শিল্পের অত্যন্ত মূল্যবান উপাদান। আধুনিক শিল্পে মাছের আঁইশ প্রসাধনী শিল্প (স্কিন কেয়ার, এন্টি-এজিং পণ্য), ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প, জেলাটিন ও কাইটোসান উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়। বিশ্ববাজারে মাছের আঁইশ থেকে উৎপাদিত কোলাজেনের চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।