চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি, নজর কাড়ছে দেশি গরু: জমজমাট দক্ষিণাঞ্চলের বৃহত্তম ‘সাতমাইল পশুর হাট’

0
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে যশোরের শার্শা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বাগআঁচড়া সাতমাইল পশুর হাটে দেশি গরুর বিশাল সমারোহ।। ছবি: লোকসমাজ

​​আজিজুল ইসলাম, বাগআঁচড়া (যশোর) সংবাদদাতা ॥ পবিত্র ঈদুল আজহা ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে শেষ মুহূর্তে এসে পুরোদমে জমে উঠেছে দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী বৃহত্তম যশোরের শার্শা উপজেলার ‘বাগআঁচড়া সাতমাইল পশুর হাট’। হাটজুড়ে এখন শুধুই দেশি গরুর রাজত্ব। ছোট, মাঝারি ও বড়—সব আকারের গরুর চোখধাঁধানো সমারোহ থাকলেও এবার ক্রেতাদের মূল আকর্ষণ ও ঝোঁক লক্ষ্য করা যাচ্ছে ছোট ও মাঝারি আকারের পশুর প্রতি।

​সরেজমিনে হাট ঘুরে দেখা গেছে, হাজার হাজার গরুর হাঁকডাকে মুখরিত পুরো বাজার এলাকা। যশোরসহ আশেপাশের বিভিন্ন জেলা থেকে খামারি ও পাইকাররা ট্রাকভর্তি পশু নিয়ে হাজির হয়েছেন এই হাটে। স্থানীয় পাইকারদেরও তৎপরতা ছিল চোখে পড়ার মতো; তারা প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট ছোট হাট থেকে গরু সংগ্রহ করে এই বৃহৎ বাজারে নিয়ে আসছেন।

​হাটে পশুর পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকলেও সাধারণ ক্রেতারা বলছেন, গত বছরের তুলনায় দাম কিছুটা সহনীয় হলেও বাজেটবান্ধব (ছোট ও মাঝারি) গরুর দাম এখনো চড়া। হাটে আসা ক্রেতা শহিদুল ইসলাম জানান: ​”একটি গরুর দাম বিক্রেতা প্রথমে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা চেয়েছিলেন। দীর্ঘক্ষণ দরদামের পর ৯৫ হাজার টাকায় কিনতে পেরেছি। তবে বর্তমান বাজার বিবেচনায় গরুটির দাম ৯০ হাজার টাকার মধ্যে হওয়া উচিত ছিল।”

​এদিকে ক্রেতারা দাম বেশি মনে করলেও খামারিদের কণ্ঠে শোনা গেল ভিন্ন সুর। তাদের অভিযোগ, গো-খাদ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি এবং লালন-পালনের খরচ বেড়ে যাওয়ায় কাঙ্ক্ষিত মূল্য পাচ্ছেন না তারা। নাজমুল নামে এক খামারি আক্ষেপ করে বলেন, “আমার খামারে আটটি গরু ছিল, যার মধ্যে দুটি বিক্রি করেছি। কিন্তু যে পরিমাণ পুঁজি ও শ্রম দিতে হয়েছে, সেই তুলনায় বাজারমূল্য পাচ্ছি না। কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে লোকসান গুনতে হবে।”

​শার্শা উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় কোরবানির জন্য প্রায় ১৬ হাজার গবাদিপশু প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে গরুর সংখ্যাই ১৩ হাজার ১০০টি। বিপরীতে স্থানীয় পর্যায়ে চাহিদা রয়েছে ১২ হাজার ৭২৬টি পশুর। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেশি থাকায় কোরবানির পশুর কোনো সংকট হবে না বলে নিশ্চিত করেছে কর্তৃপক্ষ।

​উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. তপু কুমার সাহা বলেন, ​হাটের প্রতিটি পয়েন্টে প্রাণিসম্পদ দপ্তরের বিশেষ মেডিকেল টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে। ​পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা, গর্ভ পরীক্ষা এবং অসুস্থ পশুর তাৎক্ষণিক চিকিৎসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ​কৃত্রিম উপায়ে ক্ষতিকর ওষুধ খাইয়ে মোটাতাজাকরণ করা কোনো পশু যাতে হাটে প্রবেশ করতে না পারে, সেজন্য কঠোর নজরদারি চালানো হচ্ছে।

​হাটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে পরিচালকের পক্ষে জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, দক্ষিণাঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাট হওয়ায় এখানে দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন। শুরুতে বেচাকেনার গতি কিছুটা ধীর থাকলেও ঈদের ঠিক আগমুহূর্তে বিক্রি কয়েক গুণ বাড়বে।

​সাতমাইল পশুর হাটের ইজারাদার কুদ্দুস আলী বিশ্বাস বলেন, “হাটে দেশি গরু ও ছাগলের পর্যাপ্ত সরবরাহ রয়েছে। ক্রেতা ও বিক্রেতাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। জাল নোট শনাক্তকরণ মেশিন স্থাপনের পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং আমাদের নিজস্ব বিশাল স্বেচ্ছাসেবক টিম মাঠে কাজ করছে। আশা করছি, শেষ মুহূর্তের কেনাবেচায় খামারি ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষই লাভবান হবেন।”

​সব মিলিয়ে, উৎসবের আমেজ আর বিপুল কর্মব্যস্ততায় এখন প্রাণচঞ্চল দক্ষিণাঞ্চলের এই ঐতিহ্যবাহী সাতমাইল পশুর হাট।