৫০ কোটি টাকার যশোর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট : দুর্গন্ধ আর অপূর্ণ স্বপ্ন

0
ছবি: লোকসমাজ।

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোর-নড়াইল মহাসড়ক ধরে হামিদপুরের দিকে এগোলে বাতাসে ভেসে আসে পচা বর্জ্যের তীব্র গন্ধ। কাছে গেলে চোখে পড়ে ময়লার স্তূপ, কোথাও জমে থাকা কালচে পানি। এরই মধ্যে চলছে যানবাহনের চলাচল, বসবাস করছে মানুষ, চলছে দোকানপাট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দৈনন্দিন কার্যক্রম।

এই বর্জ্যের স্তূপের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত যশোরের সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্লান্ট—যা একসময় দেশের প্রথম সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল।

প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য ছিল শহরের বর্জ্য সংগ্রহ করে বাছাই ও প্রক্রিয়াজাত করা, জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদন এবং সেই বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ তৈরি করা। পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্জ্য শুধু সমস্যা নয়, বরং সম্পদে পরিণত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু প্রকল্প চালুর আট বছর পর বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা।

দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ স্থানীয়রা
প্লান্টসংলগ্ন এলাকায় ব্যবসা করেন আব্দুল জব্বার। প্রতিদিনের মতো দোকান খুললেও দুর্গন্ধ থেকে মুক্তি পান না তিনি।

তার ভাষায়, “প্রচণ্ড দুর্গন্ধে এলাকার মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। সন্তানদের নিয়ে আমরা চরম দুর্ভোগে আছি।”

তিনি জানান, বর্ষাকালে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। প্লান্টের পচা বর্জ্য থেকে বের হওয়া দূষিত পানি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে। ওই পানির সংস্পর্শে এসে অনেকের চর্মরোগসহ নানা স্বাস্থ্যসমস্যা দেখা দিচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

শুধু একজন নয়, আশপাশের অধিকাংশ বাসিন্দাই একই ধরনের ভোগান্তির কথা জানিয়েছেন।

প্রতিদিন আসে ৮০ টন বর্জ্য, প্রক্রিয়াজাত হয় মাত্র ১৫-৩০ শতাংশ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন যশোর পৌরসভার প্রায় ৮০ টন বর্জ্য প্লান্টে আনা হয়। তবে এর মধ্যে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে। বাকি অংশ জমে থাকছে প্লান্ট এলাকায়।
ফলে যে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করে সম্পদে রূপান্তর করা, সেখানে প্রতিদিনই নতুন বর্জ্যের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পুরোনো বর্জ্যের স্তূপ।

স্থানীয়দের ভাষ্য, যশোর শহরের দীর্ঘদিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট সমাধানের লক্ষ্যে হামিদপুরে ১৩ দশমিক ২৫ একর জমির ওপর এই প্লান্ট নির্মাণ করা হয়। পরিকল্পনায় ছিল জৈব সার, বায়োগ্যাস ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য পৃথক করে ব্যবহার করা। কিন্তু বাস্তবে বর্জ্য পৃথকীকরণ ব্যবস্থাতেই দেখা দিয়েছে বড় সীমাবদ্ধতা।

‘আধুনিক মেশিন না থাকায় শতভাগ প্রক্রিয়াজাত সম্ভব নয়’
২০২২ সালে প্লান্ট পরিচালনার দায়িত্ব ২০ বছরের জন্য দেওয়া হয় ‘দ্য স্কেট লিমিটেড’-এর কাছে।
প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজার সোহেল রেজা বলেন, বর্তমানে ব্যবহৃত সেগ্রিগেশন মেশিন যশোরের বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী কার্যকর নয়।

তিনি বলেন, “উপযুক্ত ও আধুনিক সেগ্রিগেশন মেশিন না থাকায় শতভাগ বর্জ্য প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক প্রযুক্তি যুক্ত করা গেলে বর্জ্য আলাদা করা ও প্রক্রিয়াজাতের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে।”
তার দাবি, সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও প্রতি মাসে প্রায় ১০০ টন জৈব সার উৎপাদন করা হচ্ছে এবং বাজারে এর চাহিদাও রয়েছে।

থেমে আছে বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন
প্রকল্পটির অন্যতম আকর্ষণ ছিল বায়োগ্যাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন। কিন্তু বর্তমানে সেই কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
সোহেল রেজা জানান, উৎপাদিত গ্যাসের পরিমাণ তুলনামূলক কম হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হচ্ছে না। পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য প্রয়োজনীয় উচ্চ ভোল্টেজ রূপান্তর (হাই-ভোল্টেজ ট্রান্সফর্মেশন) ব্যবস্থাও নেই।

তবে কম গ্যাসে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা চলছে বলে জানান তিনি। ৮ বছরে আয় মাত্র ১৫ লাখ টাকা প্রকল্পটির আর্থিক চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত পৌরসভার আয় হয়েছে প্রায় ১৫ লাখ টাকা। প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটির অন্যতম লক্ষ্য ছিল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি রাজস্ব আয় নিশ্চিত করা। কিন্তু আট বছরে সেই আয় সীমাবদ্ধ থেকেছে কয়েক লাখ টাকায়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও প্রভাবিত
প্লান্টের কাছেই রয়েছে যশোর সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুর রহমান বলেন, আগে খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলার সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ ছিল। বিশেষ করে গরমকালে পচনশীল বর্জ্য ও মৃত প্রাণীর দেহ থেকে এমন দুর্গন্ধ ছড়াত যে মাস্ক পরেও ক্লাসে থাকা কঠিন হয়ে পড়ত।

তিনি জানান, পরে সীমানাপ্রাচীর নির্মাণের ফলে কিছুটা উন্নতি হলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

পরিদর্শনে গিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ প্রতিমন্ত্রীর
প্রায় দেড় মাস আগে প্লান্টটি পরিদর্শন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।

পরিদর্শন শেষে তিনি প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়বহুল এই প্রকল্প কেন প্রত্যাশা অনুযায়ী সফল হলো না, তা খতিয়ে দেখার নির্দেশ দেন তিনি। একই সঙ্গে প্রকল্প বাস্তবায়ন ও পরিচালনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথাও জানান। প্রয়োজন হলে আইনি ব্যবস্থাও নেওয়া হবে বলে সতর্ক করেন তিনি।

সমাধানে বিশেষজ্ঞ কমিটি
যশোর পৌরসভার প্রশাসক রফিকুল হাসান বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার এই মডেলটি একটি ব্যতিক্রমী ও সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হলেও বর্তমানে এটি প্রত্যাশিতভাবে পরিচালিত হচ্ছে না।

তিনি জানান, সমস্যা চিহ্নিত ও সমাধানের জন্য বিশেষজ্ঞ দল এবং উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। পাশাপাশি প্লান্ট এলাকায় ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ এবং জমে থাকা বর্জ্য অপসারণের কাজও চলমান রয়েছে।