অপ্রতিম হত্যার নেপথ্যে আইফোন, ৫ হাজার টাকার পাওনা ও ‘অসম বন্ধুত্ব’

0
ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিম ।। ছবি: সংগৃহীত

একটি আইফোন ছিনিয়ে নিতেই ১৩ বছরের ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে ডেকে নিয়ে হত্যা করা হয়েছে—শুরুতে পুলিশ এমনই ভেবেছিল। কিন্তু তদন্ত যত গড়িয়েছে, সামনে এসেছে পাঁচ হাজার টাকা পাওনা নিয়ে ক্ষোভ, বয়সে বড়দের সঙ্গে তার ‘অসম বন্ধুত্ব’ এবং টিকটক ভিডিও তৈরির প্রলোভনের মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা।

অপ্রতিমের বাবা কে এম ফিরোজ শাহরিয়ারের করা হত্যা মামলায় সাইফুল ইসলাম ওরফে তুহিনসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা পুলিশ। তুহিন ছাড়া অন্য দুজন কিশোর, যাদের বয়স ১৫ বছরের কাছাকাছি। এদের বাইরে আরেক তরুণের সম্পৃক্ততা আছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া অপ্রতিমের সঙ্গে যাঁদের ওঠাবসা ছিল, তাঁরা তার সহপাঠী নন, বয়সেও বেশ বড়। তদন্তে তাঁদের একসঙ্গে তোলা ছবি, ভিডিও এবং টিকটকের জন্য তৈরি বিভিন্ন বিষয় পাওয়া গেছে, যাকে পুলিশ ‘অসম বন্ধুত্ব’ হিসেবে বর্ণনা করছে।

‘আইফোন দিয়ে টিকটক বানাব’

ঘটনার দিন গত শুক্রবার অপ্রতিমকে বাসা থেকে বের করে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মুঠোফোনের খুদে বার্তার। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, সেদিন অপ্রতিমের কাছে থাকা ফোনে বারবার বার্তা পাঠাচ্ছিলেন তুহিন এবং বাসা থেকে বের হতে বলছিলেন। একপর্যায়ে বলা হয়, অপ্রতিমের কাছে থাকা দামি আইফোন ১৭ প্রো ম্যাক্সটি দিয়ে তাঁরা টিকটকের জন্য ভিডিও বানাবেন ও ছবি তুলবেন। এতে রাজি হয়ে বেলা আড়াইটার দিকে মায়ের আইফোনটি নিয়ে বের হয়ে যায় অপ্রতিম।

বেলা ৩টা থেকে ৩টা ১০ মিনিটের মধ্যে তুহিনের সঙ্গে অপ্রতিমের দেখা হয়। এরপর বিভিন্ন এলাকার অন্তত চারটি সিসিটিভি ক্যামেরায় তাদের গতিবিধি ধরা পড়ে। ফুটেজে তাদের স্বাভাবিক ভঙ্গিতে হেঁটে যেতে দেখা যায় এবং পেছনে আরও দুজনকে দেখা যায়।

দেড় কিলোমিটার ভেতরের নির্জন জঙ্গল

অপ্রতিমকে হত্যা করা হয় লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার একটি নির্জন জঙ্গলে। মূল সড়ক থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার ভেতরে কাঁচা রাস্তা দিয়ে সেখানে যেতে হয়। পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত অনুযায়ী, শুক্রবার বিকেল পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে অপ্রতিমের কাছ থেকে ফোনটি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়। সে বাধা দিলে ধস্তাধস্তি শুরু হয়। তুহিন প্রথমে বাঁশের লাঠি দিয়ে অপ্রতিমের মাথায় আঘাত করেন এবং পরে অন্যরাও আঘাত করে। অপ্রতিমের মৃত্যু হলে তারা ফোনটি নিয়ে চলে যায়। রাতে বুনো শিয়াল মরদেহ টানাটানি করায় কিছু ক্ষত তৈরি হয়ে থাকতে পারে, যা ফরেনসিক পর্যালোচনায় দেখা হচ্ছে।

পাঁচ হাজার টাকার আরেক হিসাব

তদন্তে আইফোনের পাশাপাশি পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে আরেকটি বিরোধের তথ্য পেয়েছে পুলিশ। অপ্রতিমের বাবার মুঠোফোনের যন্ত্রাংশ বিক্রির প্রতিষ্ঠান ‘ইয়েসটেক’-এ কাজ করত গ্রেপ্তার হওয়া ১৫ বছর বয়সী এক কিশোর। ওই কিশোরকে পাঁচ হাজার টাকা ধার দিয়েছিল অপ্রতিম এবং সম্প্রতি সে টাকা ফেরত চাইছিল। পুলিশ জানায়, এতে ওই কিশোর অপ্রতিমের ওপর বিরক্ত ছিল এবং অপ্রতিম বেঁচে না থাকলে টাকা ফেরত দিতে হবে না—এমন ভাবনাও তার মধ্যে কাজ করেছিল।

একটি ফোনকল থেকে খুলতে থাকে জট

শনিবার সকাল নয়টার দিকে তুহিনকে হেফাজতে নেওয়ার সময়ও পুলিশ জানত না যে অপ্রতিম মারা গেছে। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মরদেহ পাওয়ার খবর আসে। দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর রাত আটটার দিকে তুহিন ঘটনায় সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করলেও অন্যদের নাম বলতে চাননি। তবে তুহিনকে জিজ্ঞাসাবাদের সময় তাঁর মুঠোফোনে বারবার একটি নম্বর থেকে ফোন আসছিল। ফোন করছিল অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানে কাজ করা ওই কিশোর। বিষয়টি নজরে আসার পর পুলিশ তাকে আটক করে। আটক করার সময়ও তার গায়ে অপ্রতিমের বাবার প্রতিষ্ঠানের নাম লেখা টি-শার্ট ছিল। তাকে আটকের পরই তুহিন অন্য কিশোরের নাম প্রকাশ করেন।

নিজের ফোন নেয়নি কেন ও ফোন উদ্ধার

অপ্রতিমের বাবার দোকানে কাজ করা ১৫ বছর বয়সী কিশোরটি প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা রাখত। ঘটনার দিন নিজের মুঠোফোন সঙ্গে না নিয়ে পরিবারের অন্য একজনের ফোন নিয়ে বের হয়েছিল সে, যাতে ট্র্যাকিংয়ে তার অবস্থান ধরা না পড়ে। হত্যার পর আইফোনটি নিয়ে নিজ বাড়িতে চলে যান তুহিন এবং তাঁর ছোট ভাই তুষারকে তা লুকিয়ে রাখতে বলেন। শনিবার রাত আটটার দিকে পুলিশ তুহিনের বাড়িতে গেলে তাঁর মা তোশকের নিচ থেকে ফোনটি বের করে দেন।

‘অসম বন্ধুত্ব’ ও সামাজিক উদ্বেগ

বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের শান্ত ও মেধাবী শিক্ষার্থী অপ্রতিমকে নিজেদের দলে ভেড়ানোর চেষ্টা করছিল বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন এলাকার বয়সভিত্তিক গ্যাং গঠন করা তুহিন ও তার সঙ্গীরা। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ও স্থানীয় ঈদগাহে জানাজা শেষে অপ্রতিমকে দাফন করা হয়। এ ঘটনা সন্তানদের সামাজিক মেলামেশা, মুঠোফোনকেন্দ্রিক বিপদ এবং কিশোর অপরাধের ঝুঁকি নিয়ে সমাজে তীব্র প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।