সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশ কয়রায়, তবু পর্যটনের মানচিত্রে উপেক্ষিত সম্ভাবনার জনপদ

প্রকৃতি, ইতিহাস ও উপকূলীয় জীবনঘেরা জনপদ অপেক্ষায় পরিকল্পিত উদ্যোগের

0
সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশ কয়রায়, তবু পর্যটনের মানচিত্রে উপেক্ষিত সম্ভাবনার জনপদ
প্রতীকী ছবি- লোকসমাজ

জি এম রিয়াজুল আকবর, কয়রা (কয়রা) খুলনা : ছোট্ট একটি গ্রাম—তেঁতুলতলার চর। তিন দিক ঘিরে বয়ে গেছে কয়রা নদী। নদীর প্রস্থ কোথাও ১০০ মিটার, কোথাও তারও কম। ওপারেই বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ সুন্দরবন। গাঢ় সবুজ ম্যানগ্রোভ বন, পাখির কলতান, বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি আর নদীর নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ মিলিয়ে এলাকাটি যেন প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক অনন্য গন্তব্য।

খুলনার কয়রা উপজেলার মহেশ্বরীপুর ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত তেঁতুলতলার চর সুন্দরবনকে খুব কাছ থেকে দেখার অন্যতম স্থান। স্থানীয়দের ভাষ্য, কখনো বাঘের গর্জন, কখনো বানর কিংবা চিত্রা হরিণের দেখা মেলে এ এলাকায়। নদীতে দেখা যায় শুশুক, কখনো কুমিরও। সূর্যাস্তের সময় নদী, বন ও আকাশের রঙের মিশেলে সৃষ্টি হয় মনোমুগ্ধকর দৃশ্য।

শাকবাড়িয়া নদীর এক পাড়ে লোকালয়, অন্য পাড়ে সুন্দরবনের সবুজ বিস্তার। কেওড়া-গরানের সারি, জোয়ার-ভাটার খাল, নৌকার ছলাৎ-ছলাৎ শব্দ আর পাখির ডাক মিলিয়ে তৈরি হয় এক অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশ। অথচ এমন সম্ভাবনাময় এলাকা এখনও পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি।

সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় অংশ কয়রা উপজেলার আওতায় হলেও এখানে গড়ে ওঠেনি কোনো পরিকল্পিত পর্যটনকেন্দ্র। পর্যটকদের জন্য নেই পর্যাপ্ত অবকাঠামো, আবাসন কিংবা বিনোদন সুবিধা।

নদী, খাল, বনভূমি, জীববৈচিত্র্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও উপকূলীয় জীবনযাত্রার সমন্বয়ে কয়রা বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু দেশের পর্যটন মানচিত্রে এখনও অনেকটাই আড়ালে রয়ে গেছে এই জনপদ।

স্থানীয়দের মতে, পর্যটনকেন্দ্রিক পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে শুধু সুন্দরবন ভ্রমণের সুযোগই বাড়বে না, স্থানীয় মানুষের জন্যও নতুন কর্মসংস্থান ও আয়ের পথ তৈরি হবে।

উপকূল ও সুন্দরবন সংরক্ষণ আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক সাইফুল ইসলাম বলেন, “কয়রার কয়েকটি এলাকায় লোকালয়ের খুব কাছ থেকেই সুন্দরবনের পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর উপস্থিতি অনুভব করা যায়। স্থানীয় মানুষকে সম্পৃক্ত করে এখানে একটি কার্যকর ইকোট্যুরিজম মডেল গড়ে তোলা সম্ভব, যা আর্থসামাজিক উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে।”

রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস-ঐতিহ্য

কয়রার পর্যটন সম্ভাবনা শুধু সুন্দরবনকে ঘিরে নয়। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে আছে নদী, খাল, বিল, সবুজ প্রকৃতি এবং উপকূলীয় জনজীবনের বৈচিত্র্য। পাশাপাশি রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন।

সুন্দরবনের বৃহত্তর অংশ কয়রায়, তবু পর্যটনের মানচিত্রে উপেক্ষিত সম্ভাবনার জনপদ
প্রতীকী ছবি- লোকসমাজ

মসজিদকুঁড় মসজিদ এ অঞ্চলের অন্যতম প্রাচীন স্থাপনা। সুলতানি আমলের এ মসজিদকে ঘিরে গড়ে উঠেছে স্থানীয় ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এছাড়া প্রাচীন দিঘি, বিভিন্ন মাজার, রাজা প্রতাপাদিত্যের স্মৃতিচিহ্ন এবং খানজাহান আলীর (রহ.) অনুসারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা এ অঞ্চলকে দিয়েছে স্বতন্ত্র ঐতিহাসিক পরিচয়।

পর্যটন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কয়রার সঙ্গে পাইকগাছার রাড়ুলিকেও যুক্ত করে একটি সমন্বিত পর্যটন সার্কিট গড়ে তোলা সম্ভব। বিজ্ঞানী আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের স্মৃতিবিজড়িত রাড়ুলি এ অঞ্চলের পর্যটন আকর্ষণ আরও বাড়াতে পারে।

পর্যটনের সম্ভাবনার বিপরীতে সবচেয়ে বড় বাধা অবকাঠামোগত দুর্বলতা। পর্যটকদের থাকার মতো মানসম্মত হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ কিংবা উন্নতমানের রেস্টুরেন্ট নেই বললেই চলে।

এছাড়া পর্যটন তথ্যকেন্দ্র, নির্দিষ্ট নৌঘাট, প্রশিক্ষিত গাইড, বিনোদন সুবিধা এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থারও অভাব রয়েছে। কিছু এলাকায় সড়ক যোগাযোগ এখনও পর্যটনবান্ধব নয়। নৌপথে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার ঘাটতি রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা ও যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করে পর্যটনবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

পরিকল্পিত পর্যটন শিল্প গড়ে উঠলে কয়রার অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। আবাসন, পরিবহন, খাবার, নৌযান, স্থানীয় পণ্য ও হস্তশিল্পকে ঘিরে নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হবে।

তরুণদের জন্য ট্যুর গাইড, নৌযানচালক ও পর্যটনসেবা কর্মী হিসেবে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হতে পারে। নারীদের জন্যও কুটিরশিল্প, হস্তশিল্প এবং স্থানীয় খাবারভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ বাড়বে।

বাংলাদেশ মানবাধিকার ব্যুরো, কয়রা উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “পরিকল্পিত পর্যটন শিল্প গড়ে উঠলে সুন্দরবনের সৌন্দর্যের পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের জীবনেও নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।”

কয়রা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ উদ্দিন বলেন, “ম্যানগ্রোভভিত্তিক ইকোট্যুরিজম উপকূলীয় মানুষের বিকল্প জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পারে। তবে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করা জরুরি।”

কলামিস্ট ও সাংবাদিক ফরহাদ হোসেনের মতে, “কয়রা সুন্দরবনের একটি আদর্শ ‘গেটওয়ে’ হতে পারে। নৌপথে সহজ যোগাযোগ এবং অভয়ারণ্যের নৈকট্য পর্যটকদের জন্য অনন্য অভিজ্ঞতা এনে দিতে সক্ষম।”

পাঁচ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি পর্যটন প্রকল্প

কয়রার পর্যটন সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ২০২১ সালের ১১ অক্টোবর দক্ষিণ বেদকাশীর গোলখালী এলাকায় পর্যটনকেন্দ্র নির্মাণের অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড। একই অর্থবছরে খুলনা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ১ কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

তবে নির্ধারিত স্থানটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আওতায় পড়ায় বন বিভাগের আপত্তিতে কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে প্রকল্পের স্থান পরিবর্তন করে কয়রা সদর ইউনিয়নের কেওড়াকাটা এলাকায় নির্ধারণ করা হয়।

নতুন স্থানে পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হলেও বিল পরিশোধসংক্রান্ত জটিলতায় প্রকল্পের নির্মাণকাজ থমকে রয়েছে।

কয়রা উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, “স্থান পরিবর্তনের কারণে কিছুটা সময় লেগেছে। নতুন স্থানে পাইলিংয়ের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তবে বিলের একটি অংশ ছাড় না হওয়ায় ঠিকাদার বর্তমানে কাজ বন্ধ রেখেছেন।”