যবিপ্রবিতে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি নির্দেশনা

১১ অক্টোবর সিগারেট ধরানো নিয়ে বিরোধ, এর আগে হলে শিক্ষার্থীকে মারধরে কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার অভিযোগ

0
যবিপ্রবিতে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি নির্দেশনা
কোলাজ এআই সহায়তায়- লোকসমাজ

স্টাফ রিপোর্টার, লোকসমাজ : সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ, মারধর ও একের পর এক উত্তেজনাকর ঘটনার পর ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি নির্দেশনা জারি করেছে যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (যবিপ্রবি) প্রশাসন। জুনিয়রদের প্রতি সিনিয়রদের হয়রানি, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও অযৌক্তিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বন্ধের পাশাপাশি সিনিয়রদের প্রতি জুনিয়রদের শালীন ও সম্মানজনক আচরণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নির্দেশনায়। বিরোধ দেখা দিলে দলীয় সংঘাতে না জড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা নেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ১১ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মো. রাফিউল হাসান স্বাক্ষরিত এ নির্দেশনায় বলা হয়, বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের সিনিয়র ও জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যে পারস্পরিক সৌহার্দ্য, শ্রদ্ধাবোধ, শিষ্টাচার ও সম্প্রীতিপূর্ণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও ভুল-বোঝাবুঝি, অসৌজন্যমূলক আচরণ ও সহনশীলতার অভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিত দূরত্ব এবং বিরূপ পরিস্থিতির সৃষ্টি হচ্ছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও ক্যাম্পাসের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া একাধিক অপ্রীতিকর ঘটনার প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের এ নির্দেশনা শিক্ষার্থীদের পারস্পরিক সম্পর্ক ও ক্যাম্পাসের শৃঙ্খলা রক্ষার বিষয়টিকে নতুন করে সামনে এনেছে।

সিগারেট ধরানো নিয়ে বিরোধ, হলে যাওয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা

যবিপ্রবিতে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি নির্দেশনা
গত ১১ অক্টোবর মার্কেটিং বিভাগ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সিগারেট ধরানো এবং র‌্যাগিং-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয় – সংগৃহীত ছবি

গত ১১ অক্টোবর মার্কেটিং বিভাগ ও ইন্ডাস্ট্রিয়াল অ্যান্ড প্রোডাকশন ইঞ্জিনিয়ারিং (আইপিই) বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সিগারেট ধরানো এবং র্যাগিং-সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয়। এ নিয়ে বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে বিকেলে মার্কেটিং বিভাগের একদল শিক্ষার্থী অভিযুক্তদের মারধর করতে মুন্সী মেহেরুল্লাহ হলের দিকে অগ্রসর হলে ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

এ সময় উত্তেজিত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটক আটকে স্লোগান ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রক্টর ও হল প্রভোস্টরা এগিয়ে আসেন। পরে তাঁদের উপস্থিতিতে দীর্ঘ সমঝোতা বৈঠকের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

সিগারেট ধরানো ও র্যাগিং-সংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ কীভাবে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে উত্তেজনায় রূপ নেয়, এ ঘটনা তা নিয়ে ক্যাম্পাসে শৃঙ্খলা রক্ষার প্রশ্ন সামনে এনেছে।

আগের ঘটনাতেও উত্তপ্ত হয়েছিল ক্যাম্পাস
এর আগেও সিনিয়র-জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরোধ ও আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে যবিপ্রবি ক্যাম্পাসে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। গত ২ অক্টোবর শহীদ মশিয়ুর রহমান হলে গোসল করাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় মারার ঘটনায় তাঁর কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠে।

যবিপ্রবিতে সিনিয়র-জুনিয়র দ্বন্দ্ব, শৃঙ্খলা ফেরাতে জরুরি নির্দেশনা
গত ২ অক্টোবর শহীদ মশিয়ুর রহমান হলে গোসল করাকে কেন্দ্র করে এক শিক্ষার্থীকে থাপ্পড় মারার ঘটনায় তাঁর কানের পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার গুরুতর অভিযোগ ওঠে- লোকসমাজ

এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্তের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত কারণ ও দায়ীদের চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

পরপর এসব ঘটনায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আবাসিক হলের পরিবেশ এবং সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কের ধরন নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। শিক্ষাঙ্গনে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিভাবকসুলভ সম্পর্কের পরিবর্তে ভয়ভীতি, কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা কিংবা সংঘাতের প্রবণতা দেখা দিলে তা শিক্ষা ও স্বাভাবিক সহাবস্থানের পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।

এ বিষয়ে যবিপ্রবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইয়ারুল কবীর গণমাধ্যমে বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার গুণগত মান ও সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে প্রশাসন যেকোনো মূল্যে বদ্ধপরিকর। ক্যাম্পাসে র‌্যাগিং, শারীরিক ও মানসিক হেনস্তা কিংবা শৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ড কোনোভাবেই বরদাশত করা হবে না। তাঁর ভাষায়, সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্ক হতে হবে স্নেহ ও শ্রদ্ধার; সেখানে ভীতি কিংবা আধিপত্য প্রদর্শনের কোনো জায়গা নেই।

তিনি আরও জানিয়েছেন, আগের ঘটনাগুলোর বিষয়ে গঠিত তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রয়োজনে ক্যাম্পাস থেকে স্থায়ী বহিষ্কারের মতো সিদ্ধান্তও নেওয়া হতে পারে।
জুনিয়রদের সম্মান, সিনিয়রদের দায়িত্বশীল আচরণের নির্দেশ

প্রশাসনের নির্দেশনায় ২০২৫-২০২৬, ২০২৪-২০২৫ ও ২০২৩-২০২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীদের সিনিয়রদের সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সৌজন্য ও আন্তরিকতার ভিত্তিতে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কথাবার্তা, চলাফেরা, সামাজিক যোগাযোগ ও অন্যান্য কর্মকাণ্ডে মার্জিত ভাষা, ভদ্রতা ও শালীনতা বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে অশোভন মন্তব্য, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, অসম্মানজনক ব্যবহার ও উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, সিনিয়র শিক্ষার্থীদের জুনিয়রদের প্রতি স্নেহশীল, সহনশীল, সহমর্মী, দায়িত্বশীল ও সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ প্রদর্শনের অনুরোধ জানানো হয়েছে। নতুন শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম, ক্যাম্পাসের পরিবেশ, নিয়মশৃঙ্খলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে পরিচিত হতে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেওয়ার দায়িত্বও সিনিয়রদের ওপর গুরুত্বসহকারে তুলে ধরা হয়েছে।

নির্দেশনায় জুনিয়র শিক্ষার্থীদের প্রতি অবজ্ঞা, অপমান, ভয়ভীতি প্রদর্শন, অযৌক্তিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা এবং মানসিক বা শারীরিক হয়রানিমূলক আচরণ থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ, সিনিয়র-জুনিয়র সম্পর্কের নামে কোনো ধরনের নিপীড়ন বা জবরদস্তিকে প্রশ্রয় না দেওয়ার বিষয়টি প্রশাসনের নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে।

বিরোধ হলে দলীয় সংঘাত নয়, নিতে হবে প্রশাসনের সহায়তা

সিনিয়র ও জুনিয়র শিক্ষার্থীদের মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি, বিরোধ কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে ব্যক্তিগতভাবে বা দলীয়ভাবে সংঘাতে জড়িয়ে তা সমাধানের চেষ্টা না করার নির্দেশ দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট বিভাগের চেয়ারম্যান, টিউটোরিয়াল বডি এবং ছাত্র পরামর্শ ও নির্দেশনা দপ্তরের সহযোগিতা নিতে বলা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রচলিত বিধিবিধান পরিপন্থী কোনো কর্মকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা পর্যালোচনা করে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও নির্দেশনায় জানানো হয়েছে।
সব শিক্ষার্থীর প্রতি প্রশাসনের আহ্বান—পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সৌহার্দ্য, শিষ্টাচার, সহনশীলতা ও সম্প্রীতি বজায় রেখে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। সাম্প্রতিক বিরোধ ও মারধরের ঘটনাগুলোর পর এ নির্দেশনা বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়, এখন সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।