খুলনায় নাসিম হত্যা: জমি কেনাবেচার বিরোধ নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ড কোন্দল?

0
খুলনায় নাসিম হত্যা: জমি কেনাবেচার বিরোধ নাকি আন্ডারওয়ার্ল্ড কোন্দল?

খুলনা ব্যুরো, লোকসমাজ: খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় নিষিদ্ধ চরমপন্থি সংগঠন ‘পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (এমএল-জনযুদ্ধ)’–এর আঞ্চলিক নেতা নাসিমুল গনি ওরফে নাসিম হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ৭ থেকে ৮ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। সোমবার রাতে নিহতের স্ত্রী মোছা. সেলিনা খাতুন দিঘলিয়া থানায় মামলাটি করেন।

মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের পাশাপাশি জীবদ্দশায় নাসিমকে হত্যার হুমকি দেওয়া চার ব্যক্তির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এজাহারে আধিপত্য বিস্তার, জমি-সংক্রান্ত বিরোধ এবং আন্ডারওয়ার্ল্ডের পুরোনো দ্বন্দ্বের বিষয়টিকে হত্যাকাণ্ডের সম্ভাব্য কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

যেভাবে ঘটানো হয় হত্যাকাণ্ড

মামলার এজাহার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৪ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে দিঘলিয়ার ফরমাইশখানা এলাকায় নিজ বাড়ির সামনে তৈয়ব আলীর চায়ের দোকানে বসে ছিলেন নাসিমুল গনি। এ সময় একটি ভ্যানে করে আসা দুই অস্ত্রধারী দুর্বৃত্ত তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।

প্রাণ বাঁচাতে তিনি পাশের একটি ভ্যান চার্জিং গ্যারেজে আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করলে হামলাকারীরা ধাওয়া করে খুব কাছ থেকে তার মাথা ও শরীরে পরপর কয়েক রাউন্ড গুলি করে। গুলির শব্দ শুনে নিহতের স্ত্রী বাড়ির তৃতীয় তলার বারান্দা থেকে চিৎকার করলে হামলাকারীরা দ্রুত ভ্যানে উঠে দৌলতপুর ঘাটের দিকে পালিয়ে যায়।

পরে গুরুতর আহত অবস্থায় নাসিমকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

পুরোনো বিরোধের জের?

পরিবার ও অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, অঞ্চলভিত্তিক আধিপত্য, জমি ব্যবসা এবং চরমপন্থি উপদলগুলোর দীর্ঘদিনের বিরোধের কারণে দৌলতপুর এলাকার কয়েকজন ব্যক্তির সঙ্গে নাসিমুল গণির শত্রুতা ছিল। তিনি আগেই নিজের প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা পরিবারকে জানিয়েছিলেন।

নিহতের পরিবারের অভিযোগ, অতীতের বিভিন্ন বিরোধ এবং আরেক চরমপন্থি নেতা শহীদ হত্যার ঘটনায় নাসিমকে সন্দেহ করার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে ভাড়াটে খুনি দিয়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, একসময় জনযুদ্ধের সক্রিয় আঞ্চলিক নেতা হিসেবে পরিচিত নাসিমুল গনির বিরুদ্ধে হত্যা, অস্ত্রসহ একাধিক মামলা ছিল। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকার পর তিনি এলাকায় ফিরে জমি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হন। পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতিতেও সম্পৃক্ত ছিলেন বলে জানা গেছে।

সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে হামলাকারীরা

হত্যাকাণ্ডের তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, একটি ব্যাটারিচালিত বা সাধারণ ভ্যানে করে দুই যুবক ঘটনাস্থলে আসে।

ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, তারা চায়ের দোকানের সামনে নেমে নাসিমের কাছে যায়। পরে তাদের একজন কাছ থেকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি চালায়। হত্যাকাণ্ডের পর দুজনই একই ভ্যানে উঠে দ্রুত এলাকা ত্যাগ করে।

পুলিশ জানিয়েছে, ফুটেজ বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহভাজনদের শনাক্তের কাজ চলছে এবং গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান শুরু হয়েছে।

হত্যার পরই বদলি ওসি

চাঞ্চল্যকর এ হত্যাকাণ্ডের একদিনের মাথায় দিঘলিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাওলাদার সানোয়ার হোসাইন মাসুমকে প্রত্যাহার করে খুলনা পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে থানার নতুন ওসি হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশ পরিদর্শক অরূপ কুমার চৌধুরীকে।

খুলনা জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক বলেন, প্রশাসনিক কার্যক্রমে গতিশীলতা আনা এবং তদন্তকে আরও নিরপেক্ষ ও দ্রুতগতির করতে এই বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

পুলিশের তৎপরতা

নবনিযুক্ত ওসি অরূপ কুমার চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করেছেন।

জেলা পুলিশ সুপার সরকার ওমর ফারুক জানান, হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারী ও সরাসরি জড়িতদের চিহ্নিত করতে জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং থানা পুলিশের একাধিক টিম যৌথভাবে কাজ করছে।

পুলিশের ভাষ্য, ঘটনাটি আন্ডারওয়ার্ল্ডের অভ্যন্তরীণ কোন্দল, আধিপত্য বিস্তার কিংবা জমি ব্যবসাকেন্দ্রিক বিরোধের ফল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সিসিটিভি ফুটেজ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে ঘাতকদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।