মজুদ-আতঙ্কে জ্বালানি সংকট, যশোরে অভিযানে মিলছে অবৈধ তেলের খোঁজ

0
ছবি: লোকসমাজ।

আকরামুজ্জামান ॥ গুজব ও আতঙ্কে অতিরিক্ত মজুদের প্রবণতায় যশোরে জ্বালানি তেলের কৃত্রিম সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। প্রয়োজনের তুলনায় বেশি তেল সংগ্রহের কারণে বাজারে অস্বাভাবিক চাপ তৈরি হয়েছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে সরবরাহ ব্যবস্থায়। প্রশাসনের ধারাবাহিক অভিযান ও নজরদারির মধ্যেই একের পর এক অবৈধ মজুদের ঘটনা সামনে আসছে, যা সংকটের অন্তর্নিহিত কারণকে স্পষ্ট করছে।

সর্বশেষ রোববার বিকেলে তেল মজুদ থাকা সত্বেও গ্রাহকদের মাঝে সরবরাহ না করার অপরাধে শহরের মণিহার এলাকার যাত্রীক পেট্রোলিয়াম তেলপাম্প কর্তৃপক্ষকে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে ভ্রাম্যমান আদালত।

এর আগে শনিবার (২৮ মার্চ) বিকেলে মণিরামপুর উপজেলার খেদাপাড়া বাজার এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ৮৭৫ লিটার জ্বালানি তেল ও ৮৫০ লিটার লুব্রিকেন্ট জব্দ করা হয়।

অভিযান পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মাহির দায়ান আমিন। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত এ অভিযানে তবিবর রহমান নামে এক ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে এসব জ্বালানি উদ্ধার করা হয়। তিনি নিজের পাশাপাশি পাশের ব্যবসায়ী গোবিন্দ দাসের ধানের গুদাম ব্যবহার করে প্লাস্টিকের ড্রামে তেল লুকিয়ে রেখেছিলেন।

অভিযান সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জব্দকৃত তেলের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে ব্যর্থ হন অভিযুক্ত ব্যবসায়ী। ভ্রাম্যমাণ আদালত তাকে তাৎক্ষণিকভাবে জরিমানা করেন এবং জব্দকৃত তেল রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় সংরক্ষণের নির্দেশ দেন। ভবিষ্যতে এমন অপরাধে জড়িত হলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও সতর্ক করা হয়েছে।

এর আগে গত ৮ মার্চ জেলার চৌগাছা উপজেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের আরেক অভিযানে অবৈধভাবে মজুদ করা প্রায় ৬ হাজার লিটার জ্বালানি তেল জব্দ করা হয়। একইসঙ্গে একটি ফিলিং স্টেশনসহ তিন ব্যবসায়ীকে মোট ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। যশোর জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শোয়েব হাসানের নেতৃত্বে পরিচালিত ওই অভিযান জেলায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

ভ্রাম্যমাণ আদালতের বিচারক মাহির দায়ান আমিন বলেন, ‘কিছু অসাধু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জনের চেষ্টা করছেন। আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি এবং কোনো ধরনের অনিয়ম বরদাশত করা হবে না।’

এদিকে ২৯ মার্চ রোববার শহরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা গেছে, অধিকাংশ পাম্পে ‘তেল নেই’ সাইনবোর্ড ঝুলছে। কোথাও সীমিত আকারে তেল বিক্রি হলেও মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। অনেক চালককে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরে গিয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে ব। তবুও চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে বলে তারা জানান।

সচেতন মহলের মতে, এই সংকটের পেছনে সরবরাহ ঘাটতির চেয়ে আতঙ্কজনিত অস্বাভাবিক চাহিদাই বেশি দায়ী। শহরের বেজপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আগে যেখানে অল্প তেলেই সপ্তাহ পার হয়ে যেত, এখন অনেকে একবারে কয়েকগুণ বেশি তেল কিনে মজুদ করছেন। এতে অন্যরা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সংকট বাড়ছে।

মোটরসাইকেল চালক মাসুদ রানা বলেন, ‘সবার মধ্যে এক ধরনের ভয় কাজ করছে। এই অস্থিরতা না থাকলে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হতো না।’

তবে ফিলিং স্টেশন মালিকদের দাবি, অতিরিক্ত চাহিদার পাশাপাশি সরবরাহেও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে, বিশেষ করে পেট্রোল ও অকটেনের ক্ষেত্রে। তাদের মতে, চাহিদা ও সরবরাহের এই ভারসাম্যহীনতাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক মোহাম্মাদ আশেক হাসান বলেন, ‘জেলায় জ্বালানির প্রকৃত কোনো ঘাটতি নেই। তেলের মজুদ স্বাভাবিক রাখতে জেলা প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছে।’ তিনি জানান, প্রতিটি ফিলিং স্টেশনের কার্যক্রম নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘তেলের অবৈধ মজুদ রুখতে মাঠ পর্যায়ে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। কেউ আইন ভাঙলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

এদিকে জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গত শুক্রবার ও শনিবার যশোরের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশন পরিদর্শন করে অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন এবং দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার ওপর জোর দেন তিনি।