যশোরের এসপি আনিস ও টিএসআই রফিকের বিরুদ্ধে নতুন মামলা

ভাইপো সাঈদ ও শাওনকে গুম ও হত্যার অভিযোগ

0

স্টাফ রিপোর্টার ॥ যশোরের বহুল আলোচিত ভাইপো সাঈদ ও তার সহযোগী শাওনকে অপহরণ, হত্যা ও গুমের অভিযোগে তৎকালীন পুলিশ সুপার (এসপি) আনিসুর রহমান ও ট্রাফিক সার্জেন্ট (টিএসআই) রফিকুল ইসলাম রফিকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে আবারও আদালতে মামলা হয়েছে। রোববার ভাইপো সাঈদের বাবা কাজী তৌহিদুর রহমান খোকন সদর আমলি আদালতে মামলাটি করেন।

সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. রহমত আলী অভিযোগটি আমলে নিয়ে কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। মামলার বাদীপক্ষের আইনজীবী মিলন আহমেদ বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এটি এই ঘটনার প্রথম মামলা নয়। এর আগে ভাইপো সাঈদের মা হীরা বেগম, যিনি বর্তমানে প্রয়াত, ছেলের নিখোঁজ ও গুমের অভিযোগে আদালতে একটি মামলা করেছিলেন। তখন যশোরের এসপি ছিলেন আনিসুর রহমান। মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, এসপি আনিস ও টিএসআই রফিক ভয়ভীতি দেখিয়ে হীরা বেগমকে মামলাটি প্রত্যাহার করতে বাধ্য করেছিলেন।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, হীরা বেগমকে জোর করে তৎকালীন স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা শাহীন চাকলাদারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় এবং সেখানে আটকে রেখে মামলা প্রত্যাহারের জন্য চাপ দেওয়া হয়। এতে রাজি না হলে তাকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে বিদ্যুৎ শক দেওয়া এবং হত্যার হুমকি দিয়ে জোরপূর্বক মামলাটি প্রত্যাহার করানো হয়। এই ঘটনার পর হীরা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং পরে মারা যান।

রোববার কাজী তৌহিদুর রহমান খোকনের করা মামলার অন্য আসামিরা হলেন: যশোর শহরের শংকরপুরের মৃত আনোয়ার হোসেনের ছেলে ও সাবেক পৌর কাউন্সিলর গোলাম মোস্তফা; পিরোজপুর সদর উপজেলার কুমারখালী গ্রামের ফুলু মিয়া, রমিজ শেখ, নাসির শেখ, সাইফুল শেখ, হারুন অর রশিদ শেখ, জাহিদুল শেখ এবং আল আমিন তালুকদার।

কাজী তৌহিদুর রহমান খোকন এজাহারে উল্লেখ করেন, তাদের পৈতৃক বাড়ি পিরোজপুরের কুমারখালীতে। সেখানে তাদের অনেক সম্পত্তি রয়েছে। আসামিদের মধ্যে গোলাম মোস্তফা, এসপি আনিস ও টিএসআই রফিক ছাড়া বাকিরা পিরোজপুরের স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। তারা সাধারণ মানুষের ওপর নির্যাতন, জমি দখল এবং নানা অপরাধে জড়িত।

খোকন জানতে পারেন, তার গ্রামের সম্পত্তি আসামিরা দখল করে নিয়েছে। এই খবর পেয়ে তিনি ২০১৭ সালের ১ এপ্রিল তার ছেলে সাঈদকে গ্রামে পাঠান। সেখানে সাঈদ জমি দখলের প্রতিবাদ করলে আসামিরা তাকে খুন-জখমের হুমকি দেয়। এর কয়েকদিন পর ৫ এপ্রিল সাঈদ ও তার বন্ধু শাওন যশোর শহরের পৌর পার্কে ঘুরতে গেলে আসামি গোলাম মোস্তফাসহ অন্যদের উপস্থিতিতে টিএসআই রফিক তাদের মারধর করে আটক করেন। এই নির্দেশ দিয়েছিলেন তৎকালীন পুলিশ সুপার আনিস।

খোকন জানান, তিনি থানায় গিয়ে কোনো সহায়তা পাননি। পুলিশ সুপারের কাছে গেলে তাকে আশ্বাস দেওয়া হয় তার ছেলেসহ দুজনকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। এই আশ্বাসের পর টিএসআই রফিক ও গোলাম মোস্তফা তাদের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করেন। তবে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী, তাদের আদালতে হাজির করা হয়নি।

হীরা বেগমের ওপর নির্যাতন ও ভয় দেখিয়ে মামলা প্রত্যাহারের পর সাঈদ ও শাওনকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। কাজী তৌহিদুর রহমান খোকনের অভিযোগ, তাদের হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, আসামিরা প্রভাবশালী হওয়ায় সেসময় তিনি মুখ খোলার সাহস পাননি। বর্তমান পরিস্থিতি অনুকূল হওয়ায় তিনি ঘটনার আট বছর পর আবারও আদালতে মামলা করেছেন।

তৎকালীন এসপি আনিসুর রহমান এর আগেও বিভিন্ন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। তার বিরুদ্ধে পুলিশের চাকরি পাইয়ে দেওয়াসহ বিভিন্ন আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ উঠেছিল। এছাড়া, তার কার্যকালে ক্রসফায়ারের নামে বেশ কিছু বিতর্কিত হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছিল, যা নিয়ে তখন জনমনে তীব্র অসন্তোষ ছিল। ভাইপো সাঈদ ও শাওনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাটি তখন ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এবং এর সঙ্গে এসপি আনিসের নাম উঠে আসায় বিষয়টি আরও জটিল রূপ নেয়।