বিএনপির মরা গাঙে ভরা কটালের ভয়াবহ পরিণতি

গোলাম মাওলা রনি
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি অতি দামি একটি কথা বলেছেন। কথাটি অতি সাধারণ, তবে আপনি যদি কথার ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখানকার কাব্যরহস্য ভেদ করার চেষ্টা করেন তবে অতি মূল্যবান কিছু পেলেও পেয়ে যেতে পারেন। জনাব কাদের বলেন, বিএনপির মরা গাঙে আর কোনো দিন জোয়ার আসবে না। জোয়ারকে আমরা সচরাচর কটাল বলে থাকি। যখন জোয়ার প্রবল থাকে অর্থাৎ নদী-সমুদ্র-খাল-বিল জোয়ারের পানিতে থৈ থৈ করতে থাকে তখন আমরা তাকে ভরা কটাল বলি। অন্য দিকে, ভাটার টানে যখন জোয়ারের পানি সমুদ্রে চলে যায় তখন ভাটার অন্তিম সময়ে পানির দুর্বল নিম্নমুখী গতি এবং শূন্য নদী-নালা যখন পানির জন্য হাহাকার করে তখন আমরা সেটিকে মরা কটাল বলি। জনাব কাদের তার বক্তব্যে অবশ্য ভরা কটাল বা মরা কটাল নিয়ে কিছু বলেননি। তিনি বিএনপিকে একটি মরা গাঙ বা মৃত নদী হিসেবে আখ্যা দিয়ে বলেছেন, ওখানে আর জোয়ার আসবে না। তার বক্তব্যের মধ্যে কবিতার ঢং রয়েছে আরো আছে অন্তর্নিহিত তাৎপর্য। তিনি বিদ্বান লোক এবং বিদূষী মহিলার স্বামী। তিনি যার রাজনীতি করেন তিনিও বিদ্যার জন্য প্রশংসিত এবং সম্প্রতি তার দলের নেতাকর্মী দ্বারা বিদ্যানন্দিনী উপাধিপ্রাপ্ত হয়েছেন। সুতরাং এহেন বিদ্যাবুদ্ধির পরিমণ্ডলে যখন একটি বাক্য নির্গত হয় যেখানে ব্যাকারণগত ভুল ছাড়াও প্রকৃতিবিরুদ্ধ তথ্য-উপাত্ত থাকে তখন সেই বাক্যের সাহিত্য সমালোচনা করা অবশ্য কর্তব্য হয়ে দাঁড়ায় বিধায় আমি আজকের এই শিরোনামে কিছু লেখার প্রেরণা বোধ করছি।
ওবায়দুল কাদেরের মরা গাঙ যদি ধর্তব্যের মধ্যে আনি তবে শব্দটির বিপরীত হলো ভরা গাঙ। বিএনপি যদি মরা গাঙ হয় তখন ভরা গাঙটি যে আওয়ামী লীগের দখলে তা কাউকে বলে বোঝানোর দরকার নেই। দ্বিতীয়ত বিএনপির গাঙটি একসময় জীবিত ছিল, সেই গাঙে জোয়ার ছিল, জোয়ারের পানির সাথে বাহারি মৎস্যসম্পদ এবং জলজ উদ্ভিদ ছিল। বিএনপির গাঙের যখন মরণ দশা হলো তখন সেখানকার তাবত জোয়ারের পানি এবং পানিজাত অন্যান্য পদার্থ নিশ্চয়ই ভাটার টানে বিএনপির গাঙ থেকে আওয়ামী গাঙে জায়গা করে নিয়েছে। ফলে ভরা পূর্ণিমা অথবা ভরা অমাবস্যার প্রবল জোয়ারে আওয়ামী গাঙ এখন পানিতে টইটম্বুর। আমরা যারা ভাটির দেশের মানুষ তারা খুব ভালো করে জানি, জোয়ার ভাটা প্রকৃতির নিরন্তর এক খেলা, যা মাত্র ছয় ঘণ্টা স্থায়ী হয়। জোয়ারের পর ভাটা এবং ভাটার পর জোয়ার প্রকৃতির এই অমোঘ নিয়ম আজ অবধি দুনিয়ার কেউ রোধ করতে পারেনি। ভাটির দেশে প্রতি চব্বিশ ঘণ্টায় যেমন দু’বার জোয়ার এবং দু’বার ভাটা পর্যায়ক্রমে ঘটতে থাকে ঠিক তেমনটি কিন্তু উজানের দেশে ঘটে না। উজান দেশের জোয়ার ভাটা বছরে দু’বার হয়। আষাঢ় শ্রাবণে সব নদ-নদী জোয়ারের পানিতে থৈ থৈ করতে থাকে এবং চৈত্র-বৈশাখ মাসে আবার নদ-নদীগুলো শুকিয়ে কোনোটি মৃত রূপ বা অর্ধমৃত রূপ ধারণ করে। জোয়ার ভাটার অনাদি রূপ মানুষের জীবনে কিভাবে উদাহরণ হিসেবে কাজ করে তার একটি উল্লেখযোগ্য নমুনা আমরা একটি বাংলা গানের মধ্যে দেখতে পাই। লোকসঙ্গীত শিল্পী রথীন্দ্রনাথ রায়ের কণ্ঠে গানটি শোনেননি এমন লোক এ দেশে খুব কমই আছে। বিখ্যাত সেই গানের প্রথম চরণে বলা হয়েছে, যৌবন জোয়ার একবার আসে রে বন্ধু! চলে গেলে আর আসে না। যৌবনকালে বন্ধু মিলে। শেষকালে ভালোবাসে না। এরপর বলা হয়েছে- ‘নদীর জোয়ার চলে যায় ফিরে পায় শ্রাবণে…।’ জনাব ওবায়দুল কাদের যদি বিএনপিকে ব্যক্তি মনে করেন অথবা কেবল খালেদা জিয়াকেন্দ্রিক মনে করেন তবে তার বক্তব্য ঠিক আছে অর্থাৎ বিএনপিতে আর যৌবন আসবে না, জোয়ারও আসবে না। কিন্তু তিনি যদি বিএনপিকে একটি দল, একটি আদর্শ, একটি বিশ্বাস এবং দলীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ একদল মানুষের বয়ে চলা একটি গাঙ মনে করেন তবে সেই গাঙ অবশ্যই মরেনি, মরবে না এবং সেই গাঙের ভাটার রেশ কাটলেই যে জোয়ার আসবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আমি যদি তর্কের খাতিরে জনাব কাদেরের বক্তব্যের একাংশকে সত্য বলে মেনে নিই যে, বিএনপি আসলেই একটি মরা গাঙ সে ক্ষেত্রে কতগুলো প্রশ্ন না করলেই নয়। প্রশ্নগুলো হলো, গাঙ কিভাবে মরে? আমরা জানি গাঙের উজানে বাঁধ নির্মাণ করে যখন পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেয়া হয় তাহলে গাঙ মরে যায়। ভারত আমাদের পদ্মার উজানে ফারাক্কা বাঁধ এবং তিস্তার উজানে কয়েকটি বাঁধ নির্মাণ করে যেভাবে পদ্মা-যমুনা-ধলেশ্বরী-তিস্তা প্রভৃতি নদী মেরে ফেলেছে, তেমনি বিএনপির উজানে কী কী বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে এবং সেসব বাঁধ কারা নির্মাণ করে বিএনপি নামক বহমান নদীর স্রোতকে নিজেদের দিকে প্রবাহিত করে ফসলের লোভে প্রকৃতির কী ক্ষতি সাধন করা হয়েছে তা বোধকরি কাব্যপ্রতিভাধর ওবায়দুল কাদের খুব ভালো করেই জানেন। আর এ কারণেই তিনি হয়তো বিএনপির মরা গাঙের জোয়ার নিয়ে ব্যঙ্গ করার ছলে নিজ দলের অমাবস্যার ভরা জোয়ারের কুফল ও পরিণতি নিয়ে অলক্ষ্যে নিজের হতাশা ব্যক্ত করেছেন।
দ্বিতীয়ত, ওবায়দুল কাদেরের কথিত মরা গাঙে যখন জোয়ার আসবে হোক সেটি উজান দেশের শ্রাবণ মাসের মতো করে নতুবা ভাটির দেশের নির্ধারিত ছয় ঘণ্টা বিরতির পর, তখন সেটা কী কী ভয়ঙ্কর পরিণতি বয়ে আনতে পারে তা বুঝানোর জন্য আমাদের দেশের পদ্মা নদীর উদাহরণ দিলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে। আমরা জানি, উজানে ফারাক্কা বাঁধের কারণে পদ্মার স্বাভাবিক স্রোত নষ্ট হয়ে গেছে। ফলে নদীর তলদেশে প্রচুর পলিমাটি জমে নদীর নাব্য নষ্ট করে ফেলেছে। অনেক জায়গায় নদী শুকিয়ে মরা গাঙে পরিণত হয় শীতকালে। নদীর কোনো কোনো অংশে মরুভূমির মতো ধু-ধু বালুচর দেখা যায় যেখানে ফসল তো জন্মেই না বরং মরা কটালের সময় ওই সব দুর্গম বালুচরে চোর-ডাকাত-সন্ত্রাসীরা আশ্রয় নিয়ে জনজীবনকে হুমকির মুখে ফেলে দেয়। কিন্তু আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে এই পদ্মায় যখন জোয়ার আসে তখন সেটিকে কেউ আর জোয়ার বলে না। সেটির নাম হয় বান বা বন্যা। সেই বন্যার তোড়ে পদ্মার দুকূল প্লাবিত হয়, দুকূলের মানুষের বাড়ি-ঘর, জায়গাজমি, গাছপালা ইত্যাদি রাক্ষসের মতো তখন সে গ্রাস করতে থাকে। মরা কটালের মরা পদ্মায় যখন বান ডাকে তখন সেটির রাক্ষসী রূপ দেখে মানুষের পিলে চমকে যায়; কিন্তু সেই রাক্ষসী রূপের করাল গ্রাস থেকে কেউ যেমন বাঁচতে পারে না, তদ্রূপ কেউ চেষ্টা করলেও আক্রান্ত লোকজনকে বাঁচাতে পারে না। এবার মরা পদ্মার প্রসঙ্গ ছেড়ে বিএনপির মরা গাঙের জোয়ার সম্পর্কে কিছু কথা বলি। বিএনপিকে যদি আমরা একটি বিশাল নদীর সাথে তুলনা করি তবে দেখতে পাবো সে নদীটি অসংখ্য শাখানদী, উপনদী, খাল-বিল-ঝিল, হোতা ইত্যাদি জলাধারের শুরুতে দেশের টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার বিস্তীর্ণ জনপদের কমপক্ষে ৩৮ শতাংশ মানুষের মন-মস্তিষ্ক ও হৃদয়ে সতত প্রবহমান অবস্থায় রয়েছে। এই বিশাল শ্রেণীর মানুষের রক্তকণিকা রক্ত প্রবাহ সচল রাখার জন্য হৃৎপিণ্ড এবং ফুসফুস যেভাবে কাজ করে ঠিক একইভাবে তাদের সামগ্রিক বেঁচে থাকা কাজকর্ম-স্বপ্ন দেখা ইত্যাদি সব কর্মের বাতিঘররূপে বিএনপি নামক দলটির আদর্শ নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। এই লোকগুলোর বাইরে জামায়াতসহ অন্যান্য সরকারবিরোধী লোকের সংখ্যা যদি আরো ৩২ শতাংশ লোককে ধরি তাহলে দেখব যে, দেশের শতকরা ৭০ শতাংশ লোক বিএনপির মরা গাঙের জোয়ার-ভাটার সাথে নিজেদের সব কিছু মিলিয়ে ফেলেছে।
একটি নদীকে যেমন তার স্বাভাবিক স্রোত বাঁচিয়ে রাখে তদ্রূপ একটি দলের নেতাকর্মীদের স্বাভাবিক চলাচল, বাকস্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, বিক্ষোভ প্রকাশের স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার-সুশাসন, সব ক্ষেত্রে সমান ও সুষম প্রতিযোগিতায় খুশি মনে অংশগ্রহণের ওপর দলটির গতি-প্রকৃতি স্বাভাবিক অবস্থায় থাকে। অন্য দিকে রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাভাবিক গতি প্রকৃতির ওপরই গণতন্ত্রের বেঁচে থাকা এবং ক্ষমতার সিংহাসনের নিরাপত্তা নির্ভর করে। যে দেশ-কাল-সমাজে প্রতিদ্বন্দ্বী থাকে না, প্রতিদ্বন্দ্বীকে মেরে ফেলা হয় অথবা শেষ করে দেয়া হয় সেই দেশ-কালের ক্ষমতাধর রাজনীতিবিদরা থাকেন সবচেয়ে বেশি বিপদ ও বিপত্তির মধ্যে। আমরা আগেই বলেছি যে, নদীর উজানে বাঁধ নির্মাণ, নদীর তলদেশে পলিমাটি জমা হওয়া, নদীতে নির্বিচারে আবর্জনা নিক্ষেপ এবং নদীর পানিকে বিষাক্ত করার মাধ্যমে একটি ভরা নদীকে মরা নদী বানিয়ে ফেলা হয়। এ ক্ষেত্রে বিএনপিকে যদি মরা নদীর সাথে তুলনা করা হয় তাহলে সঙ্গত কারণে প্রশ্ন জাগে, বিএনপির এই মরণ দশার জন্য কারা দায়ী। বিএনপি কি স্বেচ্ছায় আত্মহত্যার প্রবণতাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে আজকের অবস্থায় পৌঁছেছে নাকি লাঠি-গুলি-টিয়ার গ্যাস, গুম-খুন-মামলা, হামলা ইত্যাদির দ্বারা বিএনপির সর্বনাশ ঘটানো হয়েছে। বিএনপি নামক প্রবহমান নদীটির জলধারা, জলজ সম্পদ ইত্যাদির ওপর কারা বিষ প্রয়োগ করল এবং কীভাবে করল তা নিয়ে হয়তো অনাগত ভবিষ্যতে চুলচেরা বিশ্লেষণ হবে কিন্তু এই মুহূর্তের ভয়াবহ সংবাদ হলো, আগামীর ভাটি অঞ্চলের চিরায়ত জোয়ার বা উজান দেশের শ্রাবণের জোয়ারের প্লাবন যখন বিএনপির মরা গাঙের ওপর আশ্রয় নেবে তখন তা আজকের ভরা গাঙের টইটম্বুর জোয়ারের পানিতে লম্ফরত প্রানিকুলের জন্য কী পরিণত বয়ে নিয়ে আসবে তা নিয়ে জরুরিভাবে চিন্তাভাবনা করা ফরজে আইন হয়ে পড়েছে।
প্রকৃতির অমোঘ নিয়মে বিএনপির মরা গাঙে জোয়ার আসবেই। পূর্ণিমা বা অমাবস্যার টান যত বেশি হবে মরা গাঙে ভরা জোয়ারের তাণ্ডব তত বেশি হবে। তখন সেটিকে আর জোয়ার বলা যাবে না। পূর্ণিমা বা অমাবস্যার আলো-আঁধারি চন্দ্রের দূরত্ব এবং মরা গাঙের জোয়ার ধারণ করার ক্ষমতার ভারসাম্য না থাকলে সারা দেশে তখন মরা গাঙের ভরা জোয়ার নতুন প্রলয় শুরু করে দেবে। তখন সেই প্রলয়কে লোকজন জোয়ার না বলে হয়তো বলবেন প্লাবন অথবা মহাপ্লাবন। পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় তবে সেই মহাপ্লাবনের নাম হবে সুনামি। কাজেই বিএনপির মরা গাঙে জোয়ার আসবে না বলে যারা এখন খুশির জোয়ারে ভাসছেন তারা গণতন্ত্রের বিজয়ের প্লাবনে বা মহাপ্লাবনে কিংবা সুনামিতে কোথায় কিভাবে ভেসে যাবেন সেই ব্যাপারে কিছু বচনামৃত যদি জনাব ওবায়দুল কাদের সাহেবদের বদন থেকে বের হতো তাহলে কিছুটা হলেও ইতিহাসের দায়মুক্তি ঘটত।
লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য

ভাগ