স্মৃতির পটে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ

তৈমূর আলম খন্দকার
দেশের একজন খ্যাতিমান রাজনীতিক ও আইনজীবী ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। তার নাম শুনেছি, দেখেছি, কিন্তু ঘনিষ্ঠতা হয়েছে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর ১৯৯৬ সালে জাতীয় রাজনীতিতে সক্রিয়ভাবে যোগদান পরবর্তী। ১৯৭৮ সালে আইন পেশায় আসার আগে সামাজিক এবং শ্রমিক সংগঠন নিয়ে তৎপর ছিলাম। ১৯৮৪ সালে হাইকোর্টে প্র্যাকটিস করতে সনদপ্রাপ্ত হই। তখন থেকেই সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সদস্য পদ গ্রহণ করে উচ্চ আদালতে নিয়মিত আইন পেশায় নিয়োজিত থাকি। সুপ্রিম কোর্টে যারা আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাফল্যের শিখরে পৌঁছেছেন, তাদের মধ্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ অন্যতম। ১৯৮৪ সাল থেকেই হাইকোর্টে নিয়মিত শুনানিতে অংশগ্রহণ করে আসছি। তখন শেখার জন্য স্বনামধন্য আইনজীবী খোন্দকার মাহাবুবউদ্দিন আহাম্মদ, এস আর পাল প্রমুখের আরগুমেন্ট শুনতে কোর্টে নিয়মিত বসে থাকতাম। ব্যারিস্টার মওদুদ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির আমলে ক্ষমতায় ছিলেন। কিন্তু যখন ক্ষমতার বাইরে থাকতেন; তখন আদালতে তার ছিল সরব উপস্থিতি। তার অনেক আরগুমেন্ট হাইকোর্ট ও অ্যাপিলেট ডিভিশনে শুনেছি। কিছু শিখতে পেরেছি কি না, জানি না, তবে চেষ্টা করেছি তার বিনয়ী স্বভাব রপ্ত করে আদালতে আইনি বক্তব্য উপস্থাপনে।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর আমাকে নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়। এরপর বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যৌথ অংশগ্রহণ এবং মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই তার ঘনিষ্ঠতা এবং যে পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা পেয়েছি; সত্যি তা ছিল উৎসাহব্যঞ্জক ও অনুকরণীয়। সবদিক বিবেচনা করে তিনি ঠাণ্ডা মাথায় সুনির্দিষ্ট মতামত দিতেন। ওয়ান-ইলেভেনের সময়ে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সাথে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দী অবস্থায় মওদুদ স্যারের আরো কাছাকাছি আসি। কাছে থেকে জানার সুযোগ পাই। সরকারের কোটা নীতিমালার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের প্রায় এক হাজার জনকে বিআরটিসিতে চাকরি দেয়ার অভিযোগে ২০০৭ সালের ১৮ এপ্রিল ওয়ান-ইলেভেন সরকার আমাকে বন্দী করে। পরে ২০০৯ সালের ১৪ মে জামিনে মুক্তি পাই। কাশিমপুর কারাগারে স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত মওদুদ স্যারের ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্যে ছিলাম। তিনি আমার আগেই জামিন পেয়েছিলেন। কারাগারে আমাদের প্রথম শ্রেণীর বন্দীর মর্যাদা দেয়া হয়। বাড়ি থেকে রান্না করা খাওয়া এনে নিজস্ব ফ্রিজে রেখে সবাই মিলে খেতাম। মাঝে মধ্যে আমাদের থাকার সেল পরিবর্তন হয়েছে, কিন্তু মওদুদ স্যার ২৬ সেল এবং কারা হাসপাতালেই ছিলেন। তিনি যত বারই কোর্টে হাজিরা দিতে যেতেন; ততবারই নানা ধরনের ফল আনতেন। সেখান থেকে কিছু ফল প্রতিনিয়তই আমাকে দিয়ে আসতেন। ৭ সেলের পাশ দিয়েই কারা হাসপাতালে যেতে হতো বিধায় আসা-যাওয়ার পথে আমাকে ডাকতেন। খাবার-দাবার দিতেন। বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে নিজেদের মধ্যে অনেক চিঠি দেয়া-নেয়া হয়েছে। কারাগারে তার কাছ থেকে শিক্ষণীয় বিষয় ছিল- তিনি শুয়ে বসে সময় নষ্ট করতেনা না। অনেককেই দেখেছি, হাসি-হতাশায় দিন কাটাতে। কিন্তু ব্যারিস্টার মওদুদ সব সময় ব্যস্ত থাকতেন লেখালেখি এবং পড়াশোনা নিয়ে। বয়সের কারণে লেখার সময় তার হাত কাঁপত। ফলে ধীরে ধীরে লিখেছেন তিনি। কারাগারে বসেই তিনি কয়েকটি বইয়ের পাণ্ডুলিপি তৈরি করেন।
ব্যারিস্টার মওদুদ আহামদ ছিলেন একজন কর্মবীর মানুষ। স্বাধীনতার পর ভেঙে পড়া প্রশাসনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে যারা দায়িত্ব নিয়েছিলেন, মওদুদ আহমদ ছিলেন তাদের অন্যতম। তাকে পোস্ট মাস্টার জেনারেলের দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। বিধস্ত ডাক বিভাগ তিনি পুনরায় গড়ে তোলেন। একজন ব্যারিস্টার হয়েও পোস্ট মাস্টারের দায়িত্ব নিতে কুণ্ঠাবোধ করেননি তিনি। বরং দারুণ উৎসাহ-উদ্দীপনায় দায়িত্ব পালন করেছেন। ঢাকার ভূতপূর্ব কেন্দ্রীয় কারাগারে (ঢাকার নাজিমউদ্দিন রোড) ভাষা আন্দোলন, পরবর্তীতে গণ-অভ্যুত্থান, আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ঘটনার বিভিন্ন জীবন্ত কাহিনী তার থেকে শোনার সুযোগ হয়েছে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় ব্রিটিশ আইনজীবীকে সম্পৃক্ত করার পেছনে তার বড় ভূমিকা ছিল। গোলটেবিল বৈঠকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করতে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন। কোম্পানীগঞ্জ থেকে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া ছাড়াও যোগাযোগ ও আইনমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রী, উপরাষ্ট্রপতি এবং ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ; যা রাজনীতিবিদদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় না। তিনি যখন সরকারে ছিলেন তখন তার কর্মব্যস্ততা, আইনমন্ত্রী হিসেবে আইনের সংস্কার ও আইন প্রয়োগে গতিশীলতা আনা যেমন ছিল লক্ষ করার মতো, ঠিক তেমনি ক্ষমতায় না থাকলে কোর্টে তার সাবমিশন ছিল অনুকরণীয়। আরগুমেন্ট উপস্থাপনকালে বিভিন্ন সময়ে আদালতের সাথে মতপার্থক্য দেখা দিলে কোনো কোনো আইনজীবীকে রাগান্বিত হতে দেখেছি, কিন্তু তিনি কোর্টে কোনো দিন তেমন আচরণ করেননি। কোর্টে আরগুমেন্টের সময় তার আচরণ ছিল নম্র। এমন বিনয় এখনো আমরা রপ্ত করতে পারিনি। আইন পেশায় সফল হতে আদালতে বিনয়ী হওয়া একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য। কর্মীবান্ধব মওদুদ আহমদ পরীক্ষিত কর্মীদের খুব ভালোবাসতেন। আমি যখন বিআরটিসির চেয়ারম্যান ছিলাম, তখন বহু সাধারণ মানুষকে চাকরিসহ বিভিন্ন উপকারের জন্য বলতেন। এলাকার সাধারণ মানুষও তার কাছে পৌঁছতে পারতেন। জনপ্রিয়তায় তিনি ছিলেন শীর্ষে। অথচ আওয়ামী লীগ সরকার তাকে গ্রামের বাড়িতে অর্থাৎ নির্বাচনী এলাকায় যেতে দেয়নি। তাকে বহনকারী গাড়ি পুলিশ আটকে দিয়ে বলেছে, ‘নিরাপত্তার কারণে ব্যারিস্টার মওদুদকে এলাকায় যেতে দেয়া হচ্ছে না।’ আওয়ামী লীগ তার ওপর শারীরিকভাবে হামলা চালিয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার তাকে ১০ বছরের কারাদণ্ড পর্যন্ত দিয়েছিল। তবে কোনো প্রকার প্রতিকূল অবস্থা তাকে ঠেকাতে পারেনি, এমনকি বয়সকেও তিনি প্রতিরোধ করতে কিছুটা হলেও সক্ষম হয়েছিলেন। ৮৪ বছর বয়সে তিনি যে কাজ করেছেন, এ রকম সমবয়সে অনেক মানুষই সম্পূর্ণ অবসর জীবনযাপন করেন, কোনো ঝুঁকি বা দায়িত্ব থেকে স্বেচ্ছায় দূরে থাকেন। কিন্তু ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ছিলেন এর ব্যতিক্রম। ছিলেন একজন সাহসী পুরুষ।
বিএনপি গঠন পক্রিয়ার শুরু থেকেই তিনি যুক্ত ছিলেন। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দলটি প্রতিষ্ঠার সময়ই গঠিত প্রথম স্থায়ী কমিটির সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার মওদুদ। সাংগঠনিক কাজ করা ছিল তার নেশা। স্বল্প আহারী ব্যারিস্টার মওদুদ ব্যক্তিগতভাবেও অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন জীবনযাপন করতেন। একদিন সকালে তার বাসায় গিয়ে শুনি তিনি তখন নাশতা করছেন। সংবাদ পেয়ে ডাইনিং টেবিলে আমাকে ডেকে পাঠালেন। তার জন্য রক্ষিত অল্প পরিমাণ খাবার ছিল, তা থেকে ভাগ করে দিলেন। তিনি অত্যন্ত স্বল্পভাষী হলেও ব্যক্তিগত জীবনে নেতাকর্মীদের জন্য ছিলেন খুব আন্তরিক। আমার বড় মেয়ে ব্যারিস্টার মার-ই-য়াম খন্দকারের সাথে নোয়াখালীর এক ব্যারিস্টার তরুণের সাথে বিয়ের প্রস্তাব ছেলেপক্ষের অভিভাবক আমার কাছে বায়োডাটা নিয়ে আসে। আমি তাদের বলি, পরে জানাব। বায়োডাটা নিয়ে মওদুদ স্যারের মতিঝিলের চেম্বারে গিয়ে তাকে দিয়ে বললাম, স্যার আপনি যদি সমর্থন করেন; তবে নোয়াখালীতে আমার মেয়ের বিয়ের জন্য সম্মত হবো। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে আমার সামনেই টেলিফোনে খোঁজখবর নিলেন এবং সর্বশেষ ব্যারিস্টার এম মাহাবুবউদ্দিন খোকনকে ফোন করে বললেন, ‘ছেলেটির পরিবারের সর্ববিষয়ে খোঁজ নিয়ে আমাকে জানাও’। ব্যারিস্টার খোকনের নিজস্ব নির্বাচনী এলাকা বিধায় তিনি সরেজমিন খোঁজ নিয়ে আত্মীয়তা করার পক্ষে মত দিলেন। তাদের দু’জনের কাছে আমি কৃতজ্ঞ এ জন্য যে, তারা একটি ভালো পরিবারের সাথে আমাদের পরিবারের পারিবারিক সম্পর্ক স্থাপন করার সুযোগ করে দিয়েছেন। রাজনৈতিকভাবে নারায়ণগঞ্জ একটি জটিল এলাকা। নারায়ণগঞ্জ মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও সভাপতি এবং আহ্বায়কের দায়িত্ব গত ২০ বছর পালন করেছি এবং এখনো করছি। আমার আমন্ত্রণে তিনি নারায়ণগঞ্জে অনেক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে গিয়েছেন, কয়েকবার নারায়ণগঞ্জ জেলার সাংগঠনিক দায়িত্বে ছিলেন এবং কোনো মিটিং শেষ না করে তিনি আসেননি। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে ভোট চেয়েছেন। তাকে টেলিফোন করলে ধরতে না পারলে পরে কলব্যাক করতেন। তার কাছে কোনো পরামর্শ চাইলে বিস্তারিত শুনে পরামর্শ দিতেন। কাজের ফাঁকে লেখাপড়া ও বই লেখা নিয়ে সময় কাটাতেন। তাকে বিলাসবহুল জীবন কাটাতে দেখিনি। রাজনৈতিক কর্মসূচি ছাড়াও ব্যক্তিগতভাবে আমাদের পারিবারিক অনুষ্ঠানে দাওয়াতেও তিনি যোগ দিয়েছেন। কারাগারেও তাকে হতাশ বা অবসর জীবন কাটাতে দেখিনি। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের অবৈধতা সম্পর্কে কারাবন্দী বিএনপি চেয়ারপারসন দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্য তিনি লিখে দিয়েছেন, কারাগার থেকে যা সংসদ ভবনে প্রিজন ভ্যানে যখন আমাদের বিচারের জন্য আনা হতো তখন আমি ম্যাডামের কাছে পৌঁছে দিয়েছি। এত বড় একজন কর্মবীর, জাতির সূর্যসন্তান ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের মৃত্যুর পরও জাতীয় সংসদ ভবনে তার নামাজে জানাজার অনুমতি দেয়া হয়নি, জীবন সায়াহ্নে আমাদের দেশে সরকারের চক্ষুশূল হলে একজন নেতার এমন পরিণতি যা জাতির জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail : taimuralamkhandaker@gmail.com
ভাগ