নৌকাই এখন সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষের প্রধান বাহন!

0

সাতক্ষীরা সংবাদদাতা॥ সাতক্ষীরা উপকূলের মানুষের এখন যাতায়াতের একমাত্র বাহন নৌকা। ঘূর্ণিঝড় আম্পান ও টানা বৃষ্টিতে বাঁধ ভেঙে বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকা প্লাবিত হয়ে সড়ক নষ্ট হওয়ায় নৌকা এখন যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম হয়েছে এই উপকূলবাসীর। সরেজমিনে উপকূলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আম্পানের রেশ কাটতে না কাটতে গত সপ্তাহে সাতক্ষীরা উপকূলে প্রবল জোয়ারের চাপে বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। পানি কিছুটা কমলেও তাদের দুর্ভোগ এখনও কমেনি। সাতক্ষীরার আশাশুনি ও শ্যামনগর উপজেলার বানভাসি মানুষের যাতায়াতের মাধ্যম এখন নৌকা। বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে জোয়ার-ভাটার কারণে আশাশুনি টু ঘোলা প্রধান সড়কের অধিকাংশ জায়গায় ক্লোজার (খাল) সৃষ্টি হয়েছে। এই সড়কে ১৫টির বেশি স্থানে বাঁশের সাঁকো তৈরি করে মানুষ কোনোভাবে চলাচল করছে। আম্পানের পর থেকে শ্রীউলার হিজলিয়া কোলা, হাজরাখালী, নাসিমাবাদ, কলিমাখালী, বালিয়াখালী, কাঁকড়া বুনিয়াসহ এই ইউনিয়নের ২০ হাজারের বেশি মানুষের নৌকা একমাত্র যাতায়াতের মাধ্যম হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শ্রীউলা ইউনিয়নের কলিমাখালী এলাকার শ্যামল বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের বিপদের শেষ নেই। আম্পানের পর এখনও অনেক এলাকার রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি সব পানিতে ডুবে রয়েছে। তার মধ্যে গত সপ্তাহে অবিরাম বৃষ্টি ও অমাবস্যার জোয়ারের পানিতে আম্পানের চেয়ে আরও বেশি ক্ষতি হয়েছে। এই এলাকার অধিকাংশ রাস্তাঘাট নষ্ট হয়ে গেছে। আশাশুনি উপজেলা সদর থেকে ঘোলা ত্রিমোহীন প্রধান সড়কে ১০ জায়গায় বাঁশের সাঁকো তৈরি করে মানুষ কোনোভাবে চলাচল করছে। কলিমাখালী আসতে হলে অনেক দূর ঘুরতে হয়। পানি অতিক্রম করে কেউ যেতে চায় না। নৌকা ছাড়া আমাদের কোনও যাতায়াতের মাধ্যম নেই। বানভাসি মানুষের মধ্যে সুপেয় পানির সংকট বিরাজ করছে। স্যানিটেশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে।’ হাজরাখালী এলাকার শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এলাকায় কেউ অসুস্থ হলে নৌকা করে অনেক কষ্টে নিয়ে যেতে হচ্ছে। শুধু আমাদের হাজরাখালী নয়, হিজলিয়া কোলা, নাসিমাবাদ, কলিমাখালী, বালিয়াখালী, কাঁকড়াবুনিয়া এসব এলাকার ২০ হাজারের অধিক মানুষের কোথাও যেতে হলে নৌকায় যাতায়াত করতে হয়। আমরা সেই পুরনো দিনে ফিরে গিয়েছি।’ শ্রীউলা ইউপি চেয়ারম্যান আবু হেনা শাকিল বলেন, ইউনিয়নের অধিকাংশ রাস্তা নষ্ট হয়ে গেছে। আশাশুনি টু ঘোলা সড়কের ১৫-১৬ জায়গায় ভেঙে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। এখন এখানকার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র মাধ্যম নৌকা অথবা ভেলা। সরকারের কাছে দ্রুত রাস্তাগুলো সংস্কারের দাবি করেন তিনি। প্রতাপনগর ইউপি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন বলেন, এখানকার একটি রাস্তাঘাট ভালো নেই। প্রধান সড়কগুলো বড় বড় খালে পরিণত হয়েছে। সে কারণে এখানকার মানুষের বাপ-দাদার আমলে ফিরে যেতে হয়েছে। আগে যেমন প্রতাপনগর থেকে আশাশুনি টাবুরি নৌকায় করে যেতে হতো। আম্পানের পর থেকে আমাদের এই অবস্থা চলছে। এখানকার মানুষের চলাচলের একমাত্র মাধ্যম এখন নৌকা।
সাতক্ষীরা আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মীর আলিফ রেজা বলেন, এই এলাকায় জোয়ার-ভাটা চলছে। এখনও লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি আছে। পানি কিছুটা কমলেও মানুষ এখন দুর্ভোগে আছে। আম্পানের পর প্রতাপনগর ও শ্রীউলার অনেক এলাকা পানিতে তলিয়ে থাকার কারণে সড়ক মেরামতের কাজ করা যায়নি। সম্প্রতি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে আবারও প্লাবিত হয়ে উপজেলার ১৮ কিলোমিটার এবং কাঁচা সড়ক সম্পূর্ণ ও আংশিক ১৯ কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকার মানুষের চলাচলের সড়কগুলো নষ্ট হওয়ার ফলে তাদের এখন নৌকায় যাতায়াত করতে হচ্ছে। তবে ইতোমধ্যে যেসব স্থানে কাজ করার মতো সেখানে আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক এস এম মোস্তফা কামাল বলেন, আম্পানের পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় পুনর্বাসনে জরুরি ভিত্তিতে কাজ শুরু হয়েছে। জাইকার একটি প্রকল্প এসেছে। ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তাগুলো দ্রুত কীভাবে সংস্কার করা যায় সরকার এবং জাইকা কাজ শুরু করেছে। তিনি আরও বলেন, লোকালয়ে পানি প্রবেশ ঠেকাতে ইতোমধ্যে রিং বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। স্থায়ী ও টেকসই বাঁধ নির্মাণে কাজ করছে সরকার। জেলায় নদী খনন প্রকল্পে ৪৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।