৪০ জেলায় তাপপ্রবাহ, চাপে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন: শক্তিশালী এল নিনোর আশঙ্কায় বড় ঝুঁকিতে বাংলাদেশ

0
সেপ্টেম্বরের আগেই সক্রিয় হচ্ছে শক্তিশালী ‘এল নিনো’; দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহ ও খরার পূর্বাভাসে তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে বাংলাদেশ ।। প্রতীকী ছবি: এআই/লোকসমাজ

জুন মাসের শুরুতেই দেশের ৪০টি জেলায় তাপপ্রবাহ শুরু হয়েছে। একই সময়ে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা সতর্ক করেছে, চলতি বছরের শেষার্ধে শক্তিশালী এল নিনো সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে। এই দুটি পরিস্থিতি একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য উৎপাদন, পানিসম্পদ ও জনস্বাস্থ্য খাতে আগামী মাসগুলোতে গভীর সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।

৪০ জেলায় তাপপ্রবাহ, সৈয়দপুরে সর্বোচ্চ ৩৮.৫ ডিগ্রি

আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুরসহ রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে নীলফামারীর সৈয়দপুরে — ৩৮.৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৬.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। আবহাওয়া অধিদপ্তর বলছে, আগামী কয়েক দিনে এই পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হতে পারে এবং কিছু এলাকায় তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে।

আবহাওয়াবিদ মো. শাহিনুল ইসলাম বলেন, এ সময় তাপপ্রবাহ একেবারে অস্বাভাবিক নয়, তবে বৃষ্টিপাত না হলে তাপমাত্রা আরও বাড়ার সম্ভাবনা আছে। অধিদপ্তরের পরিচালক মো. মমিনুল ইসলাম জানান, গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে তাপপ্রবাহের প্রকৃতি দ্রুত বদলে গেছে। আগে কয়েক দিনের জন্য তাপমাত্রা বাড়ত, এখন দীর্ঘ সময় ধরে তাপদাহ থাকছে। রাতের তাপমাত্রাও আগের মতো কমছে না, ফলে মানুষের শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও পুনরুদ্ধারের সুযোগ পাচ্ছে না।

জুন মাসে দেশে গড়ে ৪৫৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা বছরের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। কিন্তু আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস বলছে, এবার স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হতে পারে। ফলে কৃষি, পানিসম্পদ ও বিদ্যুৎ খাতে চাপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সেপ্টেম্বরের আগেই আসতে পারে এল নিনো

বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার (ডব্লিউএমও) সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের আগেই এল নিনো তৈরি হওয়ার আশঙ্কা প্রায় ৮০ শতাংশ এবং নভেম্বরের আগে তা ৯০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এল নিনো মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের সমুদ্রপৃষ্ঠের অস্বাভাবিক উষ্ণতার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি জলবায়ু ঘটনা, যা পৃথিবীর বায়ুপ্রবাহ, বৃষ্টিপাত ও তাপমাত্রার ভারসাম্য বদলে দেয়। ফলে বিশ্বের এক অংশে ভয়াবহ খরা, অন্য অংশে অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়।

জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস এটিকে বৈশ্বিক জলবায়ুর জন্য জরুরি সতর্কবার্তা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ডব্লিউএমও মহাসচিব সেলেস্তে সাওলো বলেছেন, বিশ্বের প্রায় সব অঞ্চলে আগামী কয়েক মাস স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য যে বিপদ আসছে

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক বলেন, এল নিনো সক্রিয় হলে বাংলাদেশের বর্ষা বিলম্বিত হতে পারে এবং মৌসুমি বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে। রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নওগাঁ, দিনাজপুর, রংপুর, কুড়িগ্রামসহ উত্তর ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খরাপ্রবণ এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকবে।

আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশিদ সতর্ক করেন, শক্তিশালী এল নিনো তৈরি হলে আগামী বছরগুলোতে আরও দীর্ঘ ও ঘনঘন তাপপ্রবাহ দেখা দিতে পারে। উল্লেখ্য, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘ তাপপ্রবাহ আঘাত হেনেছিল — টানা ৩৬ দিন বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ৩৬ থেকে ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা বিরাজ করে। সেই সময় স্কুল-কলেজ বন্ধ করতে হয়, বিদ্যুতের চাহিদা রেকর্ড মাত্রায় পৌঁছায় এবং হাসপাতালে হিটস্ট্রোক ও পানিশূন্যতার রোগীর সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়।

কৃষিতে বহুমুখী ঝুঁকি

বাংলাদেশের কৃষি এখনো প্রকৃতিনির্ভর। আমন ধান পুরোপুরি বর্ষার ওপর নির্ভরশীল। বর্ষা দেরিতে এলে বা বৃষ্টি কম হলে আমনের চারা রোপণ ব্যাহত হবে, জমি শুকিয়ে যাবে। আবার দীর্ঘ শুষ্কতার পর হঠাৎ অতিবৃষ্টিতে ক্ষেত তলিয়ে যেতে পারে। ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, সরিষা, সবজি ও ফল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে তাপপ্রবাহের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আম ও লিচু বাগানে ফল ঝরে পড়েছে।

হাওরাঞ্চলেও এ বছর অতিবৃষ্টিতে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা ও হবিগঞ্জের অনেক জমি তলিয়ে গেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে মিঠাপানির প্রবাহ কমলে সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, পটুয়াখালী ও বরগুনায় লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে কৃষি ও মৎস্য সম্পদে নতুন সংকট দেখা দিতে পারে।

বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. শরিফুল হক ভূঞা বলেন, জলবায়ুসহিষ্ণু ফসল উদ্ভাবন না করা গেলে কৃষি খাত বড় সংকটে পড়বে।

জনস্বাস্থ্যেও সরাসরি আঘাত

দীর্ঘ তাপপ্রবাহের ফলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ, শ্বাসকষ্ট ও ডায়রিয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছেন শিশু, বৃদ্ধ, অন্তঃসত্ত্বা নারী এবং শ্রমজীবী মানুষ। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতা ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া ও পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটাচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর শুধু পরিবেশগত সংকট নয়, এটি জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে।

প্রস্তুতিতে ঘাটতি, দুর্যোগের স্বীকৃতি নেই

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো তাপপ্রবাহকে এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়া। ফলে তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় জাতীয় কর্মপরিকল্পনা, আলাদা বাজেট এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কোনো সহায়তা কাঠামো নেই। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও শৈত্যপ্রবাহ নিয়ে কার্যক্রম থাকলেও তাপপ্রবাহ নিয়ে কার্যকর কোনো কর্মসূচি নেই।

বায়ুমণ্ডল দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের পরিচালক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, জলবায়ু পরিকল্পনায় উপকূলীয় অঞ্চল গুরুত্ব পেলেও তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঝুঁকি এখনো যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়নি। কানাডার সাসকাচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের আবহাওয়া ও জলবায়ু গবেষক মোস্তফা কামাল পলাশ বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত আশ্রয়কেন্দ্র, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কার্যক্রম চালু করেছে। বাংলাদেশেও একই উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, নগরাঞ্চলে গাছপালা ও জলাধার বাড়ানো ছাড়া তাপমাত্রা কমানোর কার্যকর বিকল্প নেই।

সরকারের পক্ষ থেকে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তনমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু জানান, তাপমাত্রা কমাতে নগর বনায়ন ও বৃক্ষরোপণে জোর দেওয়া হচ্ছে। আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম, ভোলা ও পটুয়াখালীর উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বাগান সম্প্রসারণ এবং সড়ক ও মহাসড়কের পাশে সামাজিক বনায়নের আওতায় লাখ লাখ চারা রোপণ করা হবে।

বিশেষজ্ঞরা অবশ্য বলছেন, তাপপ্রবাহকে দুর্যোগ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, শক্তিশালী আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থা, কৃষি ও স্বাস্থ্য খাতের অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন এবং জলবায়ুসহিষ্ণু অবকাঠামো গড়ে না তুললে এই সংকটের অর্থনৈতিক ও মানবিক মূল্য ভবিষ্যতে আরও বেশি হবে।