রিমান্ডে ডিবি পুলিশের কাছে আসামি জিয়ার চাঞ্চল্যকর তথ্য: যশোরে একচ্ছত্রভাবে কর্তৃত্ব দখল ও বিপুল অর্থ উপার্জনের জন্য খুন করা হয় লাভলী হিজড়াকে

0

মীর মঈন হোসেন মুসা ॥ একচ্ছত্রভাবে কর্তৃত্ব দখল ও বিপুল অর্থ উপার্জনের জন্য যশোরে তৃতীয় লিঙ্গের (হিজড়া) আব্দুল কাদের ওরফে লাভলীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে। আর এই হত্যার দায় ঝিকরগাছা-মনিরামপুর এলাকার হিজড়া সম্প্রদায়ের নিয়ন্ত্রণকারী পাহাড়ী হিজড়ার ওপর চাপানোর চেষ্টাও চালানো হয়েছিলো। লাভলী হত্যার অন্যতম আসামি জিয়াউর রহমান জিয়াকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর এমনই তথ্য পেয়েছে ডিবি পুলিশ। এই হত্যাকা-ের মূল পরিকল্পনাকারী ও অস্ত্রের যোগানদাতা জিয়াউর রহমান জিয়া নিজেই।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের এসআই মফিজুল ইসলাম জানান, আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে গত ১ ফেব্রুয়ারি মামলার অন্যতম আসামিকে জিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে নেয়া হয়। রিমান্ডে তাকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে নিহত লাভলী হিজড়া এবং হত্যা মামলার আসামি নাজমা হিজড়া ও সেলিমা হিজড়া এক সময় ঝিকরগাছা-মনিরামপুর এলাকার নিয়ন্ত্রণকারী পাহাড়ী হিজড়ার অধীনে ছিলেন। প্রায় ১২ বছর আগে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বারোবাজারে দলবল নিয়ে কাজ করতে গেলে সেখানে জিয়ার সাথে নাজমা হিজড়ার পরিচয় ঘটে। এক পর্যায়ে তাদের মধ্যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং পরে তারা দুজনে বিয়ে করেন। হিজড়াদের ভাষ্য, তারা স্বামীকে ‘পারিক’ বলে ডাকেন। আর হিজড়রা তাদের পারিককে খুবই বিশ্বাস করেন। এই সুযোগ নিয়ে নাজমা হিজড়ার আয়ের বেশিরভাগ টাকা হাতিয়ে নিতে থাকেন জিয়া। নাজমা হিজড়ার টাকার প্রতি তার লোভ বেড়ে যায়।
তিনি বলেন, পাহাড়ী হিজড়ার অধীনে ঢুলি নিয়ে ৪টি টিমে কাজ করতেন তার সঙ্গীরা। প্রতিদিন একটি টিম ৮/১০ হাজার টাকা উপার্জন করতো। এই আয়ের অর্ধেক দিতে হতো পাহাড়ী হিজড়াকে। ফলে বাকী টাকা টিমের সঙ্গীরা ভাগবাটোয়ারা নিলে তারা কম টাকা ভাগ পেতেন। এ কারণে বেশি টাকা উপার্জনের উদ্দেশ্যে এক পর্যায়ে পাহাড়ী হিজড়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে এসে যশোরের ধর্মতলায় নিজস্ব আস্তানা তৈরি করেন লাভলী হিজড়া। বিয়ে করেন ধর্মতলার এলাকার নজরুল কসাইকে। নজরুল কসাইয়েরও দুটি স্ত্রী আছে। লাভলী চলে আসার পর নাজমা ও সেলিনা হিজড়াও পাহাড়ী হিজড়ার নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে আসেন। তারাও ধর্মতলায় এসে ঘর ভাড়া নেন। এখানে আসার পর তারা লাভলী হিজড়ার নিয়ন্ত্রণে চলতে থাকেন। এরই মধ্যে জিয়া ১৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেন নাজমা হিজড়ার কাছ থেকে। ওই টাকা দিয়ে তিনি নিজ নামে ধর্মতলা এলাকায় ৪ শতক জমি কেনেন। কিন্তু জিয়ার টাকার লোভ আরো বেড়ে যায়। পরিকল্পনা করেন লাভলীকে সরিয়ে দিয়ে তদস্থলে নাজমা হিজড়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার। এ কারণে দল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য নাজমা ও সেলিনা হিজড়াকে তিনি উসকে দিতে থাকেন জিয়া। এ জন্য মাঝে মধ্যে নাজমা ও সেলিনা হিজড়া বিদ্রোহ করে টাকার অংশ বাড়িয়ে দিতে বললে লাভলী হিজড়া পারিক (স্বামী) নজরুল কসাইকে দিয়ে তাদেরকে শায়েস্তা করার ভয় দেখাতেন। ফলে তারাও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন লাভলী হিজড়ার ওপর। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ওই দুজনকে সাথে নিয়ে লাভলী হিজড়াকে হত্যার পরিকল্পনা করেন জিয়া। তাদেরকে জিয়া বলেন, যেহেতু পাহাড়ী হিজড়ার কাছ থেকে চলে এসেছে লাভলী হিজড়া এবং আলাদা দল গঠন করেছেন এ কারণে পাহাড়ী হিজড়া ও লাভলী হিজড়ার মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। এই দ্বন্দ্বের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে লাভলী হিজড়াকে মেরে দিতে পারলে তার দায় পড়বে পাহাড়ী হিজড়ার ওপর। এসআই মফিজুল ইসলাম বলেন, চুড়ামনকাটি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জিয়ার নিকটাত্মীয় গোলাম মোস্তফা চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। গোলাম মোস্তফার নির্বাচনে কাজ করার জন্য জিয়া তার খালাতো ভাই চৌগাছা উপজেলার আফরা গ্রামের চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী টিটুর কাছ থেকে একটি অবৈধ পিস্তল নিয়ে এসেছিলেন। নির্বাচন শেষ হলেও অস্ত্রটি তার কাছে রেখে দিয়েছিলেন জিয়া। এরপর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী জিয়া তার ছেলে শাকিল পারভেজকে ওই পিস্তলটি দেন লাভলী হিজড়াকে খুন করার জন্য। কিন্তু কেন তাকে খুন করা হবে তা তিনি ছেলেকে বলেননি। ঘটনার দিন গত ৮ জানুয়ারি সকালে নাজমা ও সেলিনা কাজে যাওয়ার নাম করে লাভলী হিজড়াকে একটি ইজিবাইকে করে কায়েমকোলার উদ্দেশ্যে রওনা হন। পথে নারাঙ্গালী গ্রামের পৌঁছালে মেহেদী হাসান নামে এক সঙ্গীকে মোটরসাইকেলে করে নিয়ে শাকিল পারভেজ সেখানে ইজিবাইকের গতিরোধ করেন। শাকিল পারভেজ ও মেহেদী হাসান দুজনেই মুখ বাঁধা ছিলেন। তারা ইজিবাইক থেকে নাজমা ও সেলিনা হিজড়াকে নামিয়ে দিয়ে পিস্তল দিয়ে লাভলী হিজড়াকে গুলি করেন শাকিল পারভেজ। কিন্তু গুলি লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এ সময় মেহেদী হাসানের কাছে থাকা চাকু নিয়ে লাভলী হিজড়ার গলাসহ বিভিন্ন স্থানে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করেন শাকিল পারভেজ। পরে মৃত্যু নিশ্চিত করে তারা সেখান থেকে পালিয়ে যান। তিনি বলেন, লাভলী হিজড়া খুন হওয়ার পর সুচতুর নাজমা ও সেলিনা হিজড়া দলের অন্য সঙ্গীদের নিয়ে হত্যার বিচারের দাবিতে মিছিল করেন এবং মায়াকান্না করতে থাকেন। এ সময় হত্যার পেছনে পাহাড়ী হিজড়ার হাত রয়েছে বলে তারা বারবার দাবি করতে থাকেন। কিন্তু প্রাথমিক তদন্তে পাহাড়ী হিজড়ার হত্যাকা-ে কোনো সম্পক্ততা পাওয়া যায়নি। তবে কললিস্ট পরীক্ষা করে দেখা যায়, ঘটনার দিন সকালে নাজমা হিজড়ার সাথে শাকিল পারভেজ নামে এক যুবকের কথা হয়েছে। ওই সময় শাকিল পারভেজের লোকেশন পাওয়া যায় ধর্মতলায়। ফলে সন্দেহ হওয়ায় তারা নাজমা ও সেলিনা হিজড়াকে ডিবি পুলিশ কার্যালয়ে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করেন। জিজ্ঞাসাবাদের এক পর্যায়ে লাভলী হিজড়া হত্যাকা-ে তাদের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। এরপর রিমান্ডে নিয়ে জিয়াকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তার কাছ থেকে লাভলী হিজড়া হত্যার আদ্যপান্ত তথ্য পাওয়া যায় এবং আসল রহস্য বেরিয়ে আসে।