মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে নিরাপত্তা-অবকাঠামো সংকট, রাত নামলেই আতঙ্কে যাত্রীরা

0
মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে নিরাপত্তা-অবকাঠামো সংকট, রাত নামলেই আতঙ্কে যাত্রীরা

শিপলু জামান, কালীগঞ্জ (ঝিনাইদহ): দিনের আলোয় যাত্রীদের কোলাহলে মুখর থাকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মোবারকগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশন। কিন্তু রাত নামলেই বদলে যায় পুরো চিত্র। নেমে আসে নীরবতা ও অন্ধকার। পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা নেই, নেই রেল পুলিশের নিরাপত্তা ক্যাম্প। এক প্ল্যাটফর্ম থেকে অন্য প্ল্যাটফর্মে নিরাপদে যাতায়াতের জন্য নেই ফুট ওভারব্রিজও।

ফলে রাতের ট্রেনের যাত্রীদের একটি অংশকে নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে স্টেশনে অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। সুযোগ বুঝে ছিনতাই, নারী যাত্রীদের হয়রানি এবং গভীর রাতে প্ল্যাটফর্মে মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগও রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও যাত্রীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ এই রেলস্টেশনে দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা ও অবকাঠামোগত নানা সমস্যা থাকলেও তা সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে রাতের বেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের উপস্থিতি কম থাকায় যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়।

নেই ফুট ওভারব্রিজ, ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পারাপার

মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের অন্যতম বড় সমস্যা ফুট ওভারব্রিজ না থাকা। এক নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে যেতে যাত্রীদের সরাসরি রেললাইন পার হতে হয়। ট্রেন আসা-যাওয়ার সময়ও অনেককে ঝুঁকি নিয়ে রেললাইন পার হতে দেখা যায়।

শিশু, নারী ও বয়স্ক যাত্রীদের ক্ষেত্রে এ বিড়ম্বনা আরও বেশি। রেললাইন পারাপারের কারণে যেকোনো সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানান স্থানীয়রা। দীর্ঘদিন ধরে ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণের দাবি জানানো হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্ল্যাটফর্মের উঁচু-নিচু অবস্থা। এতে প্রায়ই যাত্রীদের ছোট-বড় দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। গত ২৬ সেপ্টেম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে ট্রেনে ওঠার সময় রাবেয়া খাতুন নামে এক নারী গুরুতর দুর্ঘটনার শিকার হন। দুর্ঘটনায় তাঁর দুই পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং পরে তাঁর মৃত্যু হয়।

রাতে আলো কম, বাড়ে আতঙ্ক

ঢাকা থেকে খুলনাগামী চিত্রা এক্সপ্রেসের যাত্রী আরিফ হোসেন বলেন, “মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে রাতের বেলা নিরাপত্তার খুব ঘাটতি রয়েছে। রাতে প্রশাসনের লোকজন তেমন দেখা যায় না। খুব ভয়ভয় লাগে। স্টেশনের প্রধান সড়ক, প্ল্যাটফর্ম ও আশপাশের এলাকা অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে থাকে।”

তিনি বলেন, অনেক যাত্রী রাতে স্টেশনে অপেক্ষা করতে স্বস্তি বোধ করেন না। তাই ভোর হওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয় তাদের।

স্থানীয়দের অভিযোগ, প্ল্যাটফর্মের শেষ মাথা থেকে বাবরা রেলগেট পর্যন্ত এলাকার দুই পাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তাবেষ্টনী নেই। এ সুযোগে চুরি-ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে বলে তাদের অভিযোগ। পাশাপাশি রেললাইনের পাশে থাকা ল্যাম্পপোস্টের অনেক বাতি রাতে জ্বলে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মাদকসেবীদের আড্ডার অভিযোগ

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, গভীর রাতে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে মাদকসেবীদের আড্ডা বসে। অন্ধকার ও নিরাপত্তাকর্মীর স্বল্পতার সুযোগে রাতে তাদের আনাগোনা বাড়ে। এতে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক আরও বাড়ে।

মাদকের আড্ডা বন্ধ ও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্টেশনে নিয়মিত পুলিশি নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

স্টেশনে যাওয়ার সড়কও বেহাল

শুধু স্টেশনের ভেতরের সমস্যাই নয়, মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনে যাতায়াতের প্রধান সড়কটির অবস্থাও নাজুক। খানাখন্দে ভরা সড়ক দিয়ে যাত্রী ও যানবাহন চলাচলে দুর্ভোগের পাশাপাশি দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, স্টেশনের প্রবেশপথের সড়কটি দ্রুত সংস্কার করে নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

প্রতিদিন শত শত যাত্রীর চলাচল

মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন দিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করে। খুলনা-ঢাকা রুটের বেনাপোল এক্সপ্রেস, সুন্দরবন এক্সপ্রেস ও চিত্রা এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন ট্রেন এ স্টেশনে যাতায়াত করে। এছাড়া রাজশাহীগামী সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস ও কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস, চিলাহাটিগামী সীমান্ত এক্সপ্রেস এবং বিভিন্ন লোকাল ট্রেনও এ স্টেশন দিয়ে চলাচল করে।

স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিন মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন থেকে প্রায় ৭০০ থেকে ৯০০ যাত্রী বিভিন্ন গন্তব্যে যাতায়াত করেন। এত বিপুলসংখ্যক যাত্রীর জন্য স্টেশনটি আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা বৃদ্ধি ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণের দাবি রয়েছে স্থানীয়দের।

মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের স্টেশন মাস্টার শাহাজান শেখ বলেন, “এই স্টেশন থেকে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ৯০০ যাত্রী বিভিন্ন প্রান্তে আসা-যাওয়া করেন। স্টেশনটি আধুনিকায়ন, নিরাপত্তা ক্যাম্প স্থাপন এবং ফুট ওভারব্রিজ নির্মাণ করা হলে যাত্রীদের আরও ভালো সেবা দেওয়া সম্ভব হবে।”

কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জুলফিকার আলী বলেন, তিনি সম্প্রতি দায়িত্বে যোগ দিয়েছেন। মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশনের যাত্রীদের, বিশেষ করে রাতের বেলায়, সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, মোবারকগঞ্জ রেলস্টেশন অভিমুখী প্রধান সড়কটি সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে রেল কর্তৃপক্ষের আপত্তির কারণে কাজটি করা সম্ভব হয়নি। সড়কবাতির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে বৈদ্যুতিক খুঁটিগুলোতে বাতি দেওয়ার ব্যবস্থা করার কথাও জানান তিনি।

প্রতিদিন শত শত মানুষের যাতায়াতের গুরুত্বপূর্ণ এই স্টেশনটির নিরাপত্তা ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে ফুট ওভারব্রিজ, পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, নিরাপত্তা নজরদারি এবং যোগাযোগ সড়কের উন্নয়ন জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।