শিকদার খালিদ, লোকসমাজ : আজ বিশ্ব পর্যটন দিবস। দিবসটি আমাদের সামনে প্রতিবছর একটি প্রশ্ন হাজির করে—পর্যটনকে আমরা কেবল ঘুরে দেখার বিষয় হিসেবে দেখব, নাকি এটিকে ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণ, স্থানীয় অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও জাতীয় উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে বিবেচনা করব?
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের দিকে তাকালে এই প্রশ্নের উত্তর আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সুন্দরবন থেকে ষাটগম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলীর স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা থেকে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাগরদাঁড়ী, ভরত ভায়নার প্রত্নস্থল থেকে মির্জানগরের হাম্মামখানা, অভয়নগরের ১১ শিবমন্দির থেকে গদখালীর ফুলের বাজার—এই অঞ্চল প্রকৃতি, ইতিহাস, স্থাপত্য, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এক অসাধারণ সমন্বয়।
প্রশ্ন হলো, এই বিপুল সম্পদের কতটুকু আমরা পর্যটন অর্থনীতিতে রূপ দিতে পেরেছি?
বাস্তবতা বলছে, সম্ভাবনার তুলনায় অর্জন এখনও সীমিত।
বাগেরহাটে রয়েছে বাংলাদেশের বিশ্ব ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ দুটি নিদর্শন—সুন্দরবন ও ঐতিহাসিক মসজিদনগরী বাগেরহাটের স্থাপত্য ঐতিহ্য। ষাটগম্বুজ মসজিদ নিজেই আন্তর্জাতিক পর্যটনের একটি শক্তিশালী আকর্ষণ। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের পর্যটন গন্তব্য তালিকাতেও ষাটগম্বুজ মসজিদ এবং যশোরের মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়ি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

অন্যদিকে যশোরের গুরুত্বও কোনো অংশে কম নয়। সাহিত্যিক ঐতিহ্য, প্রত্নসম্পদ, ধর্মীয় স্থাপনা, ফুলচাষ এবং ভৌগোলিক অবস্থান—সব মিলিয়ে জেলাটি একটি বহুমাত্রিক পর্যটন গন্তব্য হওয়ার যোগ্যতা রাখে। যশোরের বিমানবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং বেনাপোল স্থলবন্দরের নৈকট্যও এই সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবু পর্যটনের মানচিত্রে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল এখনও তার প্রাপ্য গুরুত্ব পায়নি।
এর কারণ শুধু পর্যটনকেন্দ্রের সংখ্যা কম নয়। বরং মূল সমস্যা ব্যবস্থাপনায়। একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা থাকা আর সেটিকে একটি পর্যটন গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা এক বিষয় নয়। পর্যটক সেখানে গিয়ে কীভাবে পৌঁছাবেন, কোথায় থাকবেন, কোথায় খাবেন, কীভাবে তথ্য পাবেন, প্রশিক্ষিত গাইড পাবেন কি না, নিরাপত্তা কেমন থাকবে, স্থানটি কতটা পরিচ্ছন্ন থাকবে—এসব প্রশ্নের উত্তরও পর্যটন ব্যবস্থাপনার অংশ।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু প্রত্নস্থাপনার ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থাপনা এখনও দুর্বল। কোথাও সংরক্ষণের অভাব, কোথাও অযত্ন, কোথাও স্থানীয় পর্যায়ে নিয়মিত তদারকির ঘাটতি। কোনো কোনো স্থাপনা সময়ের ক্ষয়ে নষ্ট হচ্ছে, আবার কোথাও দর্শনার্থীবান্ধব ন্যূনতম সুবিধাটুকুও নেই।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে—প্রত্নসম্পদকে কেবল পুরোনো স্থাপনা হিসেবে দেখা যাবে না। এগুলো আমাদের ইতিহাসের দলিল। একটি মঠ, মসজিদ, মন্দির, হাম্মামখানা বা প্রত্নঢিবি ধ্বংস হয়ে গেলে শুধু একটি স্থাপনা হারায় না; হারিয়ে যায় ইতিহাসের একটি অধ্যায়ও।
এই কারণে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রত্নসম্পদ সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, পর্যটন কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় সরকার ও জনগণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় প্রয়োজন। যশোরে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের একটি শক্তিশালী স্থানীয় বা উপ-আঞ্চলিক কার্যালয়ের দাবি তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা যেতে পারে। এতে প্রত্নস্থলগুলোর নিয়মিত পরিদর্শন, নথি সংরক্ষণ, গবেষণা, জরুরি সংস্কার এবং অবৈধ দখল বা ক্ষয়ক্ষতির বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
তবে শুধু সরকারি দপ্তর বাড়ালেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজন একটি সমন্বিত পর্যটন পরিকল্পনা।
যশোর, খুলনা ও বাগেরহাটকে বিচ্ছিন্ন পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে না দেখে একটি বৃহত্তর ‘দক্ষিণ-পশ্চিম হেরিটেজ ও নেচার সার্কিট’ হিসেবে ভাবা যেতে পারে। একজন পর্যটক যশোরে এসে সাগরদাঁড়ী ও ভরত ভায়না ঘুরবেন, গদখালীর ফুলের বাজার দেখবেন; সেখান থেকে বাগেরহাটে গিয়ে ষাটগম্বুজ ও খানজাহান আলীর স্থাপত্য ঐতিহ্য দেখবেন; এরপর সুন্দরবনের প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের অভিজ্ঞতা নেবেন—এমন একটি সমন্বিত ভ্রমণ কাঠামো তৈরি করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রকাশিত কৌশলগত পরিকল্পনাতেও বাগেরহাটের ষাটগম্বুজসহ বিভিন্ন স্থানকে প্রত্নতাত্ত্বিক, ঐতিহাসিক ও ইকো-ট্যুরিজমের সম্ভাব্য গন্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ ধরনের পর্যটন সার্কিটের সবচেয়ে বড় সুবিধা হবে—পর্যটকের অবস্থানকাল বাড়বে। আর পর্যটক যত বেশি সময় কোনো এলাকায় থাকবেন, স্থানীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাব তত বেশি হবে। হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, স্থানীয় পণ্য, হস্তশিল্প, গাইড, নৌযান, কৃষিপণ্য—বহু খাত এর সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
অর্থাৎ পর্যটন উন্নয়ন মানে শুধু একটি দর্শনীয় স্থানে রাস্তা বানানো নয়; এর সঙ্গে একটি স্থানীয় অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা।
সুন্দরবনের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন হিসেবে সুন্দরবনের পর্যটন উন্নয়ন অবশ্যই পরিবেশগত ভারসাম্য ও সংরক্ষণকে অগ্রাধিকার দিয়ে করতে হবে। এখানে পর্যটক বাড়ানোর সঙ্গে বন ও বন্যপ্রাণীর ওপর চাপ বাড়ানো যাবে না। বরং দায়িত্বশীল ও টেকসই পর্যটনের ধারণাকে সামনে রাখতে হবে। সুন্দরবনের পর্যটন নিয়ে গবেষণাতেও পর্যটকসেবা, তথ্য, মানচিত্র, নিরাপত্তা নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ সুবিধা উন্নত করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
আরেকটি বড় ঘাটতি প্রচারণায়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু মানুষও হয়তো জানেন না, তাদের আশপাশে কত মূল্যবান ঐতিহাসিক সম্পদ ছড়িয়ে আছে। আন্তর্জাতিক পর্যটকের কাছে তো বিষয়টি আরও কঠিন। তাই প্রয়োজন আধুনিক ডিজিটাল ব্র্যান্ডিং। প্রতিটি পর্যটনকেন্দ্রের নির্ভরযোগ্য তথ্য, ছবি, ভিডিও, ইতিহাস, যাতায়াতের নির্দেশনা, থাকার ব্যবস্থা, স্থানীয় গাইড ও নিরাপত্তা-সংক্রান্ত তথ্য এক জায়গায় পাওয়া উচিত।
বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬-এর প্রতিপাদ্যও এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটনকে নতুনভাবে সাজানো। বাংলাদেশেও এবার বিশ্ব পর্যটন দিবসের কর্মসূচিতে ডিজিটাল প্রযুক্তি ও এআইভিত্তিক ভার্চুয়াল পর্যটন অভিজ্ঞতার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
তাহলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য কেন একটি ‘ডিজিটাল হেরিটেজ ম্যাপ’ তৈরি করা হবে না? কেন ভরত ভায়না, সাগরদাঁড়ী, মির্জানগর, ষাটগম্বুজ কিংবা সুন্দরবনের জন্য ভার্চুয়াল ট্যুর তৈরি হবে না? কেন একজন বিদেশি পর্যটক ঢাকায় বসেই জানতে পারবেন না—যশোর বা বাগেরহাটে তিনি কী দেখতে পারবেন, কোথায় থাকবেন এবং কীভাবে যাবেন?
প্রশ্নগুলো এখন বাস্তবায়নের।
একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে পর্যটনের অংশীদার করতে হবে। স্থানীয় মানুষ যদি পর্যটন থেকে আয় করার সুযোগ পান, তাহলে ঐতিহ্য সংরক্ষণেও তাদের আগ্রহ বাড়বে। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষিত ট্যুর গাইড হিসেবে গড়ে তোলা, নারীদের স্থানীয় খাবার ও হস্তশিল্পভিত্তিক উদ্যোগে যুক্ত করা এবং ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে।
পর্যটন উন্নয়নের নামে যেন আবার পরিবেশ বা ঐতিহ্য ধ্বংস না হয়, সে
দিকেও সতর্ক থাকতে হবে। সুন্দরবনে যেমন ধারণক্ষমতার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে, তেমনি প্রত্নস্থাপনাগুলোর ক্ষেত্রেও বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের আগে ঐতিহাসিক স্থাপনার চরিত্র ও পরিবেশ রক্ষার বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পর্যটনের ভবিষ্যৎ তাই শুধু নতুন পর্যটনকেন্দ্র তৈরির মধ্যে নয়; বরং বিদ্যমান সম্পদকে যথাযথভাবে চিহ্নিত, সংরক্ষণ, সংযুক্ত, ব্যবস্থাপনা ও বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরার মধ্যে।
আমাদের ইতিহাস আমাদের হাতে আছে। আমাদের প্রকৃতিও আছে। আছে সাহিত্য, স্থাপত্য, নদী, বন, জীববৈচিত্র্য এবং মানুষের সংস্কৃতি। এখন প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা ও দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা।
বিশ্ব পর্যটন দিবসে তাই দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য একটি সুস্পষ্ট দাবি উঠতে পারে—**পর্যটনকেন্দ্র নয়, পর্যটন অঞ্চল হিসেবে ভাবতে হবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলকে।**
সরকারের পর্যটন মহাপরিকল্পনায় এ অঞ্চলের প্রত্নসম্পদ, সুন্দরবন, সাহিত্য-ঐতিহ্য ও স্থানীয় অর্থনীতিকে সমন্বিত করে একটি পৃথক ‘দক্ষিণ-পশ্চিম পর্যটন করিডর’ বা পর্যটন সার্কিটের পরিকল্পনা নেওয়া হোক। প্রত্নতত্ত্ব সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসনিক সক্ষমতা বাড়ানো হোক। পর্যটকবান্ধব যোগাযোগ, আবাসন, তথ্যকেন্দ্র ও পরিবহন গড়ে উঠুক। আর ডিজিটাল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা হোক এই অঞ্চলের হাজার বছরের ইতিহাস ও প্রকৃতির গল্প।
তাহলেই পর্যটন দিবসের আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে পর্যটন হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নতুন অর্থনৈতিক শক্তি—যেখানে ইতিহাস সংরক্ষিত হবে, প্রকৃতি সুরক্ষিত থাকবে, স্থানীয় মানুষ উপকৃত হবেন এবং বাংলাদেশের এই সমৃদ্ধ ভূখণ্ড নতুন করে পরিচিত হবে দেশ-বিদেশের মানুষের কাছে।





