যশোর-৩: ৫ প্রার্থীর সবাই ব্যবসায়ী, এর মধ্যে ১ জন চিত্রশিল্পী ও ১ জন স্বশিক্ষিত

হলফনামার খবর

0
যশোর-৩ (সদর) আসনে প্রতিদ্বন্ধী ৫ প্রার্থী।।

বিশেষ প্রতিনিধি ॥ আসন্ন নির্বাচনকে ঘিরে যশোর-৩ (সদর) আসনের রাজনৈতিক অঙ্গন এখন সরগরম। তবে ভোটের লড়াইয়ের আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে প্রার্থীদের জমা দেওয়া নির্বাচনী হলফনামা। এই আসনে প্রতিদ্বন্ধী ৫ প্রার্থীর সবাই ব্যবসায়ী। একজন ‘স্ব-শিক্ষিত’ বাকি সবাই স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী।

রাজপথে ভূমিকা রাখার জন্য ৫১টি রাজনৈতিক মামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে বিএনপি প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতকে। এখনো তার নামে ৬টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। বাকি ৪জন মামলা মুক্ত। বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থী দুইজনই কোটিপতি হলেও সম্পদের শীর্ষে রয়েছেন জামায়াত প্রার্থী আব্দুল কাদের।

এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. আব্দুল কাদের, জাতীয় পার্টির মো. খবির গাজী , জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপার মো. নিজামদ্দিন অমিত এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির মো. রাশেদ খান।

প্রার্থীদের দেয়া হলফনামাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের স্ত্রী ব্যবসায়ী, আব্দুল কাদেরের স্ত্রী ব্যবসার মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য আয় করেন (৭.২৫ লাখ টাকা)। নিজামদ্দিন অমিতের স্ত্রী টিউশনি করেন। অন্যদিকে, খবির গাজী ও রাশেদ খানের নির্ভরশীলদের কোনো নিজস্ব আয়ের উৎস নেই।

খবির গাজীদের রয়েছে ৭০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, নিজাম উদ্দীন অমিতদের ১৫ ভরি, আব্দুল কাদেরদের ৬৫ ভরি এবং অমিত পরিবারের রয়েছে ৫০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। পক্ষান্তরে তরুণ প্রার্থী রাশেদ খানের কোনো স্বর্ণালঙ্কার নেই।

সম্পদ ও মামলার দিক দিয়ে ৫ প্রার্থীর রয়েছে ব্যাপক ব্যবধান। বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ১১ কোটি ৪২ লাখ টাকার বেশি অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। তার বার্ষিক আয় ৯০ লাখ টাকার বেশি। তার বিরুদ্ধেই ৬টি বিচারাধীন মামলা রয়েছে। যদিও তিনি অতীতে ৪৫টির বেশি মামলা থেকে খালাস পেয়েছেন।

বাকি প্রার্থীদের কারো নামে মামলা নেই বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অপরদিকে, আব্দুল কাদের বার্ষিক আয়৪.৫৩ লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ (নিজস্ব)৯ কোটি ৮৮ লাখ টাকা। তার স্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৩ কোটি টাকা। নিজামদ্দিন অমিতের বার্ষিক আয় ২.১০ লাখ টাকা, অস্থাবর সম্পদ এক লাখ টাকা নগদ। খবির গাজীর বার্ষিক আয় ৫.৫০ লাখ টাকা এবং নগদ ১৭.৬০ লাখ টাকা। মো. রাশেদ খানের বাৎসরিক আয় ২লাখ টাকা এবং অস্থাবর সম্পদ ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা।

৫০ বছর বয়সী স্ব-শিক্ষায় শিক্ষিত ও ব্যবসায়ী মো. খবির গাজী হলফনামায় ৫,৫০,০০০ টাকা আয় দেখিয়েছেন। তার সম্পদের পরিমাণ ৪৯,২৫,০০০ টাকা। তার নিজের বা তার স্ত্রীর নামে কোনো কৃষি জমি, অকৃষি জমি, বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নেই বলে তথ্য প্রদান করেছেন। তবে নিজ নামে ১৭,৬০,০০০ টাকা নগদ অর্থ রয়েছে। এছাড়া তার কাছে ৬০ ভরি সোনা এবং স্ত্রীর নামে ১০ ভরি সোনা থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

মাস্টার্স পাস ব্যবসায়ী মো. নিজামদ্দিন অমিতের নিজ নামে কোনো কৃষি জমি নেই। তবে পৈত্রিক সূত্রে প্রাপ্ত অকৃষি জমির ৫ ভাগের ১ অংশের মালিক তিনি। এছাড়া পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া একটি দালান বা বাড়ির ৩ ভাগের ১ অংশের মালিকানাও তার রয়েছে। তার স্ত্রীর নামে কোনো স্থাবর সম্পদ নেই বলে হলফনামায় জানানো হয়েছে। প্রার্থীর নিজ নামে নগদ ১লাখ টাকা রয়েছে। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে মাত্র ৩ হাজার টাকা।

এছাড়া তার ৪০হাজার টাকা দামের একটি মোটরসাইকেল, উপহার হিসেবে পাওয়া ১০ ভরি সোনা ৫০ হাজার টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী এবং ৫০ হাজার টাকার আসবাবপত্র রয়েছে। তার স্ত্রীর নামেও নগদ ৫০হাজার টাকা এবং ৫ ভরি সোনা থাকার তথ্য দেওয়া হয়েছে। ব্যবসা থেকে তার বার্ষিক আয় ২লাখ ১০ হাজার টাকা। এছাড়া তার স্ত্রীর টিউশনি থেকে বছরে ৩৬ হাজার টাকা আয় হয় বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।

২৮ বছর বয়সী চিত্রশিল্পী মাস্টার্স পাস মো. রাশেদ খানের বিরুদ্ধে বর্তমানে কোনো ফৌজদারি মামলা নেই এবং অতীতেও তিনি কোনো মামলায় অভিযুক্ত হননি। হলফনামায় নিজের নামে কোনো কৃষি জমি, অকৃষি জমি, বাড়ি বা অ্যাপার্টমেন্ট নেই বলে তথ্য প্রদান করা হয়েছে। তার মোট ১,৫৭,০০০ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে নগদ ৫০,০০০ টাকা এবং প্রিমিয়ার ব্যাংক পিএলসি-র যশোর শাখায় ২২,০০০ টাকা জমা আছে।

এছাড়া তার ৪৫,০০০ টাকা মূল্যের পুরাতন ইলেকট্রনিক পণ্য এবং ৪০,০০০ টাকা মূল্যের পুরাতন আসবাবপত্র রয়েছে। ব্যবসা থেকেই বার্ষিক আয় ২ লাখ টাকা আয় হয় তার।

হলফনামায় দেয়া তথ্যে ব্যবসায়ী আব্দুল কাদেরের নামে ৮১লাখ ৩৩৬ টাকার ব্যাংক ঋণ রয়েছে। তার মালিকানায় স্থাবর সম্পদ হিসেবে ১৫৭.৫৮ শতক কৃষি জমি এবং ৩৮.৮৩ শতক অকৃষি জমি রয়েছে। যশোরে প্রায় ২১লাখ ৪৯হাজার টাকা দামের একটি আবাসিক ভবন ছাড়াও ঢাকার উত্তরায় ৩৬লাখ ৪৫হাজার টাকা দামের একটি অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে তার। হলফনামা অনুযায়ী, তার স্থাবর সম্পদের বর্তমান আনুমানিক বাজারমূল্য ৩৩ কোটি টাকা প্রায়।

আব্দুল কাদেরের বার্ষিক আয়ের প্রধান উৎস কৃষি খাত, ব্যবসা এবং ব্যাংক আমানত। তার নিজের নামে বার্ষিক আয় ১৪ লাখ৫৩ হাজার ৮৩৮ টাকা এবং তার স্ত্রীর বার্ষিক আয় ৭লাখ ২৫হাজার ১৪০ টাকা দেখানো হয়েছে।

পেশা হিসেবে তিনি এবং তার স্ত্রী উভয়েই ব্যবসার সাথে জড়িত। আব্দুল কাদেরের নামে নগদ ৪৫,৫৩,৪২৩ টাকা রয়েছে। এছাড়াও তার ১,০০,০০,০০০ টাকার শেয়ার ও সঞ্চয়পত্র রয়েছে। সম্পদের বিবরণে ১টি পিস্তল, ২২ ভরি সোনা (যার মূল্য ২,৬০,০০০ টাকা) এবং ৯,৬৩,০০০ টাকা মূল্যের একটি প্রাইভেটকার ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তার মোট অস্থাবর সম্পদের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৯,৮৮,১০,০০০ টাকা। অন্যদিকে তার স্ত্রীর নামে ৪৩ ভরি সোনা এবং ৩,৮৮,৫০,০০০ টাকা সমমূল্যের অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।

উচ্চ শিক্ষিত ও রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান ব্যবসায়ী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত হলফনামায় দেয়া তথ্যে কোনো ব্যাংক ঋণ নেই বলে উল্লেখ করেছেন। তবে জরুরি প্রয়োজনে এবং ভাড়া বাবদ অগ্রিম জামানত হিসেবে ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক বিভিন্ন পক্ষ থেকে তার নামে ৩কোটি৪৩ কোটি টাকা এবং স্ত্রীর নামে ১কোটি ১৪ কোটি টাকার দায় রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তার নামে কৃষি ও অকৃষি জমি এবং ফ্ল্যাটসহ প্রায় ১ কোটি ২ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে ঢাকায় একটি ফ্ল্যাট এবং একটি প্লট (অগ্রিম প্রদত্ত) রয়েছে। তার স্ত্রীর নামেও ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকার স্থাবর সম্পদ রয়েছে।

তার অস্থাবর সম্পদের মধ্যে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমা আছে ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা, সঞ্চয়পত্র ও স্থায়ী আমানত ৩ কোটি ১২ লাখ টাকা এবং ডিপিএস বাবদ ২ কোটি ৯০ কোটি টাকা। তার কাছে ১টি আগ্নেয়াস্ত্র (মূল্য ২.৫০ লাখ টাকা) এবং উপহার পাওয়া ৪০ ভরি ও কেনা ১০ ভরি মিলিয়ে মোট ৫০ ভরি সোনা রয়েছে। তার স্ত্রীর নামেও ৩ কোটি৩৪ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে।