যশোর-খুলনাঞ্চলের কুচিয়া যাচ্ছে চীনে ভাগ্য বদলেছে অনেকের

0
ছবি: সংগৃহীত।

নজরুল ইসলাম মল্লিক, অভয়নগর (যশোর)॥ একসময় অবহেলিত ও অপ্রচলিত কুচিয়া এখন যশোর-খুলনা অঞ্চলের অনেক মানুষের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম। স্থানীয় জলাশয় থেকে শিকার করা কুচিয়া এখন রপ্তানি হচ্ছে চীনে। আর এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভাগ্য বদলেছে যশোরের অভয়নগরের কচুয়া গ্রামের কুমার বৈরাগীর।

একসময় অভাব-অনটনে দিন কাটলেও এখন স্বচ্ছলতার মুখ দেখছেন কুমার। কুচিয়া শিকার ও ব্যবসাকে কেন্দ্র করে শুধু তার নিজের জীবনই বদলায়নি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে অভয়নগর, মণিরামপুর ও চৌগাছা উপজেলার এক হাজারের বেশি মানুষের।

যশোরাঞ্চলের বিভিন্ন প্রাকৃতিক জলাশয়ে প্রচুর পরিমাণে কুচিয়া জন্মে। দীর্ঘদিন ধরে এ মাছ শিকার করা হলেও ধর্মীয় ও নানা কারণে স্থানীয়ভাবে এর চাহিদা ছিল কম। ফলে অনেকটাই অবহেলিত ছিল সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ এই পানির প্রাণী।

গত কয়েক বছরে সেই চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। কুচিয়া এখন স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হচ্ছে। রপ্তানি হচ্ছে চীনে।

অভয়নগরের কচুয়া গ্রামের বাসিন্দা কুমার বৈরাগী প্রায় সাত বছর আগে কুচিয়া ব্যবসা শুরু করেন। তবে ব্যবসায় সফলতা পেতে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে প্রায় চার বছর। এরআগে মাছ ও কুচিয়া শিকার করে হাট-বাজারে বিক্রি করেই চলতো তার সংসার। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে কঠিন দারিদ্র্যের মধ্যে দিন কাটাতে হতো তাকে।

মাত্র ১০ হাজার টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা সেই ব্যবসা এখন তার ভাগ্য বদলে দিয়েছে। গত বছর একশটি চালানে প্রায় ১০ হাজার কেজি কুচিয়া পাইকারি বিক্রি করেছেন কুমার। খরচ বাদ দিয়ে মুনাফা করেছেন তিন লাখ টাকার বেশি। সেই আয় দিয়ে জমি কেনার পাশাপাশি নির্মাণ করেছেন পাকা ঘর।

বর্তমানে অভয়নগরসহ বিভিন্ন এলাকার ১৫ থেকে ২০টি গ্রামের কুচিয়া শিকারিদের কাছ থেকে মাছ সংগ্রহ করে খুলনা ও ঢাকায় পাইকারি সরবরাহ করছেন তিনি। আর সেখান থেকেই কুচিয়া যাচ্ছে চীনের বাজারে।

ব্যবসার কাজে এখন কুমারের পাশে রয়েছেন তার স্ত্রী ও একমাত্র ছেলে। বাড়িতেই গড়ে তুলেছেন কুচিয়া সংরক্ষণ হাউজ। শুরু করেছেন রেডি ও কুক প্রক্রিয়ায় কুচিয়া বিক্রিও।

কুমারের ব্যবসা সম্প্রসারণে সহযোগিতা করছে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা নবলোক পরিষদ। সংস্থাটির পক্ষ থেকে তার বাড়ির আঙিনায় বিনামূল্যে নির্মাণ করে দেওয়া হয়েছে কুচিয়া সংরক্ষণ হাউজ। দেওয়া হয়েছে টেবিলসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও আর্থিক সহায়তা। এতে ব্যবসা আরও সম্প্রসারিত হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

কুচিয়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্তরা বলছেন, একসময় যে মাছকে অবহেলার চোখে দেখা হতো, এখন সেই কুচিয়াই তাদের পরিবারের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস। কুচিয়া শিকার করে অনেকেই সংসারের ব্যয় মেটানোর পাশাপাশি সন্তানদের পড়াশোনা ও ঘরবাড়ি নির্মাণের সুযোগ পাচ্ছেন।

এদিকে যশোরের অভয়নগর, মণিরামপুর ও চৌগাছা উপজেলায় কুচিয়া শিকারকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে এক হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে। দিন দিন এ সংখ্যা আরও বাড়ছে।

জেলা মৎস্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছর যশোর জেলায় ২৮ মেট্রিক টনের বেশি কুচিয়া আহরণ করা হয়েছে। কুচিয়াকেন্দ্রিক ব্যবসা সম্প্রসারণে জেলার বিভিন্ন মাছের বাজারে পৃথক বিক্রয়কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছে মৎস্য বিভাগ।

স্থানীয় বাজারে প্রতি কেজি কুচিয়া ৩৫০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। তবে মৌসুম ও সরবরাহের ওপর নির্ভর করে এর দাম ওঠানামা করে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে কুচিয়া আহরণ, সংরক্ষণ ও বাজারজাত করা গেলে এ খাত থেকে আরও বড় পরিসরে কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব। পাশাপাশি রপ্তানি বাড়িয়ে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে যশোর-খুলনাঞ্চলের এই সম্ভাবনাময় জলজ প্রাণী।