বাগেরহাটের বগা গ্রামে নিহত জেলে পরিবারগুলোতে শোকের মাতম # আরও ১ মরদেহ উদ্ধার, এখনও নিখোঁজ ৭

0

আলী আকবর টুটুল,বাগেরহাট ॥ মাছধরা ট্রলারডুবিতে নিহতের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। বুধবার সকালে চারজনের মরদেহ বাগেরহাটে পৌছায়। এর মধ্যে রহুল হাওলাদার, শহিদুল মল্লিক ও সহিদের বাড়ি কচুয়া উপজেলার বগা গ্রামে। অপরজন আনেয়ার হোসেন বাদলের বাড়ি পাশের গ্রাম আন্ধারমানিকে। এদিকে গতকাল আরও একটি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহতদের বাড়ি মরদেহগুলো পৌঁছালে স্বজনদের কান্নায় আকাশ-বাতাশ ভারী হয়ে ওঠে। এক হৃদয় বিদারক দৃশ্য সৃষ্টি হয় বগা গ্রামে। এই গ্রামের এখনও দুই জন জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। পরিবারের একমাত্র কর্মক্ষম সদস্যকে হারিয়ে অনিশ্চতার মধ্যে পড়েছেন নিহতের স্বজনরা। নিহতের পরিবারগুলোকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা প্রশাসক। এখনও যেসব জেলে নিখোজ রয়েছে উদ্ধারে অভিযান চলছে বলে জানিয়েছে বনবিভাগ। বুধবার সকালে বগা গ্রামের নিহত রুহুল আমিনের বাড়িতে প্রবেশ করতেই তার স্বজনদের আহাজারি চোখে পড়ে। ঘরের চাল থেকে দীর্ঘদিনের মরিচাপড়া টিনগুলো খসে পড়ছে। ঘরের বেড়াগুলোও জরাজীর্ণ অবস্থায় রয়েছে। রুহুলের আয়ে কোনমতে জীবন টিকে ছিল তাদের। এই অবস্থায় রুহুলকে হারিয়ে সংকটে পড়েছে পরিবারটি।
রুহুলের স্ত্রী রুমিচা বেগম বলেন, গত ১ ফেব্রুয়ারি রাতে আনিস সরদারের এফবি মায়ের দোয়া ট্রলারে সাগরে ইলিশ আহরণ করতে যান তার স্বামী। শুক্রবার রাতের ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোজের খবর পান তারা। তিনি বলেন, ‘এলাকার লোকজন আজ আমার স্বামীর মরদেহ বাড়িতে নিয়ে আসছেন। আমার ঘর নাই, চাল নেই, দিন আনি দিন খাই। দুই ছেলে ১২ বছরের এখলাছ ও ৮ বছরের ইয়াছিনকে নিয়ে আমি কীভাবে চলব? রুহুলের প্রতিবেশী আবুবকর মোল্লা এখনও নিখোজ রয়েছেন। তার বাড়িতেও চলছে শোকের মাতম। আবু বকরের স্ত্রী লামিয়া বেগম বলেন, ‘আড়াই বছরের আয়শা ও তিন মাস বয়সী আবিদ নামের দুটি সন্তান রয়েছে আমাদের। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হওয়ার পরে এখনও বাড়িতে ফেরেনি আমার স্বামী। জমিও নেই। অন্যের জমিতে ঘর বেধে থাকি আমরা। বাবার বাড়ির আর্থিক অবস্থাও খুবই খারাপ। শিশু সন্তানদের নিয়ে এখন আমি কোথায় যাব!’ আবুবকরের মা হাজেরা বেগম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, বাবার লাশটা যদি পাই, তাহলে বাড়িতে এনে কবর দিতে পারতাম। যতদিন বেঁচে থাকতাম বাবার কবর দেখেও মনকে বুঝ দিতে পারব। বাবার সন্তানদের বলতে পারব তোমার বাবা এখানে শুয়ে আছেন। শুধু রুহুল ও আবুবকরের পরিবার নয়, নিহত ও নিখোঁজ প্রত্যেকের পরিবারের একই অবস্থা। প্রত্যন্ত এই গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের পেশা সাগরে মাছ ধরা। দীর্ঘদিন ধরে জীবনের ঝঁকি নিয়ে মাছ আহরণে গেলেও আর্থিক অবস্থার কোন উন্নতি হয়নি তাদের। পেশাগত কাজে সাগরে থাকা অবস্থায় নিহত বা আহত হলে কোনপ্রকার সহযোগিতাও পান না তারা। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হবে। এছাড়া যারা নিখোঁজ রয়েছেন তাদেরও পরিবারকে সহায়তার আশ্বাস দেন জেলা প্রশাসনের শীর্ষ এই কর্মকর্তা। এদিকে গতকাল মফিজুল ইসলাম নামে আরও এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। দুপুরে বঙ্গোপসাগরে সুন্দরবন সংলগ্ন কালিরচর এলাকা থেকে ভাসমান অবস্থায় তার মরদেহ উদ্ধার করে জেলেরা। এ নিয়ে ট্রলার ডুবির ঘটনায় ৮ জেলের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এখনও ৬ জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। নিহত মফিজুল ইসলাম মোংলা উপজেলার বকুলতলা গ্রামের মোঃ রওশন আলী ছেলে। সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের দুবলা শুটকি পল্লী টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রহ্লাদ চন্দ্র রায় বলেন, গত ৪ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার রাতে সাগরে মাছ ধরার সময় আকস্মিক ঝড়ের কবলে পড়ে সুন্দবনের দুবলার শুঁটকি পল্লী এবং উপকূলীয় এলাকার কয়েকটি ট্রলার ডুবে যায়। এসময় অনেক জেলে সাঁতরিয়ে কুলে উঠতে পারলেও নিখো্জঁ হন অন্তত ১০ জেলে। এরমধ্যে বাগেরহাটের কচুয়া উপজেলার বগা গ্রামের এফবি মা-বাবা দোয়া নামের একটি ট্রলারের ১৪ জেলে মধ্যে ৭ জন নিখোঁজঁ হয়।