বাইমাইল নয় ঢাকার তাঁতীবাজার থেকেই পালিয়েছিলেন পিচ্চি রাজা, গ্রেপ্তার দুই পুলিশ সদস্য

0
গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে প্রিজন ভ্যান থেকে শীর্ষ মাদক কারবারি পিচ্চি রাজার পালানোর স্থান নিয়ে ধোঁয়াশা কেটেছে। বাইমাইল নয়, তিনি ঢাকার তাঁতীবাজার থেকে পালিয়েছিলেন। ঘটনায় জড়িত দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।। ছবি: সংগৃহীত

শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা গাজীপুরের বাইমাইল নয়, ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকেই পালিয়েছিলেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছে গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গত ২৭ সেপ্টেম্বর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে নেওয়ার পথে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে তাঁর এই পালানোর ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে গতকাল শনিবার দুই পুলিশ সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ ও কারাগার সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মোট ৩০ জন আসামিকে ঢাকার আদালতে হাজিরা ও মামলার শুনানির জন্য নেওয়া হয়েছিল। আদালতের যাবতীয় কার্যক্রম শেষ করে তাঁদের পুনরায় কাশিমপুর কারাগারে ফিরিয়ে নেওয়ার পথে রাতে পিচ্চি রাজা শৌচাগারে যাওয়ার কথা বলে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে কৌশলে পালিয়ে যান।

ঘটনার পরপরই পুলিশের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছিল, আসামি বহনকারী প্রিজন ভ্যানটি রাত সাড়ে আটটার দিকে গাজীপুরের বাইমাইল এলাকায় পৌঁছায়। ওই সময় গাড়িতে থাকা পুলিশের এক উপপরিদর্শক (এসআই) পিচ্চি রাজাকে শৌচকর্ম করানোর উদ্দেশ্যে নিচে নামান এবং তখনই তিনি কৌশলে দৌড়ে পালিয়ে যান। গাড়িটিতে থাকা অন্য ২৯ জন আসামিকে পরবর্তীতে নিরাপদে কারাগারে পাঠানো হয়। তবে এই ঘটনার সাত দিন পার হতে চললেও পালিয়ে যাওয়া পিচ্চি রাজাকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

এ ঘটনায় দায়িত্বে চরম অবহেলার অভিযোগে প্রিজন ভ্যানের সঙ্গে দায়িত্বরত এসআই প্রবীর কুমার, কনস্টেবল মো. জাকির হোসেন, মো. সাকিব, শাকিল হোসেন এবং প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

"সাময়িক বরখাস্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে
বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
কিন্তু তাঁরা সঠিক কোনো তথ্য দিচ্ছেন না।
আসামি কোন স্থান থেকে পালিয়ে গেছেন,
তা নিয়েও তাঁরা একেক সময় একেক কথা বলছেন।" 
— 
মোহাম্মদ মহিউল ইসলাম,
উপপুলিশ কমিশনার (সিটি এসবি),
গাজীপুর মহানগর পুলিশ

পরবর্তীতে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া এই পাঁচ পুলিশ সদস্যকে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে ঘটনা তদন্তে গঠিত পর্যবেক্ষণ কমিটি। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে পিচ্চি রাজার পালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে প্রত্যক্ষ জড়িত থাকার অভিযোগে এসআই প্রবীর কুমার ও প্রিজন ভ্যানের চালক নায়েক কামাল হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। একই সঙ্গে বরখাস্ত হওয়া অন্য তিন পুলিশ সদস্যকেও কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ কমিটির পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পাঁচ পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে জিজ্ঞাসাবাদে এখনো ঘটনার বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট ও সন্তোষজনক তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি আসামি যে স্থান থেকে পালিয়ে গেছেন বলে শুরুতে পুলিশ সদস্যরা দাবি করেছিলেন, তদন্তে উঠে এসেছে যে সেটিও সঠিক নয়।

আরও পড়ুন: 

কারাগারে নেওয়ার পথে 'পিচ্চি রাজা'র পলায়ন, ৫ পুলিশ সদস্য বরখাস্ত

আসামি পালানোর স্থান নিয়ে সাময়িক বরখাস্তকৃত পুলিশ সদস্যরা একেক সময় একেক ধরনের তথ্য প্রদান করছেন। তাঁদের দেওয়া তথ্যের এই অসংগতির কারণে আসামি ঠিক কোথা থেকে পালিয়েছেন তা নিয়ে তীব্র ধোঁয়াশা তৈরি হয়। তবে পুলিশ এর মধ্যেই প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হতে পেরেছে যে, পিচ্চি রাজা মূলত ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকেই পালিয়েছিলেন।

তদন্ত পর্যবেক্ষণ কমিটির প্রধান এবং গাজীপুর মহানগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (সিটি এসবি) মোহাম্মদ মহিউল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সাময়িক বরখাস্ত হওয়া পাঁচ পুলিশ সদস্যকে বিভিন্নভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। কিন্তু তারা তদন্ত কর্মকর্তাদের সঠিক কোনো তথ্য দিচ্ছেন না। আসামি কোন স্থান থেকে পালিয়েছেন, তা নিয়ে তারা একেক সময় একেক কথা বলছেন।

পূর্বে যে স্থান থেকে পালিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়েছিল, সেটিও সঠিক নয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। মহিউল ইসলাম আরও জানান, ঘটনার প্রকৃত স্থান ও ঠিক কীভাবে আসামি পালিয়ে গেলেন তা জানার জোর চেষ্টা চলছে এবং তদন্তের বিভিন্ন দিক গভীর ও সূক্ষ্মভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হওয়া শীর্ষ মাদক কারবারি রাজা ওরফে পিচ্চি রাজা (ফাইল ছবি)।

পর্যবেক্ষণ কমিটির অন্যতম সদস্য ও কোনাবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইফতেখার হোসেন এ প্রসঙ্গে বলেন, প্রিজন ভ্যানে কারাগার থেকে আদালত এবং আদালত থেকে পুনরায় কারাগারে ফেরার মধ্যবর্তী রাস্তায় কোথাও গাড়ি থামানোর কোনো সুযোগ বা নিয়ম নেই। কোনো বড় ধরনের বিপদ হলে কেবল নিকটবর্তী কোনো থানায় গাড়ি থামানো যেতে পারে। কিন্তু দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা যে স্থানে গাড়ি থামানোর কথা বলছেন, সেখানে গাড়ি থামানোর কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

এই কর্মকর্তা আরও যুক্ত করেন, অভিযুক্ত পাঁচ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করে তাঁদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পর্যবেক্ষণ কমিটির কাজ শেষ হলে দ্রুত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে এবং এর পরই বিভাগীয় মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হবে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা স্পষ্ট করেছেন যে, আসামি পালানোর প্রকৃত স্থান, ঠিক কীভাবে তিনি পুলিশের হেফাজত থেকে বের হয়ে যেতে সক্ষম হলেন এবং দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যদের এতে কী ভূমিকা ছিল—এই বিষয়গুলোকে এখন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি পাঁচ পুলিশ সদস্যের দেওয়া বক্তব্যের অসংগতিগুলোও নিবিড়ভাবে যাচাই করা হচ্ছে।

পুরো মামলাটি তদন্তের দায়িত্বে রয়েছে গাজীপুর মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গোয়েন্দা পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) সাহেব আলী পাঠান জানান, একেক পুলিশ সদস্য একেক তথ্য দিলেও প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হওয়া গেছে যে পিচ্চি রাজা ঢাকার তাঁতীবাজার এলাকা থেকেই পালিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে এই ঘটনার সঙ্গে দুই পুলিশ সদস্যের সরাসরি সম্পৃক্ততা জানার পর তাঁদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, চলতি বছরের ১৯ মে ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার শীর্ষ মাদক কারবারি হিসেবে পরিচিত এই রাজা ওরফে পিচ্চি রাজাকে গ্রেপ্তার করেছিল পুলিশ। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।