চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে অবমুক্ত রয়েল বেঙ্গল টাইগার

ছয় মাসের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পর ফিরল বনে; গতিবিধি পর্যবেক্ষণে বসানো হয়েছে ২০ ইনফ্রারেড ট্র্যাপ ক্যামেরা

0
চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে অবমুক্ত রয়েল বেঙ্গল টাইগার

মোংলা (বাগেরহাট) সংবাদদাতা: শিকারিদের পাতা ফাঁদে গুরুতর আহত হওয়ার ছয় মাস পর আবারও নিজের আবাস সুন্দরবনে ফিরল একটি রয়েল বেঙ্গল টাইগার। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আহত একটি বাঘকে দীর্ঘ চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও নিবিড় পরিচর্যার মাধ্যমে সুস্থ করে সুন্দরবনে অবমুক্ত করেছে বন বিভাগ।

রোববার ভোরে খুলনার বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে বিশেষ নিরাপত্তায় খাঁচাবন্দি অবস্থায় নৌপথে বাঘিনীটিকে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বনাঞ্চলে নেওয়া হয়। পরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম, বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক মো. আমির হোসাইন চৌধুরী, বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, গবেষক ও বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের উপস্থিতিতে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়।

অবমুক্তকালে প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, “বাংলাদেশে এই প্রথমবারের মতো সুন্দরবনের একটি অসুস্থ বাঘকে চিকিৎসার মাধ্যমে সুস্থ করে আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়া হলো। এটি বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।”

চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে অবমুক্ত রয়েল বেঙ্গল টাইগার – লোকসমাজ

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, গত ৩ জানুয়ারি সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের বৈদ্যমারী এলাকার শরকির খালসংলগ্ন বনে শিকারিদের পাতা হরিণ ধরার ছিটকা ফাঁদে আটকা পড়ে বয়স্ক বাঘিনীটি। ধারণা করা হয়, উদ্ধারের চার থেকে পাঁচ দিন আগেই এটি ফাঁদে আটকে যায়। মুক্ত হওয়ার চেষ্টায় সামনের বাঁ পায়ে মারাত্মক ক্ষত সৃষ্টি হয় এবং দীর্ঘ সময় আটকে থাকায় ক্ষতস্থানে পচন ধরে। ফলে বাঘিনীটি দুর্বল ও ক্ষীণকায় হয়ে পড়ে।

খবর পেয়ে ৪ জানুয়ারি বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল ট্র্যাংকুলাইজার গান ব্যবহার করে বাঘিনীটিকে উদ্ধার করে। পরে খুলনার উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে নিয়ে পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ডের তত্ত্বাবধানে টানা ছয় মাস চিকিৎসা, নিয়মিত ড্রেসিং ও নিবিড় পরিচর্যা করা হয়।

খুলনা ওয়াইল্ডলাইফ অ্যান্ড নেচার কনজারভেশন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল জানান, বাঘিনীটির বয়স আনুমানিক ১০ থেকে ১১ বছর। সামনের বাঁ পায়ের প্রায় তিন ইঞ্চি অংশজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ, নিয়মিত চিকিৎসা ও পরিচর্যার ফলে মার্চ মাসের মধ্যে ক্ষত শুকিয়ে যায়। বর্তমানে ক্ষতস্থান সম্পূর্ণ সেরে উঠেছে এবং সেখানে নতুন লোমও গজিয়েছে। চিকিৎসা শেষে বাঘিনীটি স্বাভাবিক গতি, ক্ষিপ্রতা ও আচরণ ফিরে পাওয়ায় তাকে বনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

বাঘিনীটির চলাফেরা, শিকার ধরার সক্ষমতা এবং নতুন পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর বিষয়টি পর্যবেক্ষণে বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে বন বিভাগ। বন সংরক্ষক সানাউল্লাহ পাটোয়ারী জানান, বাঘিনীর বিচরণ এলাকায় ২০টি ইনফ্রারেড ট্র্যাপ ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। এসব ক্যামেরার মাধ্যমে তার গতিবিধি ও আচরণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হবে।

সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, অবমুক্তির স্থানে ১৯টি এবং উদ্ধারের স্থানে একটি—মোট ২০টি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। প্রায় ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে স্থাপিত এসব ক্যামেরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও ও স্থিরচিত্র ধারণ করবে। প্রথমে স্যাটেলাইট কলার ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি না পাওয়ায় ক্যামেরাভিত্তিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে।

তিনি আরও জানান, একটি পূর্ণবয়স্ক রয়েল বেঙ্গল টাইগার সাধারণত ৩০ থেকে ৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিচরণ করে। অবমুক্ত করা বাঘিনীটি পূর্বের এলাকায় ফিরে যায় কি না, কিংবা নতুন এলাকায় স্থায়ী আবাস গড়ে তোলে কি না, তাও পর্যবেক্ষণে রাখা হবে। উদ্ধারস্থল থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে বাঘিনীটিকে অবমুক্ত করা হয়েছে।

অবমুক্ত অনুষ্ঠানে বন অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, গবেষক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।