এ–প্রাসাদ থেকে ও–প্রাসাদ—দফায় দফায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে সৌদি যুবরাজকে

0
সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ ।। ছবি: সংগৃহীত

হুতিদের হামলার মুখে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়েছেন সৌদি আরবের যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান। ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার কারণে পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল হয়ে উঠেছে।

ফলশ্রুতিতে, পরিস্থিতি বিবেচনায় ৪১ বছর বয়সী এই যুবরাজকে কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীর মধ্যে বাংকার-সুবিধাসম্পন্ন বিভিন্ন রাজপ্রাসাদে দফায় দফায় সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে এই তথ্য জানিয়েছে।

গত শনিবার সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এক ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। গত এক দশকের মধ্যে দেশটির ইতিহাসে এটিই সবচেয়ে বড় ও রক্তক্ষয়ী হামলা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই ভয়াবহ হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত ও তিন শতাধিক মানুষ আহত হন।

উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, হুতিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিবিড়ভাবে বিবেচনা করছে। পাশাপাশি রিয়াদের ‘মক্কা চুক্তি’র মিত্ররাও সৌদি আরবের প্রতি তাদের জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করেছে।

সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, গত শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার পর আগুন ও ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়লে নিরাপদ আশ্রয় নিচ্ছেন যাত্রীরা। ১০ অক্টোবর ২০২৬ ।। ছবি: সংগৃহীত

গত মঙ্গলবার একটি জাতীয় রক্তদান কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর থেকে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি। তাঁর সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে লড়াই তীব্র আকার ধারণ করায় তাঁর নিরাপত্তায় অত্যন্ত কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। লোকচক্ষুর আড়ালে রেখে বিশেষভাবে বাছাই করা একটি সুদক্ষ নিরাপত্তা দলের সরাসরি তত্ত্বাবধানে বর্তমানে তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতির বিষয়ে আনুষ্ঠানিক মন্তব্যের জন্য সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে, হুতিদের এক মুখপাত্র রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন যে সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোয় তাঁদের এ ধরনের হামলা অব্যাহত থাকবে। গত পাঁচ দিনে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চারবার হামলা চালানো হয়েছে। বিশেষ করে গত সপ্তাহান্তের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর থেকেই এ বিমানবন্দরটি পুরোপুরি বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে কর্তৃপক্ষ। উড়োজাহাজ চলাচলবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সিরিয়াম’-এর তথ্য অনুযায়ী, এই মারাত্মক অচলাবস্থার কারণে রিয়াদ বিমানবন্দরের নির্ধারিত ফ্লাইটের প্রায় ৬০ শতাংশই বাতিল করতে হচ্ছে।

হুতিদের এমন ধারাবাহিক আক্রমণের জবাবে সৌদির জ্বালানিমন্ত্রী প্রিন্স আবদুল আজিজ বিন সালমান বলেছেন, হামলার ভয়াবহতা বিবেচনা করে সৌদি আরবের প্রতিক্রিয়াও সমপর্যায়ের কঠোর হবে। তবে দেশটির কর্মকর্তারা গোপনে স্বীকার করেছেন যে একের পর এক হামলা প্রতিহত করতে গিয়ে তাঁদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ক্ষেপণাস্ত্র বা ইন্টারসেপ্টরের মজুত দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা আরও জোরদার করতে গত মাসে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান ও মিসরের কাছে সামরিক সহায়তা চেয়েছে রিয়াদ। সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের কারণে স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের নিজের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুতও এখন বেশ কম রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে চলা এক রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের পর ২০২২ সালে সৌদি আরব ও হুতি বিদ্রোহীদের মধ্যে একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। কিন্তু গত জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের নতুন করে যুদ্ধ শুরু হলে সেই চুক্তি পুরোপুরি ভেস্তে যায়। ইয়েমেনের সানা বিমানবন্দর থেকে হুতিদের প্রতিনিধিদের নিয়ে তেহরানগামী ইরানের একটি উড়োজাহাজ উড্ডয়নের চেষ্টার সময় সৌদি বাহিনী গুলি চালিয়েছে—হুতিরা এমন অভিযোগ তোলার পরই মূলত এই অঞ্চলে নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।

টানা তৃতীয় দিনের মতো ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদ লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে। সৌদি জোট ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিহত করার কথা জানালেও সাম্প্রতিক হামলায় ইতোমধ্যে ১৪ জন নিহত হয়েছেন।। ছবি: সংগৃহীত

ইরান-সমর্থিত হুতিরা এই অঞ্চলে তেহরানের অন্যতম প্রধান ও সুসজ্জিত মিত্র সামরিক শক্তি। বর্তমান যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই বলেন, ‘আরব উপদ্বীপের এই উত্তেজনা বৃদ্ধি নিয়ে তেহরান গভীরভাবে চিন্তিত।’ এই লড়াইয়ের ফলে শেষ পর্যন্ত শুধু ‘ইসরায়েল সরকারই লাভবান হবে’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা প্রশমনে গত রোববার রাতে সৌদি আরব ও ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টেলিফোনে দীর্ঘ আলাপ করেছেন বলে জানা গেছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাজনৈতিক সমাধান উপেক্ষা করে শুধু সামরিক পথে হাঁটার ব্যাপারে রিয়াদকে সতর্ক করেছেন। একই সঙ্গে রিয়াদ ও হুতিদের মধ্যে রাজনৈতিক সংলাপ শুরু করতে তেহরান সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলেও তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।

উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে ইয়েমেন সরকারের পক্ষে সৌদি আরব সরাসরি দেশটির গৃহযুদ্ধে হস্তক্ষেপ করার পর থেকেই মূলত হুতিদের সঙ্গে সৌদির এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা হয়।