মীর মঈন হোসেন মুসা, লোকসমাজ : যশোরে সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে জেলার বিভিন্ন সড়কে ৭১টি দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৬৭ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ৭১ জন। পরিসংখ্যান বলছে, দুর্ঘটনার বড় অংশেই জড়িত মোটরসাইকেল। ফলে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক আইন বাস্তবায়ন এবং চালকদের সচেতনতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) যশোর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে জেলায় মোট ৭১টি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে। এর মধ্যে জানুয়ারিতে নিহত হন ১৫ জন, ফেব্রুয়ারিতে ৭ জন, মার্চে ১৪ জন, এপ্রিলে ১০ জন, মে মাসে ১৪ জন এবং জুনে ৭ জন। একই সময়ে আহত হয়েছেন ৭১ জন।

চলতি বছরের সবচেয়ে ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে গত ২৩ মে যশোর-খুলনা মহাসড়কের চাউলিয়া তেল পাম্প এলাকায়। খুলনা থেকে যশোরগামী একটি দ্রুতগতির কাভার্ডভ্যান বিপরীত দিক থেকে আসা একটি ইজিবাইক ও ব্যাটারিচালিত ভ্যানকে চাপা দিলে ঘটনাস্থলেই চারজন নিহত হন। আহত হন আরও দুইজন।

নিহতরা হলেন সদর উপজেলার ঘুনি পূর্বপাড়ার ইজিবাইক চালক মোহাম্মদ আইয়ুব আলী, ঘোড়াগাছা সাহাপাড়া গ্রামের বৃষ্টি সাহা, তার চার বছর বয়সী সন্তান সৌভিক সাহা এবং চাউলিয়া গ্রামের ভ্যানচালক আনোয়ার আলী।

সাম্প্রতিক সময়ে যশোরে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে। প্রায় প্রতিদিনই জেলার কোথাওযশোরে সড়ক নিরাপত্তা না কোথাও মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় হতাহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে।

সর্বশেষ গত ১১ জুলাই রাতে ঝিকরগাছা উপজেলার নোয়ালি বাজার এলাকায় হেলমেট ছাড়া মোটরসাইকেলে চলার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে দুর্ঘটনায় মারুফ নামে এক যুবক নিহত এবং লাবিব নামে আরেক যুবক গুরুতর আহত হন।

এর আগে ৩১ মে রাতে মনিরামপুর উপজেলার রাজগঞ্জ-তালতলা সড়কে একটি মোটরসাইকেলকে ওভারটেক করতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নিহত হন রাকিব ও মেহেদী হাসান নামে দুই যুবক।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অতিরিক্ত গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, হেলমেট ব্যবহার না করা এবং ট্রাফিক আইন অমান্য করাই মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হয়ে উঠছে।

বিআরটিএ কর্মকর্তাদের মতে, বেপরোয়া মোটরসাইকেল চালনার পাশাপাশি মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহনের চলাচলও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। যশোরের বিভিন্ন মহাসড়কে এখনও ইজিবাইক, নসিমন, করিমন ও ব্যাটারিচালিত ভ্যান চলাচল করতে দেখা যায়। ধীরগতির এসব যান দ্রুতগতির পরিবহনের সঙ্গে একই সড়কে চলাচল করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।

এ ছাড়া অনেক ক্ষেত্রে চালকদের অসচেতনতা, সড়ক নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা, রাতের বেলায় ঝুঁকিপূর্ণ ড্রাইভিং এবং যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটিও দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে।

নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে ট্রাফিক আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, হেলমেট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা, মহাসড়কে নিষিদ্ধ যান চলাচল বন্ধ এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিআরটিএ যশোরের মোটরযান পরিদর্শক তারিক যশোরে সড়ক নিরাপত্তাহাসান বলেন, বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও সরেজমিন অনুসন্ধানের মাধ্যমে দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান সংগ্রহ করা হয়। দুর্ঘটনা কমাতে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আইন প্রয়োগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

যশোরে সড়ক দুর্ঘটনার সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে, দুর্ঘটনা এখন বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি জননিরাপত্তার বড় সংকটে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা উদ্বেগজনক। আইন প্রয়োগ, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং মহাসড়কে নিষিদ্ধ যান চলাচল বন্ধে কার্যকর উদ্যোগ না নিলে আগামী মাসগুলোতে প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।