যশোর পাসপোর্ট অফিসে হয়রানির অভিযোগ, ‘সমাধান’ দিচ্ছে দালাল চক্র

0
যশোর পাসপোর্ট অফিসে হয়রানি
ফাইল ফটো-লোকসমাজ

আকরামুজ্জামান, লোকসমাজ : বিদেশে চাকরির সুযোগ প্রায় চূড়ান্ত। হাতে চাকরির অফার লেটারও রয়েছে। বাকি শুধু একটি গুরুত্বপূর্ণ নথি, পাসপোর্ট। সেই আশায় কয়েক সপ্তাহ আগে অনলাইনে আবেদন করেন যশোরের অভয়নগর উপজেলার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম। নির্ধারিত ফি পরিশোধ করে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়েই তিনি হাজির হন যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে। কিন্তু সহজভাবে কাজ সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন।

পাসপোর্ট অফিসের পরামর্শ কেন্দ্রে কাগজপত্র যাচাইয়ের সময় সাইফুলকে জানানো হয়, তার জাতীয় পরিচয়পত্রে (এনআইডি) উল্লেখিত পেশা এবং বর্তমান পেশার মধ্যে অমিল রয়েছে। এ কারণে আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে তাকে জানানো হয় এবং সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন পরামর্শ দেওয়া হয়। সাইফুলের অভিযোগ, কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষার পর অফিসের বাইরে অবস্থান করা কামাল হোসেন নামের এক ব্যক্তি তার সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ওই ব্যক্তি তাকে জানান, “সমস্যা সমাধান করতে বেশি চিন্তা করতে হবে না, কিছু খরচ করলে সব ঠিক হয়ে যাবে।” সাইফুলের দাবি, অতিরিক্ত অর্থ প্রদানের পরই তার আবেদন প্রক্রিয়ায় আর কোনো বাধা আসেনি।

তার এই অভিজ্ঞতা একক কোনো ঘটনা নয়। যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে সেবা নিতে আসা একাধিক আবেদনকারীর সঙ্গে কথা বলে একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তাদের অভিযোগ, পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা তুলে নেওয়ার পর পাসপোর্ট পাওয়া সহজ হয়েছে, এমন ধারণা থাকলেও বাস্তবে এনআইডি যাচাই, পেশাগত তথ্যের অসঙ্গতি, নাগরিক সনদ, বিদ্যুৎ বিলসহ বিভিন্ন কাগজপত্র দেখিয়ে আবেদনকারীদের হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে।

রোববার সরেজমিনে যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকেই আবেদনকারীদের ব্যস্ততা। কেউ নতুন পাসপোর্টের আবেদন নিয়ে এসেছেন, কেউ আবার সংশোধন বা নবায়নের জন্য অপেক্ষা করছেন। অফিসের বিভিন্ন ধাপে রয়েছে ব্যাপক চাপ ও ভিড়।

মণিরামপুর উপজেলার বাসিন্দা নাজমুল হক জানান, তার এনআইডিতে পেশা হিসেবে ‘ছাত্র’ লেখা রয়েছে, অথচ তিনি বর্তমানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন। এতে আবেদন প্রক্রিয়ায় সমস্যা দেখা দেওয়ার কথা তাকে জানানো হয়। তিনি বলেন, “এনআইডি করার সময় আমি ছাত্র ছিলাম। এখন চাকরি করি, এটা তো স্বাভাবিক পরিবর্তন। কিন্তু সেটাই সমস্যা হিসেবে দেখানো হচ্ছে।”

যশোর পাসপোর্ট অফিসে হয়রানি

নাজমুলের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পর তাকে জানানো হয় বিষয়টি সমাধানযোগ্য। পরে অফিসের বাইরে থাকা এক ব্যক্তি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন। তার মাধ্যমেই অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে কাজটি সম্পন্ন করার প্রক্রিয়ায় আছেন বলে জানান তিনি।

একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান গৃহবধূ রেহানা আক্তার রিমি। তিনি বলেন, স্বামীর নামে বিদ্যুৎ সংযোগ থাকলেও নিজ নামে পাসপোর্ট আবেদন করায় তাকে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়। “বিদ্যুৎ বিল আমার নামে না থাকায় জটিলতা তৈরি করা হয়। অথচ আমি ওই বাড়িতেই থাকি,” বলেন তিনি।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই একজন দালাল দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন এবং অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে সমস্যা মেটানোর কথা বলেন।

শুধু বিদ্যুৎ বিল নয়, নাগরিক সনদ ও বৈবাহিক দলিল অর্থাৎ বিয়ের কাবিন নিয়েও আবেদনকারীদের একই ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। তাদের দাবি, সামান্য তথ্যগত অসঙ্গতি বা ঠিকানাগত বিভ্রান্তিকে কেন্দ্র করে আবেদন প্রক্রিয়া অপ্রয়োজনীয়ভাবে দীর্ঘ করা হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পাসপোর্ট অফিসকে ঘিরে একটি দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জনের একটি নেটওয়ার্ক আবেদনকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলে দাবি করা হয়। প্রথমে সম্ভাব্য জটিলতার ভয় দেখিয়ে পরে দ্রুত সমাধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়। তবে এসব দালাল এখন আর পাসপোর্ট অফিসের আশপাশে বেশি ঘোরাঘুরি করে না।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, “অনেক সময় অফিসে ঢোকার আগেই দালালরা নতুন আবেদনকারীকে চিহ্নিত করে ফেলে। এরপর তারা নানাভাবে প্রভাবিত করে। অনেকেই শেষ পর্যন্ত তাদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে।”

তিনি জানান, এসব ক্ষেত্রে দালালরা ১,৫০০ থেকে ২,০০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ নেয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে এর চেয়েও বেশি দাবি করা হয়।

এ বিষয়ে যশোর আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের উপপরিচালক মহের উদ্দিন শেখ বলেন, ভারতীয় ভিসা জটিলতার কারণে বর্তমানে সেবাগ্রহীতার সংখ্যা তুলনামূলক কম। প্রতিদিন গড়ে ১২০ থেকে ১৫০টি আবেদন জমা পড়ছে।

তিনি দাবি করেন, অফিসে শৃঙ্খলাভিত্তিক সেবা প্রদান করা হচ্ছে এবং দালাল চক্রের দৌরাত্ম্য বা হয়রানির বিষয়ে তার কাছে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ নেই। তবে কেউ লিখিত অভিযোগ দিলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ডিজিটাল প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক হলে পাসপোর্ট সেবা থেকে হয়রানি কমবে এবং দালালদের প্রভাবও নিয়ন্ত্রণে আসবে।