আশুরা : মানবতার অমর শিক্ষা

‘আশুরা’ শব্দের অর্থ দশম। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। বিভিন্ন ধর্মীয় বর্ণনায় বলা হয়েছে, এ দিন মহান আল্লাহ তাঁর বহু নবীকে কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তবে আশুরার সঙ্গে যে ঘটনার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো কারবালার বেদনাবিধুর ইতিহাস।

0

মাহমুদ কাদির
মহররম মাস নতুন হিজরি বছরের সূচনা হলেও এ মাসে উৎসবের চেয়ে বেশি অনুভূত হয় ত্যাগ ও শোকের সুর। আর এই মাসের দশম দিন—পবিত্র আশুরা—ইসলামের ইতিহাসে এমন এক দিন, যা যুগে যুগে মানুষকে সত্য, ন্যায় এবং আত্মত্যাগের প্রেরণা জুগিয়ে আসছে।
‘আশুরা’ শব্দের অর্থ দশম। ইসলামের ইতিহাসে এ দিনের গুরুত্ব বহুমাত্রিক। বিভিন্ন ধর্মীয় বর্ণনায় বলা হয়েছে, এ দিন মহান আল্লাহ তাঁর বহু নবীকে কঠিন বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন। তবে আশুরার সঙ্গে যে ঘটনার নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, তা হলো কারবালার বেদনাবিধুর ইতিহাস।
আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে, ৬১ হিজরির ১০ মহররম, বর্তমান ইরাকের কারবালা প্রান্তরে সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম মর্মস্পর্শী ঘটনা। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন ইবনে আলী অন্যায় ও স্বৈরশাসনের কাছে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানান। সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে তাঁর অবস্থান ছিল আপসহীন।
অসংখ্য সৈন্যের বিপরীতে অতি অল্পসংখ্যক সঙ্গী নিয়ে তিনি দাঁড়িয়েছিলেন একটি আদর্শের পক্ষে। তাঁকে ভয় দেখানো হয়েছিল, ক্ষমতার লোভ দেখানো হয়েছিল, কিন্তু তিনি নতি স্বীকার করেননি। কারণ তাঁর কাছে জীবন থেকে বড় ছিল ন্যায়, ক্ষমতা থেকে বড় ছিল সত্য।
কারবালার প্রান্তরে শুধু একজন নেতার মৃত্যু হয়নি; শহীদ হয়েছিল একটি আদর্শের জন্য আত্মোৎসর্গের বিরল দৃষ্টান্ত। পানির অভাবে তৃষ্ণার্ত শিশু, পরিবারের সদস্যদের একে একে শাহাদাত এবং অবশেষে ইমাম হুসাইনের আত্মদান, সমগ্র ঘটনাই মানব ইতিহাসের অন্যতম বেদনাময় অধ্যায়।
তবে কারবালার ইতিহাস কেবল শোকের ইতিহাস নয়। এটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ইতিহাস, ন্যায়ের জন্য আত্মত্যাগের ইতিহাস এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার ইতিহাস। কারবালা আমাদের শেখায়, সত্যের পথে চলতে গেলে কখনো কখনো সংখ্যায় কম হলেও আদর্শে দৃঢ় থাকতে হয়।
পবিত্র আশুরা মুসলিমদের জন্য ইবাদত, আত্মশুদ্ধি ও আত্মসমালোচনারও একটি উপলক্ষ। অনেক মুসলমান এ দিন রোজা পালন করেন, দোয়া, জিকির এবং দান-সদকার মাধ্যমে নিজেদের আত্মিক উন্নয়নের চেষ্টা করেন। ধর্মীয় শিক্ষায় বলা হয়েছে, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের গুনাহ মাফের উসিলা হতে পারে।
আজকের পৃথিবী যুদ্ধ, সহিংসতা, বৈষম্য এবং ক্ষমতার অপব্যবহারে বারবার ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে। এমন বাস্তবতায় কারবালার শিক্ষা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। যখন সত্য বলার মানুষ কমে যায়, যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দুর্বল হয়ে পড়ে, তখন কারবালা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—অত্যাচারের কাছে নত হওয়া নয়, বরং সত্যের জন্য দাঁড়িয়ে যাওয়াই মানুষের প্রকৃত মর্যাদা।
প্রতিবছর আশুরা ফিরে আসে, আর সঙ্গে করে নিয়ে আসে আত্মত্যাগের সেই অমর বার্তা। কারবালার রক্তাক্ত প্রান্তর আজও যেন বিশ্বমানবতার কানে কানে বলে, ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু সত্য ও ন্যায়ের জন্য দেওয়া ত্যাগ চিরকাল অমর।
পবিত্র আশুরা তাই শুধু একটি দিন নয়; এটি মানবতার বিবেক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক এবং সত্যের পথে অবিচল থাকার এক অনন্ত প্রেরণার নাম।