নাবাতিয়া ঘিরে ফেলতে চায় ইসরায়েল, তীব্র হচ্ছে দক্ষিণ লেবাননের যুদ্ধ

0

আন্তর্জাতিক ডেস্ক, লোকসমাজ : দক্ষিণ লেবাননের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর নাবাতিয়াকে ঘিরে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে ইসরায়েলি বাহিনী। শহরটির উপকণ্ঠে পৌঁছে গেছে সেনারা এবং পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে এটি ২০০৬ সালের যুদ্ধের পর লেবাননে ইসরায়েলের সবচেয়ে বড় সামরিক অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

নাবাতিয়া দক্ষিণ লেবাননের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। শিয়া অধ্যুষিত এই শহরটি দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। ফলে শহরটির পতন কেবল সামরিক নয়, রাজনৈতিক ও প্রতীকী দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

আল জাজিরার প্রতিবেদক ওবাইদা হিত্তো দক্ষিণাঞ্চলীয় টাইর শহর থেকে জানিয়েছেন, ইসরায়েল নাবাতিয়াকে ঘিরে ফেলার লক্ষ্যে বিমান হামলা জোরদার করেছে এবং হিজবুল্লাহর দ্বিতীয় ও তৃতীয় প্রতিরক্ষা বলয় ভেঙে পশ্চিম বেকা উপত্যকাকে দক্ষিণাঞ্চল থেকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করছে।

এদিকে লেবাননের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, নাবাতিয়ার কাছে একটি সামরিক যানবাহনে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় দুই সেনা গুরুতর আহত হয়েছেন।

শনিবার রাতে লেবাননের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ জানায়, দক্ষিণাঞ্চলের জেবশিত গ্রামে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত একজন প্যারামেডিক নিহত এবং চারজন আহত হয়েছেন। হামলায় লেবানিজ রিলিফ হাসপাতালের কিছু অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হলেও চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্সকর্মীরা নিরাপদ রয়েছেন।

অন্যদিকে ইসরায়েলি বিমান হামলা ও গোলাবর্ষণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছে ঐতিহাসিক বউফোর্ট দুর্গের আশপাশের এলাকা। ইসরায়েল সীমান্ত থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দুর্গটি ২০০০ সালে লেবানন থেকে সেনা প্রত্যাহারের আগে প্রায় ১৮ বছর ইসরায়েলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে ছিল।

পাল্টা হামলায় হিজবুল্লাহ : ইসরায়েলি অভিযানের জবাবে শনিবার উত্তর ইসরায়েলের কিরিয়াত শমোনা শহরে রকেট হামলার দাবি করেছে হিজবুল্লাহ। সংগঠনটি জানিয়েছে, দক্ষিণ লেবাননের ঘানদুরিয়েহ এলাকায় ইসরায়েলি সেনাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে তাদের পিছু হটতে বাধ্য করা হয়েছে।

পৃথক বিবৃতিতে হিজবুল্লাহ আরও দাবি করেছে, ইয়োহমোর আল-শাকিফ এলাকায় আবাবিল ড্রোন ব্যবহার করে একটি ইসরায়েলি সামরিক যান ধ্বংস করা হয়েছে। এছাড়া উত্তর ইসরায়েলের ইয়ারা ব্যারাক, নাহারিয়া শহরের সামরিক অবকাঠামো এবং নাকুরা এলাকার একটি সামরিক কমান্ড কেন্দ্রেও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে।

নতুন করে বাস্তুচ্যুতির আশঙ্কা : সামরিক অভিযান সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে দক্ষিণ লেবাননের অন্তত ১০টি গ্রামের বাসিন্দাদের অবিলম্বে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর আরবি ভাষার মুখপাত্র আভিচাই আদরাই সতর্ক করে বলেছেন, যারা এলাকায় অবস্থান করবেন তারা প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।

আল জাজিরার প্রতিবেদক জানান, যুদ্ধের কারণে ইতোমধ্যে দেশটির ২০ শতাংশের বেশি মানুষ—প্রায় ১২ লাখ নাগরিক—বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। অনেক পরিবার আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে, আবার কেউ কেউ পার্ক, খোলা স্থান কিংবা নিজস্ব যানবাহনেই দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু পরিবার ২০২৩ সাল থেকেই ধারাবাহিকভাবে এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় বাস্তুচ্যুত হয়ে আসছে।

বিপজ্জনক ও নজিরবিহীন’ উত্তেজনা : লেবাননের প্রধানমন্ত্রী নওয়াফ সালাম দক্ষিণাঞ্চলে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতাকে “বিপজ্জনক ও নজিরবিহীন” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়ে বলেন, “পুড়িয়ে দেওয়া ভূমির নীতি” ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে না।

টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে তিনি ইসরায়েলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনারও পক্ষে অবস্থান নেন এবং বলেন, লেবাননের জন্য এটি সবচেয়ে কম ক্ষতির পথ।

শনিবার প্রেসিডেন্ট জোসেফ আউনের সঙ্গে বৈঠকে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও চলমান আলোচনার বিষয়ে আলোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী সালাম। বৈঠকে যুদ্ধের অবসান ঘটাতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা জোরদারের বিষয়ে উভয় নেতা একমত হন।

এদিকে প্রেসিডেন্ট আউন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতি মেনে চলার জন্য ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানান।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় আগামী সপ্তাহে ওয়াশিংটনে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে নতুন দফা আলোচনা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চলমান বিমান হামলা, স্থল অভিযান এবং জোরপূর্বক সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ যুদ্ধবিরতির কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

শুক্রবারও দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্র জানিয়েছে।