আরাফাতে অশ্রুসিক্ত প্রার্থনা, তীব্র গরম ও যুদ্ধ উত্তেজনার মধ্যেও হজ্জে লাখো মুসল্লি

এবারের হজ্জ শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং বৈশ্বিক নানা বাস্তবতার মধ্যেও মুসলিম ঐক্যের এক বিশাল প্রতীক হয়ে উঠেছে

0

লোকসমাজ ডেস্ক : বিশ্ব মুসলিমের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ পবিত্র হজ্জকে ঘিরে এবছর একদিকে যেমন দেখা গেছে লাখো মুসল্লির আবেগঘন উপস্থিতি, অন্যদিকে তেমনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে তীব্র তাপদাহ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সৌদি আরবের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে— এবারের হজ্জ শুধু ধর্মীয় আচার নয়, বরং বৈশ্বিক নানা বাস্তবতার মধ্যেও মুসলিম ঐক্যের এক বিশাল প্রতীক হয়ে উঠেছে।

সৌদি আরবের পবিত্র নগরী মক্কা ও আরাফাত ময়দানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় ১৫ লাখের বেশি মুসল্লি হজ্জ পালন করছেন। মঙ্গলবার আরাফাতের ময়দানে হজ্জের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আনুষ্ঠানিকতায় অংশ নিতে লাখো হাজির ঢল নামে। সাদা ইহরামে মোড়ানো মুসল্লিদের অনেককেই দেখা গেছে অশ্রুসিক্ত নয়নে দোয়া ও মোনাজাতে মগ্ন থাকতে।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) জানিয়েছে, এবারের হজ্জ এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা, যুদ্ধের আশঙ্কা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট আন্তর্জাতিক উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তারপরও ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উৎসাহে কোনো ঘাটতি দেখা যায়নি। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ বহু বছরের সঞ্চয় ও অপেক্ষার পর এবারের হজ্জে অংশ নিয়েছেন।

পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফে মুসল্লিদের ঢল
পবিত্র হজ্জে মঙ্গলবার কাবাঘর তাওয়াফে লাখো হাজি- ছবি : এপি

তবে এবারের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের নাম তীব্র গরম। মক্কা অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যাওয়ায় হাজিদের নিরাপত্তায় ব্যাপক ব্যবস্থা নিয়েছে সৌদি সরকার। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মসজিদুল হারাম ও আরাফাত এলাকায় বিশাল আকারের কুলিং ফ্যান, পানির স্প্রে, ঠাণ্ডা পানি বিতরণ, ছায়াযুক্ত বিশ্রামকেন্দ্র ও জরুরি চিকিৎসাসেবা বাড়ানো হয়েছে।

গত বছরের ভয়াবহ তাপদাহে শত শত হাজির মৃত্যুর ঘটনার পর এবার সৌদি কর্তৃপক্ষ বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৫০ হাজারের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী, হাজারো অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসাকেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। একইসঙ্গে হাজিদের দিনের সবচেয়ে গরম সময় বাইরে কম চলাচলের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এবারের হজ্জে প্রযুক্তিনির্ভর নিরাপত্তা ব্যবস্থাও আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হচ্ছে। সৌদি আরব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন নজরদারি, স্মার্ট মনিটরিং সিস্টেম এবং ডিজিটাল হজ্জ কার্ড ব্যবহার করছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে কয়েক লাখ নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়েছে।

এদিকে গাজা যুদ্ধের কারণে ফিলিস্তিনিদের অনেকেই এবার হজ্জ পালনের সুযোগ পাননি বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। যুদ্ধ, সীমান্ত জটিলতা ও চলাচল সীমাবদ্ধতার কারণে বহু গাজাবাসী সৌদি আরবে যেতে পারেননি। বিষয়টি মুসলিম বিশ্বে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

আল জাজিরাসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হজ্জের আধ্যাত্মিক আবহ তুলে ধরে জানিয়েছে, আরাফাতের ময়দান যেন এক বিশাল মানবসমুদ্রে পরিণত হয়েছে। বিভিন্ন ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির মানুষ এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর কাছে ক্ষমা ও শান্তি প্রার্থনা করছেন। অনেক হাজি নিজ দেশের শান্তি, যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষের মুক্তি এবং বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর কল্যাণ কামনা করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সংকট ও বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়েও হজ্জ মুসলিম বিশ্বের ঐক্য, ধৈর্য ও আত্মত্যাগের এক অনন্য প্রতীক হিসেবে আবারও বিশ্ববাসীর সামনে উঠে এসেছে।