জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত

0
জরুরি কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে বাইরে জড়ো হয়েছেন ।। ছবি: সংগৃহীত
জাপানের কুমামোতো প্রশাসনিক অঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও অনেকে আটকে থাকায় প্রাণহানির সংখ্যা আরও বাড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। তাঁদের নিরাপদে উদ্ধার করতে দমকল বাহিনী, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সমন্বয়ে রাতভর উদ্ধার অভিযান চালানো হচ্ছে।

কুমামোতোর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ভূমিকম্পটি আঘাত হানে। ঘটনার পর থেকে উদ্ধারকারীরা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে রাতভর অভিযান পরিচালনা করে এখন পর্যন্ত ৯ হাজার ৮৭২ জন বাসিন্দাকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিয়েছেন।

তবে ভূমিকম্পের কারণে গোটা অঞ্চলে বিদ্যুতের সংকট চরম রূপ নিয়েছে; বর্তমানে প্রায় ৩৬ হাজার ৭০০ পরিবার পুরোপুরি বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে।

জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে জানিয়েছে, কিয়ুশু দ্বীপে ভূমিকম্পটি আঘাত হানার পর থেকেই ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। এতে করে চরম ভোগান্তিতে পড়েন সাধারণ যাত্রীরা। জাপানের অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য সার্ভিস হিসেবে পরিচিত বুলেট ট্রেনে থাকা সাতজন যাত্রী এই ভূমিকম্পে আহত হয়েছেন। তাছাড়া, ভূমিকম্পের পর রেললাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ট্রেনগুলো মাঝপথে আটকে পড়ায় বহু যাত্রীকে পুরো রাত ট্রেনের ভেতরেই কাটাতে হয়েছে।

ভূমিকম্পে সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনাস্থলগুলোর একটি হলো কুমামোতোর ‘ইয়ন মল’ নামের একটি বিশালাকার শপিং সেন্টার। স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস আগে থেকেই জানিয়েছিল যে শপিং মলটির ভেতরে বেশ কয়েকজন আটকা পড়েছেন এবং সেখানে একটি বিস্ফোরণের খবর পাওয়া যায়।

জাপানের কুমামোতো শহরের ইয়ন মলের ধসে পড়া অংশ থেকে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন সেনা ও ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা।। ছবি: সংগৃহীত
কুমামোতো অঞ্চলের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকিনো সোনোডা জানিয়েছেন, ইয়ন মল থেকে এখন পর্যন্ত আটজনকে উদ্ধার করা হয়েছে। এদের মধ্যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার হয়। উদ্ধার হওয়া বাকিদের মধ্যে চারজন মাঝারি ধরনের আহত, একজন সামান্য আহত এবং একজন কার্ডিওপালমোনারি অ্যারেস্ট (হৃদযন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ) অবস্থায় রয়েছেন।

অন্যান্য শিল্প কারখানাতেও বড় ধরণের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে। ইয়াতসুশিরো শহরের ‘নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ’ প্লান্টে একটি সুবিশাল চিমনি ধসে পড়ার পর সেখান থেকে দুইজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এই কারখানার আরও নয়জন কর্মী এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। এছাড়া পুরো অঞ্চলে অন্তত ৪৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং সপ্তদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক কুমামোতো দুর্গের বাইরের দেওয়াল ধসে পড়ার তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে কুমামোতোতে বসবাসকারী স্কটিশ নাগরিক শন উইলসন জানান, গত ১০ বছরে সেখানে এটি তাঁর দ্বিতীয় ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা। তিনি বলেন, “১০ বছর আগে এই এলাকায় যেমন ক্ষতি হয়েছিল, সেই তুলনায় এবার ততটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।” তবে তাঁর অনুভূতি ব্যক্ত করে তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতি এতই বিভ্রান্তিকর ছিল যে পায়ের নিচের সবকিছু নড়তে থাকে, মনে হয় মাটি যেন সমুদ্রে পরিণত হয়েছে।” অপর এক প্রত্যক্ষদর্শী জানান, ভূমিকম্পের সময় তাঁর ঘরের টেলিভিশনটি তাঁর ওপর এসে পড়ে।

পরিস্থিতি মোকাবেলায় বুধবার সকালে জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি একটি বার্তা দেন। তিনি নিহতদের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিতদের অব্যাহত প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানান। উদ্ধার তৎপরতাকে ‘সময়ের সাথে এক দৌড়’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এখনও অনেক মানুষ উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। এ কাজে সহায়তার জন্য তিনি ইতিমধ্যে ৩ হাজার ৫০০-এর বেশি সেনাসদস্য ও উদ্ধারকারী কর্মী মোতায়েন করেছেন। একই সাথে তিনি অত্যন্ত গরম আবহাওয়া বহাল থাকায় উদ্ধারকর্মী ও সাধারণ বাসিন্দাদের হিটস্ট্রোক থেকে বাঁচতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

এদিকে ভূ-বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, মঙ্গলবারের ভূমিকম্পটি ২০১৬ সালের প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের ধারাবাহিকতায় ঘটেছে। টোকিও ইউনিভার্সিটির আর্থকোয়েক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাকাই শিনিকি এবং কিয়োডো নিউজকে দেওয়া সিসমোলজির অধ্যাপক শিনজি তোদার মতে, ২০১৬ সালের এপ্রিলে ৬.৫ এবং ৭.৩ মাত্রার জোড়া ভূমিকম্পগুলো ভূ-গর্ভস্থ ‘হিনাগু ফল্ট জোনে’ যে প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করেছিল, তারই প্রভাবে এবার সেই একই ফাটল থেকে আবার কম্পন ঘটেছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিকম্পটির প্রাথমিক মাত্রা ৭.১ রেকর্ড করলেও ইউএসজিএস তা ৬.৮ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আবহাওয়া দপ্তরের কর্মকর্তা শিনজি কিয়োমটো সবাইকে আগামী দিনে অতিরিক্ত শক্তিশালী আফটারশকের বিষয়ে কঠোর সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।