দীর্ঘদিনের দুর্বল অবকাঠামোই বিদ্যুৎ সংকটের বড় কারণ

0
দীর্ঘদিনের দুর্বল অবকাঠামোই বিদ্যুৎ সংকটের বড় কারণ

বিশেষ প্রতিনিধি: দেশে বিদ্যুৎ সংকট রয়েছে—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে এই সংকটের দায় কেবল সরকারের কিংবা মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপিয়ে দিলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র আড়ালে থেকে যাবে। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার দীর্ঘদিনের দুর্বলতা, পুরোনো অবকাঠামো, দীর্ঘ ফিডার, যন্ত্রপাতির সীমাবদ্ধতা, জনবল ঘাটতি এবং জ্বালানি সরবরাহের নানা জটিলতা মিলেই বর্তমান সংকটের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা ও বিদ্যুৎমন্ত্রীকে ঘিরে কিছু তীর্যক মন্তব্য জনপরিসরে বিতর্ক তৈরি করেছে। বিদ্যুৎ সংকট নিয়ে সংসদে আলোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। জনগণের ভোগান্তি, লোডশেডিংয়ের কারণ এবং সংকট মোকাবিলার সরকারি উদ্যোগ নিয়ে জনপ্রতিনিধিরা প্রশ্ন তুলবেন—এটাই সংসদীয় গণতন্ত্রের স্বাভাবিক চর্চা। তবে একই সঙ্গে সংকটের প্রকৃত কারণ চিহ্নিত করে গঠনমূলক আলোচনা করাও জরুরি।

বিদ্যুৎমন্ত্রী একটি মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক প্রধান হলেও বিদ্যুৎ খাতের পুরো অবকাঠামো তাঁর একক নিয়ন্ত্রণে তৈরি হয়নি। তিনি একটি বৃহত্তর সরকারি ব্যবস্থার অংশ। বিদ্যুৎ উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণের সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভাগ, সংশ্লিষ্ট সংস্থা, প্রকৌশলী, কারিগরি জনবল এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অবকাঠামো জড়িত। ফলে দীর্ঘদিনের একটি কাঠামোগত সমস্যা রাতারাতি পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।

বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্প-বাণিজ্যের পরিধি গত কয়েক দশকে ব্যাপকভাবে বেড়েছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু চাহিদা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গতি রেখে দেশের সঞ্চালন ও বিতরণ অবকাঠামো সর্বত্র একই গতিতে আধুনিকায়ন করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় এর প্রভাব স্পষ্ট।

পল্লী বিদ্যুৎ এলাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অন্যতম কারণ দীর্ঘ ওভারহেড বিদ্যুৎলাইন। একটি ফিডারকে অনেক দূর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হয়। ফলে লাইনের কোনো একটি স্থানে ত্রুটি দেখা দিলে সেটি শনাক্ত ও মেরামত করতে সময় লাগে। স্থানীয় একটি ত্রুটির কারণে কখনও কখনও বড় এলাকার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে।

গ্রামীণ দীর্ঘ বিদ্যুৎলাইনে বিভ্রাটের পেছনে পরিবেশগত প্রভাবও গুরুত্বপূর্ণ। ঝড়-বৃষ্টিতে গাছের ডালপালা লাইনের ওপর পড়ে শর্ট সার্কিট হতে পারে। বজ্রপাত, অতিরিক্ত আর্দ্রতা কিংবা বৈরী আবহাওয়ার কারণে ইনসুলেটর, ট্রান্সফরমার ও অন্যান্য সরঞ্জামেও ত্রুটি দেখা দিতে পারে। গ্রামাঞ্চলে অনেক বিদ্যুৎলাইন এখনও খোলা পরিবেশের মধ্য দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে যাওয়ায় এ ধরনের ঝুঁকি বেশি।

দীর্ঘ ফিডারের আরেকটি সমস্যা হলো ভোল্টেজ ড্রপ। উপকেন্দ্র থেকে ফিডারের শেষ প্রান্তের দূরত্ব যত বাড়ে, লাইনের শেষ দিকে ভোল্টেজ কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তত বাড়ে। ফলে নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে লোড কমানো বা লাইন ট্রিপ করার প্রয়োজন হতে পারে। শিল্প ও কৃষিভিত্তিক এলাকায় এর প্রভাব আরও বেশি অনুভূত হতে পারে।

ত্রুটি শনাক্তকরণও বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো দীর্ঘ ফিডারের কোথাও গাছ পড়ে গেলে, ইনসুলেটর ক্ষতিগ্রস্ত হলে কিংবা অন্য কোনো ত্রুটি দেখা দিলে পুরো লাইন পরীক্ষা করে সমস্যার জায়গাটি শনাক্ত করতে হয়। এরপর গাছের ডালপালা সরানো, ইনসুলেটর পরিবর্তন কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত যন্ত্রপাতি মেরামত করে লাইন পুনরায় চালু করতে হয়। অর্থাৎ, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর সব ক্ষেত্রে শুধু একটি সুইচ টিপে সরবরাহ স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়।

আধুনিক অটোমেটিক প্রোটেকশন, রিক্লোজার ও ফল্ট-লোকেটিং প্রযুক্তির ব্যবহার এই সমস্যা অনেকটাই কমাতে পারে। কোনো নির্দিষ্ট অংশে ত্রুটি দেখা দিলে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থায় ত্রুটিপূর্ণ অংশ বিচ্ছিন্ন করে অন্য অংশে দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু রাখা সম্ভব। কিন্তু এ ধরনের আধুনিক প্রযুক্তি পুরো বিতরণ নেটওয়ার্কে সমানভাবে বিস্তৃত করা এখনও বড় চ্যালেঞ্জ।

এর সঙ্গে রয়েছে ওভারলোডের সমস্যা। গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুতের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। কোনো ট্রান্সফরমারের ওপর তার ধারণক্ষমতার তুলনায় বেশি চাপ পড়লে অতিরিক্ত তাপ সৃষ্টি হতে পারে এবং সুরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় হয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দিতে পারে। প্রত্যন্ত এলাকায় ট্রান্সফরমার বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো যন্ত্রপাতি নষ্ট হলে বিকল্প সরঞ্জাম দ্রুত পৌঁছে দেওয়াও অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে।

ফলে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য শুধু উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়। পর্যাপ্ত ট্রান্সফরমার, ইনসুলেটর, ফিউজসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের মজুত এবং দ্রুত প্রতিস্থাপনের সক্ষমতাও নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ জনবল ও জরুরি মেরামত ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

অবশ্যই জাতীয় পর্যায়ের উৎপাদন ও জ্বালানি পরিস্থিতিও বিদ্যুৎ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জ্বালানি সরবরাহে সংকট বা উৎপাদন ঘাটতি তৈরি হলে পুরো বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি হয়। একই সময়ে রাজধানী, শিল্পাঞ্চল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার প্রয়োজন থাকায় বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে হয়। এর প্রভাব পল্লী এলাকার গ্রাহকদের ওপরও পড়তে পারে।

এ কারণেই বিদ্যুৎ সংকটকে শুধু একজন মন্ত্রী বা একটি মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত কারণ ধরা পড়বে না। বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘদিনের সব অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার মতো পর্যাপ্ত সময় পায়নি—এটিও বাস্তবতা। তাই বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের দিকে নজর দিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়নকে সমান গুরুত্ব দেওয়া। নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, যদি উৎপাদিত বিদ্যুৎ নির্ভরযোগ্যভাবে গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার মতো শক্তিশালী নেটওয়ার্ক না থাকে।

দীর্ঘ ফিডারের সমস্যা কমাতে নতুন সাবস্টেশন ও উপকেন্দ্র নির্মাণ করা প্রয়োজন। আধুনিক স্মার্ট গ্রিড, অটোমেটিক রিক্লোজার ও ফল্ট-লোকেটর স্থাপন করা গেলে ত্রুটির স্থান দ্রুত শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা ম্যানুয়াল পেট্রোলিংয়ের প্রয়োজন কমবে এবং দ্রুত বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনঃস্থাপন করা যাবে।

একই সঙ্গে ফিডারের দৈর্ঘ্য ও গ্রাহকসংখ্যা বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় জনবল বাড়াতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে জরুরি যন্ত্রপাতির আঞ্চলিক মজুত গড়ে তোলা যেতে পারে, যাতে কোনো ট্রান্সফরমার বা গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম নষ্ট হলে দূরবর্তী কেন্দ্র থেকে তা আনার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে না হয়।

জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর বিষয়টিও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় রাখতে হবে। সৌরবিদ্যুৎসহ বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে পারলে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানোর পাশাপাশি জ্বালানি আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকিও কমানো সম্ভব হতে পারে।

বিদ্যুৎ সংকট তাই রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় হওয়ার পাশাপাশি একটি জাতীয় অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ হিসেবেও দেখতে হবে। সরকারের দায় অবশ্যই আছে; জনগণের কাছে জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা, উৎপাদন ও জ্বালানি পরিস্থিতি, সঞ্চালন সীমাবদ্ধতা এবং বিতরণ ব্যবস্থার ত্রুটিগুলোও বিবেচনায় নিতে হবে।

সমস্যার প্রকৃত কারণ চিহ্নিত না করে শুধু দায় চাপানোর রাজনীতি করলে সাময়িকভাবে বিতর্ক জমতে পারে, কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন উৎপাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি আধুনিক, নির্ভরযোগ্য ও দ্রুত প্রতিক্রিয়াশীল বিতরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আর সেই কাজটি করতে হলে সরকার, বিদ্যুৎ খাতের সংশ্লিষ্ট সংস্থা, ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তা এবং জনগণ—সব পক্ষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

বিদ্যুৎ সংকটের স্থায়ী সমাধান তাই কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের হাতে নেই। দীর্ঘদিনের দুর্বল অবকাঠামোকে শক্তিশালী করে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ—তিন ক্ষেত্রেই সমন্বিত সংস্কারই পারে দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে আরও নির্ভরযোগ্য করে তুলতে।