চট্টগ্রাম-পার্বত্য অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি, ঘরে ফিরছেন মানুষ: প্রতিমন্ত্রী অমিত

আশ্রয়কেন্দ্রে নেমে এসেছে ২,২৯৪ জন; ত্রাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ও কৃষি প্রণোদনার প্রস্তুতি

0
চট্টগ্রাম-পার্বত্য অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি
বুধবার সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখেনবিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত

স্টাফ রিপোর্টার, লোকসমাজ : চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষ ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে শুরু করেছেন। বন্যাকবলিত এলাকায় উদ্ধার, ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রমের সমন্বয়ক এবং বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এ তথ্য জানিয়েছেন।

বুধবার (১৫ জুলাই) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, বন্যায় চট্টগ্রাম ও পার্বত্য অঞ্চলের পাঁচ জেলায় প্রায় ১০ লাখ ৮৫ হাজার ৮৬০ জন মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্যোগের শুরুতে প্রায় ৪৫ হাজার ৭৫০ জনকে উদ্ধার করে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া হয়েছিল। তবে পানি নেমে যাওয়ায় অধিকাংশ মানুষ নিজ নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে রয়েছেন মাত্র ২ হাজার ২৯৪ জন।

প্রতিমন্ত্রী জানান, ১১ জুলাই থেকে তিনি চট্টগ্রাম, রাঙামাটি, কক্সবাজার ও বান্দরবানের বন্যাকবলিত এলাকা পরিদর্শন করেন। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক করে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। যেসব মধ্যবিত্ত পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে না গিয়ে পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে, তাদের ঘরেও খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।

তিনি বলেন, দুর্গম পার্বত্য এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, বিমান বাহিনী, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, রাজনৈতিক দল, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীরাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

ত্রাণ কার্যক্রম সম্পর্কে প্রতিমন্ত্রী জানান, চট্টগ্রাম জেলায় সশস্ত্র বাহিনী, পেট্রোবাংলা ও জেলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে ১৫ হাজার ২২৯ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ৩ হাজার এবং জ্বালানি বিভাগ ৪ হাজার প্যাকেট খাদ্যসামগ্রী বিতরণ করেছে। এছাড়া ব্র্যাক, ইপসা ও জাগরণী ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে আরও ১১ হাজার ৫০০ প্যাকেট শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

বর্তমানে খাগড়াছড়ির সব আশ্রয়কেন্দ্র খালি হয়ে গেছে। চট্টগ্রামে ১ হাজার ৪৯৫ জন, কক্সবাজারে ৩১০ জন, রাঙামাটিতে ২৯৩ জন এবং বান্দরবানে ২০০ জন আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।

ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, চট্টগ্রামের বাঁশখালী, সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী ও সন্দ্বীপ; কক্সবাজারের রামু, পেকুয়া, চকরিয়া ও মাতামুহুরী; রাঙামাটির বাঘাইছড়ি, বরকল, বিলাইছড়ি, জুড়াছড়ি ও কাউখালী; খাগড়াছড়ির দীঘিনালা, মহালছড়ি, পানছড়ি, মাটিরাঙ্গা ও সদর উপজেলা এবং বান্দরবানের কয়েকটি এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

পাহাড়ি ঢল ও নদীভাঙনের কারণে গ্রামীণ সড়ক ও অসংখ্য কাঁচা ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক এলাকায় টিউবওয়েল ডুবে যাওয়ায় সুপেয় পানির সংকট দেখা দিলেও প্রশাসনের উদ্যোগে বিশুদ্ধ পানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট সরবরাহ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। বর্তমানে সড়ক মেরামত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা স্বাভাবিক করার কাজ চলছে।

ত্রাণ বরাদ্দের তথ্য তুলে ধরে প্রতিমন্ত্রী বলেন, পাঁচ জেলায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ১০৬ মেট্রিক টন চাল এবং ১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে ১ হাজার ২০০ মেট্রিক টন চাল ও ৮৫ লাখ টাকা, কক্সবাজারে ২৫৬ মেট্রিক টন চাল ও ২০ দশমিক ৮৫ লাখ টাকা, রাঙামাটিতে ২৯৫ মেট্রিক টন চাল ও ৩৫ লাখ টাকা, খাগড়াছড়িতে ৩০০ মেট্রিক টন চাল ও ৩০ দশমিক ৫০ লাখ টাকা এবং বান্দরবানে ৫৫ মেট্রিক টন চাল ও ৪ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়েছে।

তিনি জানান, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে বন্যা পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী, সংশ্লিষ্ট প্রতিমন্ত্রীরা, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টারা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম তদারকি করছেন।

বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী বলেন, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৪৪ হাজার ৭৯৩ হেক্টর আবাদি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ২ লাখ ৮৭ হাজার ৭৩৫ জন কৃষক সরাসরি ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য বিনামূল্যে বীজ, সার এবং বিশেষ কৃষি প্রণোদনা প্যাকেজ দেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। তিনি আশ্বাস দেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে সরকার প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহায়তা অব্যাহত রাখবে।