নারায়ণগঞ্জে নিহত শুভকে দাফন না দাহ? ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাবা-মায়ের বিরোধ আদালতে

মরদেহ পাঁচ দিন ধরে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়েছে। মুসলিম না হিন্দু—ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাবা-মায়ের বিরোধ আদালতে গড়িয়েছে। আদালতের সিদ্ধান্তের পরই হবে দাফন বা দাহ।

0
নারায়ণগঞ্জে নিহত শুভকে দাফন না দাহ?
পাঁচ দিন ধরে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে শুভর মরদেহ- লোকসমাজ

লোকসমাজ ডেস্ক ॥ নারায়ণগঞ্জে গুলি ও ছুরিকাঘাতে নিহত যুবক শুভর মরদেহ নিয়ে দেখা দিয়েছে জটিলতা। মুসলিম নাকি হিন্দু—ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে বাবা ও মায়ের বিপরীত দাবির কারণে পাঁচ দিন ধরে ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে তার মরদেহ। বিষয়টি আদালতে গড়িয়েছে এবং আদালতের সিদ্ধান্তের পরই নির্ধারিত হবে শুভর মরদেহ দাফন করা হবে নাকি দাহ করা হবে।

পুলিশ ও পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, নিহত শুভর বাবা হরি চন্দ্র দাস দাবি করছেন, তার ছেলে হিন্দু ধর্মে জন্মগ্রহণ করেছেন। তাই হিন্দু ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী ছেলের মরদেহ চিতায় দাহ করতে চান তিনি।

অন্যদিকে শুভর মা আয়েশা বেগমের দাবি, তার ছেলে মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। হলফনামার মাধ্যমে নিজের নাম পরিবর্তন করে ‘বিল্লাল’ রাখেন এবং পরবর্তীতে মুসলিম রীতিতে বিয়ে করে মুসলিম পরিবারেই বসবাস করছিলেন।

জানা যায়, ২০০৩ সালে হরি চন্দ্র দাস ও আয়েশা বেগমের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। এরপর শুভ, তার মা, ভাই ও বোন ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। হলফনামার মাধ্যমে শুভ ‘বিল্লাল’ নাম গ্রহণ করেন এবং মুসলিম রীতিতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর মডেল থানার এসআই মফিজুর রহমান জানান, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পরিবারের মধ্যে বিরোধ থাকায় বিষয়টি আদালতের বিবেচনায় রয়েছে।

নিহতের ভাই ইব্রাহিমও দাবি করেছেন, তিনি ও শুভ একই সময়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং সুন্নতে খাতনা সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি তারা নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকার একটি মাদ্রাসায় একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন।

এদিকে মরদেহ বহনকারী ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সের চালক ভুট্টু মিয়া জানান, গত পাঁচ দিন ধরে সদর থানায় মরদেহ রাখা রয়েছে। ঘণ্টাপ্রতি ৫০০ টাকা হিসেবে ইতোমধ্যে প্রায় ৪৮ হাজার টাকার বিল জমা হয়েছে।

নারায়ণগঞ্জ সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাজেদুর রহমান বলেন, “শুভ হিন্দু না মুসলিম—এ নিয়ে পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্ব রয়েছে। বিষয়টি আদালতের বিবেচনায় আছে। আদালতের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী মরদেহ দাহ বা দাফনের ব্যবস্থা করা হবে। আপাতত মরদেহ হিমাগারে সংরক্ষণ করা হয়েছে।”

হত্যাকাণ্ডের ঘটনা

গত ৫ সেপ্টেম্বর রাত সোয়া ১টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের চাষাড়া হকার্স মার্কেটের পেছনে দুর্গামলের সামনে সড়কে শুভকে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তার গুলিবিদ্ধ ও ছুরিকাঘাতে রক্তাক্ত মরদেহ উদ্ধার করে।

পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে পাঁচটি গুলির খোসা এবং মরদেহের পাশ থেকে ১০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়েছে।

হত্যাকাণ্ডের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) সুমন ওরফে মাইগ্যা সুমন, সিয়াম আহমেদ সিজান ও সোহান নামে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে।

পুলিশের দাবি, ১০টি ইয়াবা ট্যাবলেটের বিনিময়ে শুভর এক সহযোগীর মাধ্যমে তাকে ঘটনাস্থলে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে আগে থেকে ওত পেতে থাকা ১০ থেকে ১২ জনের একটি দল তাকে ঘিরে ফেলে। পরে গুলি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাকে হত্যা করা হয়।

তদন্তের সর্বশেষ অগ্রগতি হিসেবে ৮ সেপ্টেম্বর রিমান্ডে থাকা সুমন ওরফে মাইগ্যা সুমনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নবাব সলিমুল্লাহ রোডের রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান ফটকের পূর্ব পাশের একটি ঝোপ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি বিদেশি পিস্তল ও একটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করেছে ডিবি পুলিশ।

একদিকে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত, অন্যদিকে ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে পরিবারের বিরোধ—সবকিছুর শেষ উত্তর এখন আদালতের হাতে। আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে, নিহত শুভর শেষ ঠিকানা হবে কবর নাকি চিতা।