খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন

0
খেলাপি ঋণ আদায়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নীতিমালা নিয়ে প্রশ্ন

বিশেষ প্রতিবেদক, লোকসমাজ : ব্যাংক খাতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো অনাদায়ী ঋণ আদায় ও সমন্বয়ের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রণীত বিশেষ এক্সিট সুবিধা সংক্রান্ত নীতিমালা। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি) থেকে ২০২৬ সালের ২৯ জুন জারি করা বিআরপিডি সার্কুলার লেটার-২৩ ইতোমধ্যে ব্যাংকার, ব্যবসায়ী ও ঋণগ্রহীতাদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

দেশের ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এ নীতিমালাকে একদিকে যেমন একটি ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে, অন্যদিকে এর কিছু দিক নিয়ে উদ্বেগও দেখা দিয়েছে। সার্কুলার অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৬ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩০ জুনের মধ্যে পুনঃতফসিল করা মন্দ বা ক্ষতিজনক (Bad/Loss) শ্রেণিকৃত ঋণও বিশেষ এক্সিট সুবিধার আওতায় আসবে।

বর্তমানে দেশের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা সামগ্রিক অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। তারই অংশ হিসেবে জারি করা হয়েছে বিআরপিডি সার্কুলার লেটার-২৩। বিআরপিডি-১ বিভাগের পরিচালক গাজী মো. মাহফুজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ সার্কুলারের কার্যকারিতা আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।

নীতিমালা অনুযায়ী, বিশেষ এক্সিট সুবিধা পেতে খেলাপি ঋণগ্রহীতাকে এককালীনভাবে তার ঋণের সমুদয় দায় পরিশোধ করতে হবে। এর বিনিময়ে তিনি আরোপিত ও অনারোপিত সুদ মওকুফের সুযোগ পাবেন। মূল জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এখানেই।

সার্কুলারে বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতাকে ‘আসল পাওনা’ বা ‘প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট’ পরিশোধ করতে হবে। কিন্তু এই প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট কীভাবে নির্ধারণ করা হবে, সেটিই এখন বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। অনেক ঋণগ্রহীতার মতে, ঋণ মঞ্জুরের সময় তারা যে অর্থ গ্রহণ করেছিলেন, সেটিকেই মূল ঋণ বা প্রিন্সিপাল হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর হিসাব পদ্ধতি ভিন্ন।

ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ বিতরণের পর বিভিন্ন সময়ে আদায়কৃত সুদ মূলধনের সঙ্গে সমন্বিত বা মূলধনীকরণ (Capitalization) করা হয়। ফলে কয়েক বছরের ব্যবধানে প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট প্রাথমিক ঋণের তুলনায় দ্বিগুণ বা তিনগুণ পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। এদিকে ব্যাংকগুলো ইতোমধ্যে এসব সুদকে আয় হিসেবে গণ্য করেছে, কর পরিশোধ করেছে, শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশ দিয়েছে এবং কর্মীদের বিভিন্ন সুবিধা প্রদান করেছে। অবশিষ্ট অংশ রিটেইনড আর্নিংস হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।

এ অবস্থায় যদি অতীতে হিসাবভুক্ত সব সুদ একসঙ্গে মওকুফ করতে হয়, তাহলে ব্যাংকগুলোকে তাদের আয় খাতে সমন্বয় করতে হবে। এর ফলে অনেক ব্যাংক বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার স্বার্থে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এ কারণেই অনেক ব্যাংক সার্কুলার বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে অনাদায়ী থাকা কিছু ঋণগ্রহীতা এ সুযোগ গ্রহণে সক্রিয় হয়ে উঠেছেন। বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগ ও তদবিরের চেষ্টাও দেখা যাচ্ছে।

ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতি মোকাবিলায় সরকারের সহায়তা বা বিশেষ প্রণোদনার প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের অনেকে মনে করছেন। বিশেষ করে যেসব ঋণ বিশেষ এক্সিট সুবিধার আওতায় সমন্বয় করা হবে, সেসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে কোনো পুনর্ভরণ বা ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা না থাকলে ব্যাংকগুলো আর্থিক চাপের মুখে পড়তে পারে।

বিষয়টি নিয়ে একাধিক ব্যাংক ব্যবস্থাপকের সঙ্গে কথা হলে তারা নাম প্রকাশে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। তাদের ভাষ্য, সার্কুলারটি সদ্য জারি হওয়ায় এর বিভিন্ন দিক এখনও পর্যালোচনার পর্যায়ে রয়েছে। তারা প্রধান কার্যালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছেন। শাখা পর্যায়ে এমন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে স্বতন্ত্র সিদ্ধান্ত নেওয়া অত্যন্ত কঠিন বলেও তারা মন্তব্য করেন।

এ বিষয়ে যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মিজানুর রহমান খানের সঙ্গে কথা হলে তিনি জানান, ইতোমধ্যে কয়েকজন খেলাপি ঋণগ্রহীতা তার কাছে অভিযোগ করেছেন যে ব্যাংকগুলো এ বিষয়ে তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছে না। তিনি বলেন, যশোরের ব্যাংক ব্যবস্থাপক, ঋণগ্রহীতা এবং প্রশাসনের প্রতিনিধিদের নিয়ে শিগগিরই একটি যৌথ সভার আয়োজনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ওই সভার আলোচনার ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।

সব মিলিয়ে বলা যায়, বিআরপিডি সার্কুলার লেটার-২৩ দেশের খেলাপি ঋণ কমানোর ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তবে ‘সমুদয় দায়ের আসল পরিমাণ’ বা ‘প্রিন্সিপাল অ্যামাউন্ট’ নির্ধারণের বিষয়টি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি এ বিষয়ে দ্রুত ব্যাখ্যা বা স্পষ্টীকরণ দেয়, তাহলে নীতিমালার বাস্তবায়ন সহজ হবে এবং দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ হ্রাসে এ উদ্যোগ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে।

সার্কুলারের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত। এর আগেই সংশ্লিষ্ট অস্পষ্টতাগুলো দূর করা গেলে ব্যাংক, ঋণগ্রহীতা এবং সামগ্রিক অর্থনীতি—সব পক্ষই উপকৃত হবে।