অভয়নগরে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা: ৮ মাসে হাসপাতালে ভর্তি ৪০৭, মৃত্যু ৩; শুরু হয়েছে মশক নিধন অভিযান

0

নজরুল ইসলাম মল্লিক, অভয়নগর (যশোর) : যশোরের অভয়নগরে ডেঙ্গুর প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৪০৭ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন। এ সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে অন্তত তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় নওয়াপাড়া পৌরসভা পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও মশক নিধন কর্মসূচি শুরু করেছে।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারিতে ৮ জন, ফেব্রুয়ারিতে ২ জন, মার্চে ৭ জন, এপ্রিলে ১৮ জন, মে মাসে ৩১ জন, জুনে ৫৫ জন, জুলাইয়ে ১২৫ জন এবং আগস্টে ১৬১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। জুলাই ও আগস্ট মাসে আক্রান্তের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে কয়েকজনকে গুরুতর অবস্থায় উন্নত চিকিৎসার জন্য খুলনার বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়। এর মধ্যে আগস্ট মাসে নওয়াপাড়ার তৃতীয় লিঙ্গের বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম (৭০) আশঙ্কাজনক অবস্থায় খুলনার গাজী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।

এ ছাড়া জুলাই মাসে নওয়াপাড়া মডেল কলেজ এলাকার সৌদি প্রবাসী জুয়েলের ছেলে সোহেল (২৯) ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। একই মাসের ১৬ জুলাই নওয়াপাড়া পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জোসনা বেগম (৪৫) ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের হিসাবই শুধু এই পরিসংখ্যানে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক কিংবা বাড়িতে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের সংখ্যা এতে নেই। ফলে বাস্তবে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।

ডেঙ্গুর বিস্তার রোধে ‘নিজে করি, অন্যকে উদ্বুদ্ধ করি’ প্রতিপাদ্যে শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) নওয়াপাড়া পৌর এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান, জনসচেতনতা কার্যক্রম এবং মশক নিধন কর্মসূচির উদ্বোধন করা হয়েছে। পৌরসভার উদ্যোগে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গুয়াখোলা গ্রামে অভয়নগর উপজেলা পরিষদসংলগ্ন এলাকা থেকে এ কর্মসূচির সূচনা হয়।

কর্মসূচির উদ্বোধন করেন নওয়াপাড়া পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) আশীষ কুমার বসু। এ সময় পৌরসভার নির্বাহী কর্মকর্তা (পিএনও) সাইফুল ইসলাম, সমাজ উন্নয়ন কর্মকর্তা রাজিবুর রহমান, শহর পরিকল্পনাবিদ সোহেল সরদার, নওয়াপাড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) আশরাফ হোসেন প্রিন্সসহ পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারী, রেড ক্রিসেন্ট ও স্কাউট সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

পৌর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, লিফলেট বিতরণ এবং মশক নিধন কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে পৌরসভার সব ওয়ার্ডে পরিচালনা করা হবে।

অভয়নগর উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আলিমুর রাজিব বলেন, “অভয়নগরে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। জুন-জুলাই থেকে আক্রান্তের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা এবং কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থার অভাব এডিস মশার বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। যশোর জেলার মধ্যে অভয়নগরকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।”

অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নওয়াপাড়া পৌরসভার প্রশাসক শেখ সালাউদ্দিন দিপু বলেন, “পৌরসভার প্রতিটি এলাকায় এডিস মশা নিধনে ওষুধ ছিটানো হচ্ছে এবং ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা হচ্ছে। মাইকিং ও লিফলেট বিতরণের মাধ্যমে জনসচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে। কোথাও যাতে পানি জমে না থাকে সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।”

স্থানীয়দের দাবি, ডেঙ্গুর প্রকোপ নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম আরও জোরদার করার পাশাপাশি জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ প্রয়োজন।