অপরাধ দমনে এআই-নির্ভর পুলিশিং জোরদার

স্মার্ট সিসিটিভি, ডিপফেক দমন ও ই-প্রসিকিউশনে গতি; নজরদারি নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে

0

লোকসমাজ ডেস্ক॥ সাইবার অপরাধ, আর্থিক জালিয়াতি ও নগর নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় দেশে দ্রুত বাড়ছে এআই-নির্ভর পুলিশিং। এর অংশ হিসেবে গত ২৯ এপ্রিল ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) পুলিশিং আধুনিকায়নে ৯টি নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করেছে।
নতুন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, বাংলামোটর, কারওয়ান বাজার ও বিজয় সরণি এলাকায় উন্নত ভিডিও বিশ্লেষণ ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করা যাবে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রমাণ সংগ্রহ ও ই-প্রসিকিউশন সম্ভব হওয়ায় আইন প্রয়োগে গতি বাড়বে।
পুলিশের মহাপরিদর্শক মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, “অপরাধ এখন প্রযুক্তিনির্ভর। তাই আধুনিক প্রযুক্তি ছাড়া কার্যকর পুলিশিং সম্ভব নয়।”
স্মার্ট সিসিটিভি ক্যামেরা সন্দেহজনক আচরণ, পরিত্যক্ত বস্তু ও সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করতে সক্ষম। এমনকি গুলির শব্দ শনাক্ত করে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে অবস্থান নির্ধারণও সম্ভব হচ্ছে।
সম্প্রতি ঢাকা ও নরসিংদীতে জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে ডিপফেক, মানহানিকর ভিডিও ও জাল নথি তৈরির অভিযোগে কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। নতুন আইনে এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদন্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশ প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগে অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে। ভিয়েনায় ‘গ্লোবাল ফ্রড সামিট ২০২৬’-এ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অর্থপাচার ও আর্থিক জালিয়াতি শনাক্তে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
নাগরিক সম্পৃক্ততা বাড়াতে ‘হ্যালো সিটি’, ‘রিপোর্ট টু বিজিবি’, ‘বিডি পুলিশ হেল্পলাইন’ ও ‘৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা’ প্ল্যাটফর্মগুলো সক্রিয় রয়েছে।
তবে এআই-নির্ভর পুলিশিং সম্প্রসারণে গোপনীয়তা লঙ্ঘন, নজরদারির অপব্যবহার ও প্রযুক্তিগত পক্ষপাত নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা স্বচ্ছ নীতিমালা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব গ্রেফতার ব্ল্যাকমেইল, প্রতারণা ও বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার মতো এআইনির্ভর অপরাধের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী অভিযানেরই অংশ।
নতুন আইনি বিধান অনুযায়ী, অনুমতি ছাড়া ডিপফেক তৈরি, প্রতিশোধমূলক পর্নোগ্রাফি বা চাঁদাবাজির মতো অপরাধে এআই ব্যবহার করে দোষী প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড হতে পারে।
নাগরিকদের ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি উদীয়মান প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতেই এসব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পর্যায়েও প্রযুক্তিনির্ভর আইন প্রয়োগে অঙ্গীকার জোরদার করেছে বাংলাদেশ। ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত ‘গ্লোবাল ফ্রড সামিট ২০২৬’-এ অংশ নিয়ে সন্ত্রাসবাদ, মাদক, মানবপাচার, দুর্নীতি ও আর্থিক অপরাধের বিরুদ্ধে দেশের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, বিশেষ করে ব্যাংকিং, ব্যাংকবহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠান, রিয়েল এস্টেট ও জুয়েলারি মার্কেটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ ক্ষেত্রে অর্থপাচার ও আর্থিক জালিয়াতি শনাক্তে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতে কঠোর নজরদারি, নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং নিয়ম ও বিধি মেনে চলার ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
এ ছাড়া অর্থপাচার প্রতিরোধ আইন, ২০১২ এবং পারস্পরিক সহায়তা আইন, ২০১২ কঠোরভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি আন্তঃদেশীয় অপরাধচক্র ভাঙতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের কথাও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
জননিরাপত্তা অবকাঠামো শক্তিশালী করতে দেশে নাগরিকবান্ধব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করা হয়েছে। এগুলো সেবার সহজলভ্যতা, দ্রুত সাড়া প্রদান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সমন্বয়ে সহায়তা করছে।
এর মধ্যে ‘হ্যালো সিটি’ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে যেকোনো নাগরিক গোপনে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রবাদ, সাইবার অপরাধ ও মাদক-সংক্রান্ত তথ্য জানাতে পারছেন। ফলে নিরাপত্তা কার্যক্রমে জনগণের সম্পৃক্ততা বাড়ছে।
একইভাবে ‘রিপোর্ট টু বিজিবি’ প্ল্যাটফর্ম সীমান্তে চোরাচালান ও অনুপ্রবেশ মোকাবিলায় সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে সহায়তা করছে।
নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকার চালু করেছে ‘হেল্প (হ্যারাসমেন্ট এলিমিনেশন লিটারেসি প্রোগ্রাম)’। এই প্ল্যাটফর্মে নারীরা গণপরিবহনে হয়রানির অভিযোগ জানাতে পারেন। অভিযোগ জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা হিসেবে নথিভুক্ত হয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
পাশাপাশি নারীর প্রতি সহিংসতার ঘটনায় সাড়া দিতে বিশেষ ‘৩৩৩৩ হটলাইন’ চালুর প্রস্তুতিও চলছে।
অন্যদিকে ‘বিডি পুলিশ হেল্পলাইন’-এর মাধ্যমে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা এবং জরুরি যোগাযোগের সুবিধা পাচ্ছেন নাগরিকরা।
বহুল ব্যবহৃত ‘৯৯৯ জাতীয় জরুরি সেবা’ এখনও পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও অ্যাম্বুলেন্স সেবা পাওয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে সক্রিয় রয়েছে।
সব মিলিয়ে এসব উদ্যোগ জননিরাপত্তা ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির সমন্বয়, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং নাগরিক সম্পৃক্ততার ওপর বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রতিফলন।
অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) অধীন সাইবার পুলিশ সেন্টার (সিপিসি) এবং বিডিজি ই-গভ সার্ট-এর মতো বিশেষায়িত ইউনিটগুলো সাইবার অপরাধ তদন্ত, ডিজিটাল ফরেনসিকস এবং জাতীয় তথ্য অবকাঠামো সুরক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।
তবে পুলিশিংয়ে এআই ব্যবহারের বিস্তার নিয়ে আইন বিশেষজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। বিশেষ করে গণনজরদারির ঝুঁকি, তথ্যের গোপনীয়তা লঙ্ঘন, প্রযুক্তিগত পক্ষপাত এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সম্ভাব্য অপব্যবহার বিষয়ে তারা শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।
পাশপাশি জবাবদিহিতা নিশ্চিতে কঠোর প্রত্যক্ষ তদারকি, স্বচ্ছ নীতিমালা এবং নৈতিক সুরক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই প্রেক্ষপটে সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ও কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করে এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রতিশ্রুতি জানিয়েছে।