মুনশি মেহেরুল্লাহ: যশোরের আলোকিত ধর্মসংস্কারক ও সমাজজাগরণের নক্ষত্র

0
মুনশি মেহেরুল্লাহ : যশোরের আলোকিত এক নক্ষত্র

মুনশি মোহাম্মদ মেহেরুল্লাহ (১৮৬১-১৯০৭) ছিলেন একজন বিশিষ্ট কবি, ধর্মপ্রচারক ও সমাজসংস্কারক। তিনি ১৮৬১ সালের ২৬ ডিসেম্বর বৃহত্তর যশোর জেলার বর্তমান ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ঘোপ গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। তার পৈতৃক নিবাস ছিল যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাটি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে।
শিক্ষাজীবনে তিনি যশোরের মৌলবি মোসহারউদ্দীনের কাছে ধর্মীয় শিক্ষা এবং মৌলবি মোহাম্মদ ইসমাইলের কাছে আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষা ও সাহিত্যে দীক্ষা নেন। পাশাপাশি কুরআন-হাদিস ও ফারসি সাহিত্যেও তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তবে দারিদ্র্যের কারণে তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।

মুনশি মেহেরুল্লাহ : যশোরের আলোকিত এক নক্ষত্র
কর্মবীর মুনশি মেহেরুল্লাহর স্মরণে যশোরের চুড়ামনকাটিতে অবস্থিত রেল স্টেশনের নাম মেহেরুল্লাহ নগর স্টেশন

জীবিকার প্রয়োজনে তিনি কিছুদিন সরকারি চাকরি করেন। পরে দর্জিবিদ্যায় প্রশিক্ষণ নিয়ে যশোরে একটি দর্জির দোকান খুলে স্বনির্ভর হন। এ সময় খ্রিস্টান মিশনারিদের পক্ষ থেকে ইসলাম ও হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অপপ্রচার শুরু হলে তিনি বক্তৃতা ও লেখার মাধ্যমে তার প্রতিবাদ করেন। এমনকি একাধিকবার প্রকাশ্য বিতর্কেও অংশ নেন। ধীরে ধীরে তিনি ধর্মপ্রচারে আত্মনিয়োগ করেন এবং একজন জনপ্রিয় বক্তা হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।
মেহেরুল্লাহ বাংলা ও আসামের বিভিন্ন ধর্মীয় সভায় বক্তৃতা দিয়ে মুসলমান সমাজকে সচেতন ও জাগ্রত করার চেষ্টা করেন। তিনি কলকাতা থেকে প্রকাশিত সুধাকর ও ইসলাম প্রচারকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় নিয়মিত লেখালেখি করতেন।
১৯১০ সালে যশোরের দড়াটানা মোড়ে প্রায় সাত হাজার মানুষের এক সমাবেশে হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক হিসেবে মুনশি মেহেরুল্লাহকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছিল বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
তার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে-

  • খ্রিষ্টীয় ধর্মের অসারতা
  • বিধবা গঞ্জনা
  • বিষাদভান্ডার
  • মুসলমান ও খ্রিষ্টান তর্কযুদ্ধ
  • মেহেরুল ইসলাম
  • হিন্দু ধর্ম রহস্য বা দেবলীলা
  • রদ্দে খ্রিষ্টান ও দলিলুল ইসলাম
  • পান্দেনামা
  • জওয়াবে নাসারা
    তার মৃত্যুর পর ১৯০৯ সালে তৎকালীন সরকার বিধবা গঞ্জনা ও হিন্দু ধর্ম রহস্য গ্রন্থ দুটি বাজেয়াপ্ত করে।
    ১৯০৭ সালের ৭ মে তিনি মাত্র ৪৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। তাকে যশোর সদর উপজেলার চুড়ামনকাঠি ইউনিয়নের ছাতিয়ানতলা গ্রামে দাফন করা হয়।
মুনশি মেহেরুল্লাহ : যশোরের আলোকিত এক নক্ষত্র
মুনশি মেহেরুল্লাহ- সংগৃহীত ছবি

মূল্যায়ন ও প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসবিদ মৌ ব্যানার্জি মেহেরুল্লাহ সম্পর্কে লিখেছেন, তার মৃত্যুর পর শিষ্য জমিরুদ্দিন ‘মেহের চরিত’ নামে একটি সংক্ষিপ্ত জীবনী রচনা করেন, যা তার জীবন ও কর্মের অন্যতম নির্ভরযোগ্য দলিল। পরবর্তী জীবনীগ্রন্থগুলোও এ তথ্যের ওপর ভিত্তি করে রচিত।
মৌ ব্যানার্জির মতে, মেহেরুল্লাহ কেবল একজন স্বশিক্ষিত দর্জি ছিলেন না; তিনি বাঙালি মুসলমানদের একজন গুরুত্বপূর্ণ মুখপাত্রে পরিণত হন, বিশেষত ধর্মীয় বিতর্ক ও সামাজিক জাগরণের ক্ষেত্রে।
তার মৃত্যুতে যশোর, ঢাকা ও কলকাতায় শোকের ছায়া নেমে আসে। মিহির-ও-সুধাকর পত্রিকা তাকে বাঙালি মুসলমান সমাজের এক নিবেদিতপ্রাণ সংস্কারক হিসেবে উল্লেখ করে। তিনি সমাজের সব স্তরের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিলেন—সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে শিক্ষিত অভিজাত শ্রেণি পর্যন্ত।
সম্মাননা
মেহেরুল্লাহর স্মরণে যশোর টাউন হল মাঠকে মুনশি মেহেরুল্লাহ ময়দান নামকরণ করা হয়েছে এবং যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ছাত্রাবাসসহ বিভিন্ন স্থাপনার নামকরণ করা হয়েছে। তার অবদান স্মরণে নানা উদ্যোগ আজও চলমান।

– গ্রন্থনা : শিকদার খালিদ