অসাধু বাইকারদের দৌরাত্ম্যে যশোরের জ্বালানি তেল চলে যাচ্ছে বিভিন্ন জেলায়

0
ছবি: লোকসমাজ।

মাসুদ রানা বাবু ॥ অসাধু মোটরবাইকারদের দৌরাত্ম্যে নির্ধারিত সময়ের আগেই যশোরের পাম্পগুলোতে জ্বালানি তেল (পেট্রোল এবং অকটেন) শেষ হয়ে যাচ্ছে। সরকারের বরাদ্দ অনুযায়ী এই দুটি জ্বালানি তেল পাওয়ার পরও সকল ভোক্তাদের মাঝে সরবরাহ করতে পারছেন না পাম্প কর্তৃপক্ষ। আবার যশোর জেলার বরাদ্দকৃত পেট্রোল-অকটেন অসাধু বাইকারদের মাধ্যমে বাইরের কয়েকটি জেলায় চলে যাচ্ছে।

এই অসাধু চক্র তেল মজুতের পর অতি গোপনে নিজ এলাকায় চড়া দামে বিক্রি করছে। তাদের কারণে আতঙ্কে সাধারণ বাইকারদের মধ্যেও তেল কেনার হিড়িক পড়ছে।

গেল কয়েকদিন যাবৎ শহরের বিভিন্ন পাম্প ঘুরে বিষয়টি জানা যায়। পাম্পে কর্মরত নজেলম্যানরা জানান, প্রতিদিন অসাধু বাইকাররা ভোরের আলো ফোটার আগেই তেল নেওয়ার জন্য পাম্পে লাইন ধরছেন। একটি পাম্প থেকে তেল নেওয়ার পর আরেকটি পাম্পে তেল নিয়ে ট্যাংকি ভরছেন।

এরপর শহরের সুবিধামতো কোনো স্থানে দাঁড়িয়ে বাইকের ট্যাংকি থেকে তেল নামিয়ে বোতল ভর্তি করছেন। নিজের নিরাপদ জায়গায় বোতল ভর্তি তেল রেখে আবার তেল নেওয়ার জন্য পাম্পের লাইন ধরছেন। এভাবে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অসাধু বাইকাররা বিপুল পরিমাণ পেট্রোল-অকটেন সংগ্রহ করে বাড়ি ফিরছেন।

নিজ এলাকায় অতি গোপনে তারা চড়া দামে তেল বিক্রি করছেন। বিশেষ করে যে সকল এলাকায় নিকটবর্তী স্থানে পাম্প নেই, সে সকল এলাকার বাইকারদের কাছে তারা দ্বিগুণ-তিনগুণ দামে পেট্রোল-অকটেন বিক্রি করছেন। প্রয়োজনের তাগিদে ওই সকল এলাকার বাইকাররাও চড়া দামে তেল কিনছেন।

পাম্পে কর্মরতরা জানান, ডিপো প্রতি জেলার এমনকি প্রতিটি পাম্পের চাহিদা মতো জ্বালানি সরবরাহ করে। একটি জেলা কিংবা একটি পাম্পের জন্য বরাদ্দকৃত জ্বালানি তেল যদি বাইরের কোনো জেলায় চলে যায়, তাহলে কোনোভাবেই সেই জেলায় তেলের সুসম বন্টন হওয়ার সুযোগ নেই।

এদিকে গেল শনিবার রাত ৮টার দিকে যশোর শহরের মুড়লি মোড়ে অবস্থিত চলন্তিকা ফিলিং স্টেশন থেকে মুজিবর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে বোতলে তেল ভরতে দেখে স্থানীয় জনতা আটক করে। পরে তার কাছে তল্লাশি করে ২৪ বোতল ভর্তি ২৪ লিটার পেট্রোল পায়। আটক মুজিবর রহমান কেশবপুর উপজেলার সরসকাঠি গ্রামের বাসিন্দা।

পরে তার স্বীকারোক্তিতে জানা যায়, মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন পাম্পে ঘুরে সে এই তেল সংগ্রহ করেছিল। স্থানীয়রা তাকে আটকের পর যশোর কোতোয়ালী মডেল থানা পুলিশের কাছে সোপর্দ করে।

নিউ আকিজ পেট্রোল পাম্পের ম্যানেজার জিহাদুর রহমান বলেন, যশোরের বাইরের জেলা থেকে প্রতিদিন কী পরিমাণ বাইকাররা তেল নিয়ে যাচ্ছে সেটা কল্পনার বাইরে। বিশেষ করে সাতক্ষীরার কলারোয়া, খোরদো, কাজীরহাট, ঝাউডাঙ্গা, চুকনগরের খর্নিয়া, ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর, মহেশপুর ও নড়াইলের বাইকাররা প্রতিদিন যশোর থেকে বিপুল পরিমাণ পেট্রোল, অকটেন নিয়ে যাচ্ছে; যা যশোরের তেলের সংকট সৃষ্টির অন্যতম কারণ।

ডিপো থেকে তেল উত্তোলন করে পাম্পে নিয়ে আসার আগেই তেল নেওয়ার জন্য লাইন ধরছেন এই অসাধু বাইকাররা। সরকারের বেঁধে দেওয়া সময় সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত পেট্রোল-অকটেন দেওয়ার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ের আগে অর্থাৎ ভোররাত থেকে তারা লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।

এ বিষয়ে প্রশাসন কঠোর পদক্ষেপ নিলে অসাধু বাইকার নামক তেল মজুতদারদের রোধ করা সম্ভব। তাহলে আমরা পাম্প থেকে যশোরের জন্য বরাদ্দকৃত জ্বালানি তেল যশোরের মানুষের মাঝে সুষ্ঠুভাবে সরবরাহ করতে পারব। এর মাধ্যমে জ্বালানি তেল সাশ্রয় হবে।

যশোর-খুলনা মহাসড়কে অবস্থিত মনির হোসেন পেট্রোল পাম্পের নজেলম্যান খোকন বলেন, গেল কয়েকদিন আগে মণিরামপুর থেকে মোটরসাইকেলে করে তেল নিতে আসা একজনকে সন্দেহজনকভাবে আটক করা হয়। পরে তার মোটরসাইকেলের চারটি থলে থেকে পাঁচ লিটারের চারটি বোতলে ২০ লিটার জ্বালানি তেল পাওয়া যায়। তার কাছে মোটরসাইকেলের ট্যাংক থেকে তেল নামানোর কাজে ব্যবহৃত তেলের পাইপ পাওয়া যায়। ওই বাইকার বিপুল পরিমাণ বোতলে তেল নিয়ে পুনরায় তেল নেওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ায়।

এমনিভাবে প্রতিদিন অসংখ্য অসাধু বাইকাররা শহর থেকে ট্যাংকি ভর্তি তেল নিয়ে বাড়িতে নামিয়ে পরের দিন আবার পাম্পে আসছে। এই অসাধু বাইকাররা তেল অতি গোপনে এলাকায় চড়া দামে বিক্রি করছে।