জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কৃষিতে বাড়ছে উদ্বেগ

যশোরের কৃষকের দাবি প্রণোদনার চেয়ে সার-কীটনাশক দাম নিয়ন্ত্রণ জরুরি

0

যশোরের কৃষকের দাবি প্রণোদনার চেয়ে সার-কীটনাশক দাম নিয়ন্ত্রণ জরুরি

প্রতিবেদক।লোকসমাজ
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যশোরের কৃষিতে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হচ্ছে। ঋতুচক্রের পরিবর্তন, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা চাষাবাদে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন।

কৃষকদের ভাষ্য, আগে নির্দিষ্ট সময়ে বৃষ্টি হলেও এখন তা অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। কখনো অতিরিক্ত বৃষ্টি, আবার কখনো দীর্ঘ খরার কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু সহনশীল জাতের ফসল চাষ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এই সমস্যার আংশিক সমাধান দিতে পারে। পাশাপাশি উন্নত পানি ব্যবস্থাপনাও জরুরি। সরকারি সহায়তা ও সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে কৃষকদের এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করা প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যশোরের কৃষিতে
গ্রাফিক্স- লোকসমাজ

গদখালীর ফুল চাষে সংকট

গদখালী অঞ্চলের ফুল চাষ বর্তমানে নানা প্রতিকূলতার মুখে পড়েছে।

শৈত্যপ্রবাহের প্রভাব: তীব্র ঠান্ডায় (১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে) গ্লাডিওলাস ও গোলাপের পাপড়ি কালো হয়ে নষ্ট হচ্ছে। অতিরিক্ত কুয়াশায় গাছের পাতা শুকিয়ে যাচ্ছে এবং চারা মারা যাচ্ছে।

অসময়ে বৃষ্টি: সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতে ফুলের বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বড় মৌসুমগুলোতে (যেমন বিজয় দিবস বা বসন্ত উৎসব) সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।

পানির সংকট: তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে সেচের পানির অভাব দেখা দিচ্ছে, যা উৎপাদন ও মান কমিয়ে দিচ্ছে।

সাতমাইলের সবজি চাষে চাপ

সাতমাইল এলাকায় সবজি চাষেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব স্পষ্ট—

জলাবদ্ধতা: ভারি বৃষ্টিতে নিচু জমি তলিয়ে গিয়ে চারা নষ্ট হচ্ছে। ফলে পুনরায় রোপণ করতে গিয়ে খরচ বাড়ছে।

রোগপোকামাকড় বৃদ্ধি: তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বৃদ্ধির কারণে নতুন পোকামাকড় ও ছত্রাকজনিত রোগ (যেমন লেট ব্লাইট) বাড়ছে।

মিরাকল রেইন’: খরার পর স্বল্প বৃষ্টিপাত কখনো কখনো বোরো ধান ও সবজির জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেয়।

তবে এসব পরিস্থিতি মোকাবিলায় কৃষকদের অতিরিক্ত কীটনাশক ও রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং উপকারী পোকামাকড় ধ্বংস করছে।

সরকারি প্রণোদনা উদ্যোগ

২০২৫-২৬ অর্থবছরে সরকার গদখালী (ঝিকরগাছা) ও সাতমাইল অঞ্চলের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা কর্মসূচি চালু করেছে—

বিনামূল্যে বীজ সার: খরিপ-১ মৌসুমে পাট, আউশ, মুগ ও তিল চাষে সহায়তা।

কৃষি কার্ড: সরাসরি সহায়তা পৌঁছাতে প্রি-পাইলটিং কার্যক্রম।

ফুল চাষে সহায়তা: শেড নির্মাণ ও আধুনিক প্যাকেজিংয়ে ভর্তুকি।

এছাড়া ‘টেকসই কৃষি সম্প্রসারণ প্রকল্প’-এর আওতায় কৃষি ও প্রযুক্তি মেলা, আধুনিক প্রযুক্তি প্রশিক্ষণ এবং আবহাওয়া ভিত্তিক তথ্যসেবা প্রদান করা হচ্ছে।

সাতমাইল এলাকার কৃষক ওবাইদুল ইসলাম বাবু বলেন, “সরকার প্রণোদনা দিচ্ছে ঠিক আছে, তবে চাষের ব্যয়ের সঙ্গে তা সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সার ও কীটনাশকের দাম কমানো জরুরি।”

একই দাবি করে ডহেরপাড়া গ্রামের খায়রুল আলম বলেন, কৃষকদের জন্য সহায়ক বাজারনীতি প্রণয়নও সময়ের দাবি।

সবজি ও ফুলের রাজধানী হিসেবে খ্যাত যশোরের কৃষি খাত জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে প্রযুক্তি, নীতি সহায়তা এবং কৃষকবান্ধব উদ্যোগ—সবকিছুর সমন্বিত প্রয়াস এখন সময়ের দাবি।