আবহাওয়ার উৎকণ্ঠা কেটেছে, আশার আলো দেখছেন যশোরের বোরোচাষি

0

স্টাফ রিপোর্টার। লোকসমাজ-

হঠাৎ তাপপ্রবাহের পর আকস্মিক বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ায় যশোর অঞ্চলের বোরো আবাদে যে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছিল, তা অনেকটাই কেটে গেছে বলে জানিয়েছে জেলা কৃষি বিভাগ। বরং সাম্প্রতিক এই বৃষ্টি এখন কৃষকদের জন্য আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে।
গত দুদিনের বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় প্রথমদিকে উদ্বেগে পড়েন জেলার হাজারো বোরো চাষি। বিশেষ করে ধানের শীষ বের হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এমন আবহাওয়া পরিবর্তনে অনেকেই আশঙ্কা করেছিলেন, এতে ফলনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে ধানের ‘চিটা’ হওয়ার ভয়, যা ফলন মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিতে পারে।
তবে সেই শঙ্কা শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়নি। বরং প্রকৃতির এই আচরণ উল্টো ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, এপ্রিলের শুরু থেকেই যশোর অঞ্চলে তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। হঠাৎ করেই পারদ প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। টানা দুদিন তাপমাত্রা ৩৮ ডিগ্রির ওপরে থাকায় বোরো ধানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হয়।

 

তিনি বলেন, ঠিক এই সময়েই মাঠজুড়ে ধানের শীষ গজাতে শুরু করে, যা অত্যন্ত সংবেদনশীল একটি পর্যায়। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধানের শীষে ‘চিটা’ পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়, যা কৃষক ও কৃষি বিভাগ, উভয়ের জন্যই বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে পরিস্থিতি বদলে যায় গত দুদিনের বৃষ্টিতে। মোশাররফ হোসেন জানান, এই সময়ে যশোরে প্রায় ১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে নেমে আসে এবং ধানের জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
তিনি আরও বলেন, এই বৃষ্টি একপ্রকার মিরাকল হিসেবে কাজ করেছে। তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় ধানের চিটা হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। ফলে কৃষকরা এখন অনেকটাই স্বস্তিতে রয়েছেন।
কৃষি বিভাগ জানায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে সেচ ব্যয় বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এই বৃষ্টি সেচনির্ভর বোরো চাষে বাড়তি সহায়তা দিয়েছে। এতে কৃষকদের সেচ খরচ কমবে এবং উৎপাদন ব্যয় কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে যশোর জেলায় মোট ১ লাখ ৫৭ হাজার ৯৫০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ব্রিধান-৫০, ব্রিধান-৬৩ এবং রেড মিনিকেট জাতের চাষ বেশি হয়েছে।
মাঠ পর্যায়ে কৃষকদের সঙ্গেও কথা বলে একই চিত্র পাওয়া গেছে। সদর উপজেলার চাষি আব্দুল মালেক বলেন, কয়েকদিন আগেও মনে হচ্ছিল সব শেষ হয়ে যাবে। এত গরমে ধানের শীষ ঠিকমতো দানা বাঁধবে না, এই ভয় ছিল। কিন্তু আল্লাহর রহমতে বৃষ্টি হওয়ায় এখন জমিতে ভালো অবস্থা দেখা যাচ্ছে। যদি আর কোনো বড় ঝড় না হয়, তাহলে ফলন ভালোই হবে বলে আশা করছি।
একই উপজেলার কৃষক শফিকুল ইসলাম জানান, তাপমাত্রা এত বেশি ছিল যে প্রতিদিন সেচ দিতে হচ্ছিল। এতে খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছিল। ডিজেল ও বিদ্যুতের খরচ মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছিল। বৃষ্টির কারণে এখন সেই চাপ অনেকটাই কমেছে। জমিতে আর্দ্রতা ফিরে এসেছে, ধানও ভালোভাবে বেড়ে উঠছে।
কৃষকরা বলছেন, এই বৃষ্টি সময়মতো হওয়ায় ধানের শীষ গজানোর পর্যায়ে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে তারা এখন বাম্পার ফলনের আশা করছেন।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, বর্তমান আবহাওয়া পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে এবং বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না ঘটলে চলতি মৌসুমে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের সম্ভাবনা রয়েছে। ইতোমধ্যে মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা নিয়মিত মনিটরিং করছেন এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন।
এদিকে, সাম্প্রতিক বৃষ্টি শুধু বোরো ধানের জন্যই নয়, রবি শস্যের জন্যও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই বৃষ্টিতে জমির আর্দ্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে, যা অন্যান্য ফসলের বৃদ্ধিতেও সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, আবহাওয়ার এই ইতিবাচক পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে এবং কৃষি বিভাগ প্রয়োজনীয় সহায়তা অব্যাহত রাখলে যশোরে এ বছর বোরো উৎপাদনে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হতে পারে।