সুন্দরবন ধ্বংস নয়, রক্ষার ব্যবস্থা চাই

সারা পৃথিবীর দেশে দেশে যখন বন-জঙ্গল, হাওর-বাঁওড়, নদী, সমুদ্র, পাহাড়, টিলাসহ ন্যূনতম ভ্রমণযোগ্য স্থানগুলো সংরক্ষণ করে পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তখন বাংলাদেশে চলছে ছলেবলে কৌশলে ধ্বংসযজ্ঞ। হাওড়-বাঁওড়, নদী ভরাট করে দখল ইতিহাস দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিককালে শুরু হয়েছে পাহাড় ও সমুদ্র দখল। এ নিয়ে পত্র-পত্রিকায় সরব হলেও প্রশাসন উদাস। ফলে, বাংলাদেশ প্রতিনিয়ত হারাচ্ছে পর্যটক। তবে, সবচেয়ে বেশি পর্যটক হারাচ্ছে ম্যানগ্রোভখ্যাত সুন্দরবন। বাংলাদেশের রক্ষাকবজখ্যাত সুন্দরবন জীবনই এখন হুমকির মুখে। দুর্বৃত্তরা বন উজাড় করে দখল করার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করছে। বাঘের মতো হিংস্র দুর্লভ প্রাণীও রেহাই পাচ্ছে না। ফি বছর বনে আগুন দিয়ে মাইলকে মাইল পুড়িয়ে দখল করা হচ্ছে। কিন্তু প্রশাসন কিছুই করছে না। অথচ, তারা বলেছেন, সুন্দরবন একদিকে যেমন বাংলাদেশের গর্ব অন্যদিকে বিশ্ব ঐতিহ্য বা ওয়ার্ল্ড হেরিটেজের অংশ। এরপরও প্রতিবছর সুন্দরবনে আগুন লাগছে। বিষয়টি উদ্বেগজনক বৈকি। পরিসংখ্যা অনুযাযী গত বছরে এই বনে অন্তত ২৪ বার আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। এতে বার বার বনভূমি পুড়েছে অন্তত ৬৫ শতাংশ। সবচেয়ে বেশি আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে ধানসাগর স্টেশনসংলগ্ন এলাকায়। গত ১২ বছরে এখানে অন্তত আগুন লেগেছে ১৪ বার, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪৫ একর বনাঞ্চল। স্থানীয়ভাবে মাঠপর্যায়ে এর কারণ অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। চক্রটি শুকনো মৌসুমে বনে আগুন লাগিয়ে প্রশস্ত করে মাছ চাষের পথ। এর পাশাপাশি বনের জায়গা দখল করাও আরেকটি উদ্দেশ্য। কয়েক বছর ধরে এই অপকর্ম চলে এলেও এতদিন বন বিভাগ থেকে কোন ব্যবস্থাই নেয়া হয়নি। এর পাশাপাশি চোরাশিকারিদের বিষটোপ দিয়ে বা ফাঁদ পেতে বাঘ ও হরিণ শিকার তো চলছেই। তাই, জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। অতি বিপন্ন প্রজাতি বলে বাঘ চিহ্নিত সমগ্র বিশ্বেই। সুন্দরবনেই সাকল্যে বাঘ রয়েছে ৩৫০টি। মানুষের হাতে এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন বিপন্ন হচ্ছে দিন দিন। ফলে, হুমকির সম্মুখীন ব্যাঘ্র প্রজাতিসহ জীববৈচিত্র্য। সেই প্রেক্ষাপটে বাঘের সুরক্ষাসহ এর খাদ্যশৃঙ্খল চিতল হরিণ, বুনো শুয়োর ইত্যাদি রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি হয়ে পড়েছে।
সুন্দরবনের সার্বিক সুরক্ষার জন্য আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য ও জরুরি হয়ে পড়েছে। মনে রাখতে হবে যে, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলটি বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সুরক্ষাও বটে। বন না থাকলে একদিকে যেমন বাঘ, চিত্রল হরিণসহ অমূল্য বন্যপ্রাণীর অস্তিত্ব বিপন্ন হবে, অন্যদিকে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসসহ বিবিধ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপন্ন হবে জনপদ ও বসতি। সুন্দরবনের সুরক্ষায় সরকার গৃহীত বিবিধ পদক্ষেপের মধ্যে সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে স্মার্ট প্যাট্রোলিং সিস্টেম, যা মূলত স্পেশিয়াল মনিটরিং অ্যানালাইজিং এ্যান্ড রিপোর্টিং টুল। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে স্মার্ট প্রযুক্তির আওতায় বনজসম্পদ ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সুন্দরবনকে চারটি রেঞ্জে ভাগ করা হয়েছে। এতে ব্যবহৃত হবে প্যাথেরা নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রস্তুতকৃত অত্যাধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থা। প্রতি রেঞ্জের জন্য গঠিত ৩টি দল পর্যায়ক্রমে প্রয়োজনীয় জনবল, যানবাহন ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা নিয়ে নিয়মিত বনের বিভিন্ন অংশ টহল দেবে। টহলকালে বন ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কিত যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ ছাড়াও অপরাধ সম্পর্কিত তথ্যাদিও সংগ্রহ করা হবে। এরপর সংগৃহীত তথ্য-উপাত্ত খুলনায় অবস্থিত জিআইএস ল্যাবে প্রক্রিয়াজাত ও বিশ্লেষণ করে নেয়া হবে যথাযথ ব্যবস্থা। এর ভিত্তিতে প্রতিমাসে হাল নাগাদ করা হবে সুন্দরবন সম্পর্কিত হালনাগাদ প্রতিবেদন। আমরা মনে করি, দেশের অন্যান্য বনাঞ্চলের সুরক্ষাসহ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং সকল পর্যটন কেন্দ্র সংরক্ষণে অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। এর পাশাপাশি সুন্দরবনসহ সব বনাঞ্চল পাহাড়, নদী, টিলায় পর্যটকদের জন্য গড়ে তুলতে হবে পরিবেশবান্ধব পর্যটন কেন্দ্র। নিশ্চিত হরতে হবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

ভাগ