ভয় পেয়ো না দিল্লি, সামনেই আলো!

সৈয়দ আবদাল আহমদ
দিল্লি বিশ্বসভ্যতায় এক গুরুত্বপূর্ণ নগরী। খুশবন্ত সিংয়ের এক উপন্যাসের নাম ‘দিল্লি’। মির্জা গালিব তার কবিতায় বলেছেন, ‘পৃথিবী যদি হয় শরীর, দিল্লি তার প্রাণ।’ অর্থাৎ প্রাণের নগরী দিল্লি। গালিব হয়তো একটু বেশিই আবেগ তাড়িত হয়েছেন, দিল্লিকে ‘পৃথিবীর প্রাণ’ বলেছেন। প্রাণ হোক বা না-ই হোক, এটা ঠিক ইতিহাস-ঐতিহ্যের এক অনন্য নগরী দিল্লি। পৃথিবীর প্রাচীনতম নগরীর অন্যতম দিল্লি। সুলতানি, আফগান, তুর্কি, মুঘল, ইংরেজসহ বহু আমল পার করেছে দিল্লি। ১১৯২ সালে পৃথ্বিরাজ চৌহানকে পরাস্ত করে মোহাম্মদ ঘোরির সেনাপতি কুতুবউদ্দিন আইবাক দিল্লি দখলে নিয়েছিলেন। সেই থেকে দিল্লি মুসলিম শাসনের অধীনে ছিল প্রায় ৬০০ বছর। খ্রিষ্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দী থেকে দিল্লি নিরবচ্ছিন্নভাবে একটি জনবসতি অঞ্চল হিসেবে পরিচিত।
দিল্লি ছিল বিভিন্ন রাজ্য ও সাম্রাজ্যের রাজধানী। এই নগরী শত্রু কর্তৃক অধিকৃত, লুণ্ঠিত ও পুনর্নির্মিত হয়েছে বহুবার। দিল্লি নামকরণ কিভাবে তা নিয়েও আছে বহু কিংবদন্তি। ধিল্লু বা দিলু নামে নাকি এক রাজা ছিল, তার নামেই হয় নাম ‘দিল্লি’। কোনো কোনো পণ্ডিতের মতে, হিন্দি বা প্রাকৃত ‘ঢিলি’ (আলগা) শব্দ থেকেই দিল্লির নামের উৎপত্তি। তোমর’রা এই নাম ব্যবহার করত। ওদের রাজত্বকালে এ অঞ্চলে যে মুদ্রা প্রচলিত হয়েছিল তার নাম ছিল ‘দেহলিওয়াল’। ভবিষ্যপুরাণ অনুসারে ইন্দ্রপ্রস্থের রাজা পৃথ্বিরাজ অধুনা পুরানা কিল্লা অঞ্চলে তার রাজ্যের চার বর্ণের একটি দুর্গ নির্মাণ করেছিলেন। তিনি দুর্গের একটি সিংহদ্বার নির্মাণের আদেশ দেন এবং দুর্গের নাম দেন ‘দেহলি’। কোনো কোনো ইতিহাসবিদ মনে করেন দিল্লি নামটি উর্দু ‘দেহলিজ’ বা ‘দেহলি’ শব্দের অপভ্রংশ। এর অর্থ প্রবেশপথ বা দরজা। দিল্লি শহরটি গাঙ্গেয় সমভূমি অঞ্চলের প্রবেশপথ। দিল্লি নাম তারই প্রতীক। আরেকটি তত্ত্ব হলো, এই নগরীর আদি নাম ছিল ‘ধিল্লিকা’। নগরীর আদিবাসীকে বলা হয় ‘দিল্লিবাসী’ বা ‘দিল্লিওয়ালা’। বিভিন্ন বাগধারায়ও এর নাম পাওয়া যায়। ‘দিলওয়ালোঁ শেহর’ অর্থাৎ দিল্লি উদারমনস্ক বা সাহসীদের শহর। আভি দিল্লি দূর হ্যায় যার ফারসি পাঠান্তর ‘হানৌজ দিল্লি দূর অস্ত’ অর্থাৎ দিল্লি এখনো দূরে। আর ‘দিল্লিকা লাড্ডু’ তো বহুল ব্যবহৃত।
১৮৫৮ সালে দিল্লি শহরটি ইংরেজদের প্রত্যক্ষ শাসনে আসে। ১৯১১ সালে রাজধানী কলকাতা থেকে দিল্লিতে স্থানান্তরের ঘোষণা দেয়া হয়। রাজা পঞ্চম জর্জের দরবার এই ঘোষণা দেয়। ১৯২৭ সালে ‘নতুন দিল্লি’ বা নয়াদিল্লি নামটি দেয়া হয়েছে। ১৯৯১ সালে সংবিধানের ৬৯তম সংশোধনীতে দিল্লি ভারতের জাতীয় রাজধানী অঞ্চল হিসেবে পরিচিত হলো। সেই জৌলুসের নগরী, মহাপরাক্রমশালী নগরী, ইতিহাস, ঐতিহ্যের নগরী দিল্লি আজ মুমূর্ষু। নগরীর সব কোলাহল থেমে গেছে। অতিক্ষুদ্র অদৃশ্য করোনাভাইরাস বিপর্যস্ত করে দিয়েছে এই নগরীকে। দিল্লি এখন এক মৃত্যুপুরীর নাম। মৃত্যুপুরীর নীরবতার মাঝে অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনের আওয়াজ শহর বাসিন্দাদের উদ্বেগ আরো বাড়িয়ে চলেছে। দিল্লির হাসপাতালগুলোতে করোনা-ভাইরাসে আক্রান্ত রোগী উপচে পড়ছে। এক বেডে দুই রোগী রেখেও পরিস্থিতি সামাল দেয়া যাচ্ছে না। মৃত্যুর মিছিল বেড়েই চলেছে। লাশের স্তূপ ভয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। বিবিসি, সিএনএন, রয়টার্স, এএফপির রিপোর্টের বর্ণনায় আসছে এসব খবর। বলা হচ্ছে কোভিড আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিন শত শত মানুষের মৃত্যুতে দিল্লি আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। ধাই ধাই করে বাড়ছে করোনা সংক্রমণ।
হাসপাতালে জায়গা পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ভয়াবহ সঙ্কট চলছে অক্সিজেন ও প্রাণ রক্ষাকারী ওষুধের। নগরীর শ্মশানগুলো, কবরস্থানগুলোতে লাশের স্তূপ। দিল্লির একটি হাসপাতালেই অক্সিজেন সঙ্কটে ২৫ জন রোগী মারা গেছে। দিল্লি শহরে সারি সারি চিতা জ্বলছে দিনরাত। কখনোই নিভছে না। অবস্থা এতটাই নাজুক যে, মাঠ, পার্ক ও গাড়ি পার্কিংয়ের জায়গায় অস্থায়ী শ্মশান বসিয়ে চিতা জ্বালানো হচ্ছে, শবদাহ করা হচ্ছে। বিবিসি সংবাদদাতা জুবায়ের আহমদ নগরী ঘুরে এসে রিপোর্টে বলেছেন, জীবনে এক সাথে এত চিতা জ্বলতে দেখিনি। তিনটি শ্মশানে গিয়ে ১০০ চিতা জ্বলতে দেখেছি ২৪ ঘণ্টায়। যেখানে ৮-১০টি শবদেহ পোড়ানোর ক্ষমতা, সেখানে ৪০-৫০টি শব পোড়ানো হচ্ছে। চার দিকে শ্মশানের ছাই উড়ছে। অন্যদিকে চিতা জ্বালানোর কাঠ বা লাকড়িরও সঙ্কট দেখা দিয়েছে। একটি শবদাহ করতে ৩০০ কেজি কাঠ লাগে। এত কাঠইবা কে জোগাবে? অক্সিজেন নিয়ে শহরজুড়েই হাহাকার। করোনার ওষুধ রেমডেসিভির ইনজেকশন কালোবাজারে লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ওষুধটি এখন বাংলাদেশ থেকে সরবরাহের প্রস্তুতি চলছে। কারণ বাংলাদেশের আটটি ওষুধ কোম্পানি রেমডেসিভির উৎপাদন করছে। দিল্লি, বিশেষ করে করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ে ভারতের এই বেহালদশার জন্য দেশটির নাগরিকরা মোদি সরকারের গাফিলতি এবং উদাসীনতাকে দায়ী করছে। তারা বলছেন, প্রধানমন্ত্রী বা মুখ্যমন্ত্রী কিছুই করতে পারছেন না। শুধু ‘মান কি বাত’ করতে পারবেন। এই চিত্র শুধু দিল্লির নয়। মহারাষ্ট্রের অবস্থাও এমন করুণ। পুরো ভারতজুড়েই বেহাল অবস্থা। শনিবার ২৪ ঘণ্টায় করোনা সংক্রমণ ভারতে চার লক্ষ পেরিয়ে গেছে। একদিনে এটা নতুন রেকর্ড। শুধু ভারতেই নয়, গোটা বিশ্বে এই প্রথম কোনো একটি দেশে আক্রান্তের সংখ্যা এক দিনে চার লাখ ছাড়াল। মৃত্যুও সাড়ে তিন হাজার, একদিনে যা রেকর্ড। বলা যায়, করোনা আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে ভারতে। টানা নয় দিন তিন লাখ করে দৈনিক আক্রান্তের সংখ্যা ৯ দিনের মাথায় গিয়ে ১ মে দাঁড়ায় চার লাখ এক হাজার ৯৯৩ জন এবং মৃত্যু তিন হাজার ৫২৩ জন। এটা একদিনে এ রোগে আক্রান্তের নতুন রেকর্ড।
ভারতের কেন এ অবস্থা হলো? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, করোনার অতি সংক্রামক ধরন যা ‘ভারত ভ্যারিয়েন্ট’ হিসেবে পরিচিত পেয়েছে সেটা একটা কারণ। তার সঙ্গে সরকারের গাফিলতি যোগ হয়েছে। এরই মধ্যে উত্তরাখণ্ডের হরিদ্বারে ধর্মীয় উৎসব কুম্ভমেলায় লাখ লাখ মানুষের জমায়েত হয়েছে। আসাম, পশ্চিমবঙ্গসহ পাঁচটি রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বড় বড় জনসভা করেছেন। এ ছাড়া কম টিকাদানও এর কারণ। এ অবস্থায় মানুষ এখন টিকা নিতে হুমড়ি খেয়ে পড়েছে। অনলাইন নিবন্ধনে এক মিনিটে ২৭ লাখ হিট পড়েছে। দিল্লির যে অবস্থা, এক বছর আগে নিউ ইয়র্ক শহরেরও ছিল একই অবস্থা। গত বছরের মার্চ থেকে মে পর্যন্ত নিউ ইয়র্কও ছিল করোনাভাইরাসে সংক্রমণে এক মৃত্যুপুরী। এর আগে ইতালি, স্পেন, লন্ডন এবং প্যারিসেও একই অবস্থা দেখা গেছে। দিল্লি, বিশেষ করে ভারতের এই সঙ্কটে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, সৌদি আরব, পাকিস্তান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ কয়েকটি দেশ এগিয়ে এসেছে। ভেন্টিলেটর, কনসেনট্রেটর, অক্সিজেন জেনারেটর, তরল অক্সিজেন, অ্যাম্বুলেন্সসহ জরুরি চিকিৎসাসরঞ্জাম পাঠাচ্ছে এসব দেশ। সৌদি আরব ৮০ টন তরল অক্সিজেন পাঠিয়েছে ভারতে। ফ্রান্স যে অক্সিজেন জেনারেটর পাঠিয়েছে তা দিয়ে এক বছর পর্যন্ত প্রতিদিন আড়াই শ’ শয্যার অক্সিজেন সরবরাহ করা যাবে। যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করেছে, তারা অ্যাস্ট্রাজেনেকার ছয় কোটি ডোজ টিকা আক্রান্ত দেশকে প্রদান করবে।
করোনাভাইরাস মহামারীর ক্ষেত্রে এখন ভারত এবং ব্রাজিলই সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে। ভারতে ভাইরাসটির যে ‘ভারত ভ্যারিয়েন্ট’ তা দু’বার মিউটেড করা বা পরিবর্তিত ধরন। এটি অতি সংক্রামক। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, এটি যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে। প্রতিবেশী বাংলাদেশ সীমান্ত বন্ধ করলেও ‘ভারত ভ্যারিয়েন্ট’ আটকাতে পারবে বলে মনে হয় না। শুক্রবার পর্যন্ত করোনাভাইরাসে বিশ্বে সংক্রমণের সংখ্যা ১৫ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। মৃত্যু প্রায় ৩২ লাখ। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশ যুক্তরাষ্ট্র। সেখানে মৃত্যু প্রায় ছয় লাখ এবং সংক্রমণ তিন কোটি ৩০ লাখ। এর পরেই ভারত ও ব্রাজিল। ভারতে সংক্রমণ প্রতিদিনই রেকর্ড হচ্ছে। ইতোমধ্যে করোনায় মৃত্যু দুই লাখ ছাড়িয়েছে। অবশ্য ব্রাজিলে ভারতের চেয়ে সংক্রমণ কম হলেও মৃত্যু দ্বিগুণ হয়েছে, চার লাখ!
দুঃসময় কেটে যাবে!
করোনা মহামারীর ভয়াবহ পরিস্থিতির যখন এ অবস্থা ভারত ও ব্রাজিলে, তখন মার্কিন গণমাধ্যম সিএনবিসি একটি আশা জাগানিয়া খবর দিয়েছে। খবরটি হচ্ছে, করোনার ভ্যাকসিন বা টিকার পর এবার করোনার ওষুধ আবিষ্কার হচ্ছে। মার্কিন ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি ফাইজারের সিইও আলবার্ট বোরলা সিএনবিসিতে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, টিকা আনার পর তার কোম্পানি করোনা প্রতিরোধে ‘অ্যান্টি-ভাইরাল’ ওষুধ নিয়ে কাজ করছে। একটি মুখের ওষুধ, অন্যটি ইনজেকশন। আগামী বছর বা এ বছরের শেষ নাগাদ ওষুধটি বাজারে ছাড়া হবে প্রয়োজনীয় ট্রায়াল ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর। করোনার এখন পর্যন্ত কোনো ওষুধ নেই। অন্য রোগের ওষুধ রেমডেসিভির করোনা চিকিৎসায় কিছুটা কাজ দেয়। এজন্য মার্কিন ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন এফডিএ অনুমোদন দেয়। ফলে দেশে দেশে ওষুধটি তৈরি হচ্ছে। ওষুধটি মার্কিন গিলিয়েড কোম্পানির। ফাইজারের ওষুধটি বাজারে এলে তা হবে করোনা সারানোর একমাত্র ওষুধ। ফাইজার মুখে সেবনের এই ওষুধের দিকেই বেশি মনোনিবেশ করছে বলে জানিয়েছেন সিইও। উল্লেখ্য, এখন পর্যন্ত ফাইজার-বায়োএনটেকের তৈরি করা করোনার টিকাই সবচেয়ে ভালো অর্থাৎ ৯৫ শতাংশ কার্যকর টিকা হিসেবে বিবেচিত। এ ছাড়া আরো বেশ কয়েকটি টিকা বাজারে এসেছে। দেশে দেশে টিকা উদ্ভাবন এবং উৎপাদনও শুরু হচ্ছে। তাই অসহায় দিল্লিকে বলছি, ভয় পেয়ো না দিল্লি। সামনে আশার আলো। টিকাদান এবং ওষুধ প্রয়োগে করোনা মহামারীর অবসান হবেই।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক, সাবেক সাধারণ সম্পাদক জাতীয় প্রেস ক্লাব

ভাগ