সময়ের এক ফোঁড় : সব ধান ঘরে তুলতে হবে

0
আমিরুল আলম খান
কথায় বলে, ‘সময়ের এক ফোঁড়, অসময়ের দশ’। করোনা (কোভিড-১৯) মোকাবেলায় দুনিয়ার উন্নত দেশগুলো এক সাথে এমন সিদ্ধান্তহীনতায় কেন? এমন সংকট আগে কখনো হয়েছে কি না তা আমার জানা নেই। কিন্তু বহু দেশ আবার দ্রæত সিদ্ধান্ত নিয়ে সত্যিই ভাল ফল পেয়েছে। খুব সংক্ষেপে কিছু আলোচনা করে আমরা আমাদের দেশের কিছু বিষয় নিয়ে কথা বলতে চাই।
চীন কিন্তু খুব দ্রæত কয়েক দিনের মধ্যে তারা এ ভাইরাসের সিনোম সিকোয়েন্স বের করে ফেলে এবং বিশ^ স্বাস্থ্য সংস্থাসহ দুনিয়ার বিজ্ঞানীদের সাহায্য চায়। কাজটি চীন দ্রæত করতে পারলেও সারা দুনিয়া বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্টসহ ইউরোপ কড়া সমালোচনা করতে শুরু করে। সে ধারা এখনও চলছে। চীনের পড়শি কিছু দেশে তা সংক্রমিত হলেও তারা দ্রæত ব্যবস্থা নিয়ে তা মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে আনে। চীনের পাশের দেশ হংকং, মেকাও, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, ভুটান, নেপাল, মঙ্গোলিয়া, জর্জিয়াসহ মধ্য এশিয়ার দেশগুলির সময়মত সিদ্ধান্ত সুফল দিয়েছে।
ব্যবস্থাগুলো হলো ব্যাপক সংখ্যায় পরীক্ষা, বিদেশাগতদের এয়ারপোর্টে, সীমান্তে জ¦র মাপা, রেকর্ড রাখা, দরকারে ঘরবন্দি রাখা বা থাকতে বলা, নজরদারি রাখা। হাসপাতালগুলো প্রস্তুত রাখা ও নতুন ব্যবস্থাপনায় নিয়ে আসা, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রস্তুত রাখা, প্রয়োজনীয় প্রটেক্টিভ গিয়ার, অক্সিজেন, ভেন্টিলেটর ইত্যাদি সরবরাহ করে স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা ইত্যাদি। এবং দ্রæত দেশকে বাইরের দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। চীনের পর হঠাৎ ইরানে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে মারাত্মক আকারে। পরপরই ইউরোপের কয়েকটি খুব উন্নত দেশে। সুইজারল্যান্ড, বেলজিয়াম, ব্রিটেন, ইতালী, ফ্রান্স, স্পেন, নেদারল্যান্ড, জার্মান, নরওয়ে বা সুইডেনে এর প্রাদুর্ভাব হয়ত অস্বাভাবিক ছিল না। কেননা, কোভিড ভীষণ ছোঁয়াছে। বিশ^ায়নের কালে তাই এ ভাইরাসের অতি দ্রæত বিশ^ব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে সে সতর্কবার্তা বারবার ঘোষণা করে যাচ্ছিল বিশ^ স্বাস্থ্য ও বিজ্ঞানীরা। কিন্তু কেন ইউরোপ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারল না? ইউরোপের প্রধান প্রধান উন্নত দেশগুলির ব্যর্থতা কিছুতেই মেনে নেওয়া যায় না। সবার উপর ট্রাম্প মেরেছেন আমেরিকান বর্ণবাদী প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহেব। করোনা নিয়ন্ত্রণে বিশ^ব্যাপী এখন বিস্ময় দেশগুলির তালিকার শীর্ষে হংকং, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ কোরিয়া। আর শুধু নিজের দেশেই নয়, বিশ^ব্যাপী করোনা লড়াইয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে বিস্ময় সৃষ্টি করেছে কিউবা। সাথে আরও কয়েকটি দেশের নাম নিশ্চয়ই বলতে হবে। চীন, ভিয়েতনাম, ভেনিজুয়েলা, কম্বোডিয়া। সে কথা আজ থাক। আজ দেশের কথা বলি। গোটা দুনিয়ায় এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে মৃত্যুর হার সবচেয়ে বেশি। সে হার ১১৩%। ভয়ের কারণ সেখানেই।
বাংলাদেশে প্রথম কোভিড-১৯ রোগী সন্ধান মেলে ৭ মার্চ। চীনে এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের পর ঠিক ৬৭ দিন পর। কিন্তু কোন কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলার তাগিদ অনুভব করে নি কর্তৃপক্ষ। আমাদের অর্থনীতি মূলত তিন পায়ে দাড়ায়ে। তার প্রধান পা হলো কৃষি। দেশের অর্থনীতিতে কৃষির অবদান এখনো প্রায় ৭০ ভাগ। বাকি ৩০ ভাগ প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স আর গার্মেন্টস সেক্টর। মজার বিষয় এই তিন খাতেই মূল উৎপাদক দেশের অতি গরিব কৃষক পরিবারের সন্তানরা। মূলত কৃষক পরিবারই আমাদের অর্থনীতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। তা সে কৃষি, মৎস, সবজি চাষ কিংবা প্রবাসী শ্রমিক বা গার্মেন্টস শ্রমিক যাই হোক না কেন। এই কৃষক পরিবারের এক বড় অংশ দেশের পরিবহণ, ছোট ব্যবসা, ঘর-গৃহাস্থালির কাজে নিয়েজিত। শাস্ত্র এদের সবাইকেই অপ্রাতিষ্ঠানিক শ্রমিক বলে দূরে ঠেলে দিয়েছে। এরাই দেশের মূল উৎপাদক ও সেবা খাতের আসল নায়ক।
তা কেমন আছেন এই কৃষক পরিবার এই করোনাকালে? এক কথায় বলা যায়, তাদের অবস্থা বর্ণনাতীত। তাদের জন্য রাষ্ট্রের উদাসীনতা এখন সাদা চোখেই প্রকট হয়ে উঠেছে। কিন্তু কোন পরিকল্পনার আভাস আমরা পাচ্ছি না।
করোনা লড়াইয়ে আমরা সময়মত চিকিৎসক, নার্স, সহায়তাকারী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মত ফ্রন্ট লাইন যোদ্ধাদের জন্য কোনই সুরক্ষা ব্যবস্থা করি নি। হাসপাতালগুলো নিরাপদ করার উদ্যোগ নিতে ব্যর্থ হয়েছি। বিমান বন্দর, সীমন্তে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করতে ব্যর্থ হয়েছি। সিদ্ধান্তহীনতা, সমন্বয়ের অভাব প্রকট। এখন তার মূল্য দিতে হচ্ছে দেশবাসীকে। এত এত অভিযোগ, এত এত বিশৃঙখলা, এত সমন্বয়ের অভাব আমরা পূর্বে কখনো দেখি নি। মনে হচ্ছে, গোটা প্রশাসন অকার্যকর হয়ে গেছে। এগুলো সময়মত করলে আজ পরিস্থিতি এক নাজুক হত না।
একটা কথা আমাদের মনে রাখতে হবে। করোনায় মৃত্যুর মিছিল একদিন ক্ষীণ হবে; হয়ত একদিন তা দুনিয়া থেকে বিদায়ও করতে পারবে মানুষ। অতীতে বহু রোগের ক্ষেত্রে মানুষ সে সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু তা কতদিনে সম্ভব হবে কেউ জানে না। কিন্তু একটা কথা সবাই বুঝতে পরছে। পৃথিবী এক মহা খাদ্যাভাবের মুখে পড়তে যাচ্ছে। আজই খবরে দেখলাম, আইএলও আশংকা প্রকাশ করছে, পৃথিবীর অর্ধেক জনগোষ্ঠী হয়ত কর্মহীন হয়ে পড়বে। অর্থাৎ পৃথিবী এক মহাদারিদ্র্যের করালগ্রাস পড়বে। কাজ হারানোর সহজ অর্থ রোজগারহীন হওয়া, উৎপাদন কমে যাওয়া। নিট ফল, না খেয়ে মরা।
এই ভয়ংকর পরিস্থিতি না হোক সে প্রার্থনা সবার। কিন্তু যুঁৎসই পরিকল্পনা না নিতে পারলে শুধু সদিচ্ছা কোন ফল দেবে না। এ বছর সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবায়ন করা যাবে সেটা নিয়ে যে শংকা, তার চেয়ে বেশি ভয় আগামি বছর কী হবে? কেননা, এ বছরের আমরা প্রায় শেষে চলে এসেছি। কিন্তু দ্রæত লক ডাউন তুলে নেবার মত পরিস্থিতি তৈরি করতে না পারলে উন্নয়ন পরিকল্পনা পিছিয়ে যাওয়ার চেয়ে বেশি ক্ষতি মানুষের কর্মহীন হয়ে পড়ার ভয়। সব খাতেই বিপুল সংখ্যক মানুষের ভোগ্যপণ্য কেনার পয়সা থাকবে না।
কেউ হয়ত বলবেন, সরকার রিলিফ দেবে। এটা যেমন সাময়িক সমাধান, তেমনি দীর্ঘমেয়াদে তার খারাপ ফল অত্যন্ত মারাত্মক। রিলিফ সাময়িক ব্যবস্থা হতে পারে। সেটা দিতেও হবে। কিন্তু তা না কোন দীর্ঘমেয়াদি, না মধ্য মেয়াদি সমাধান। রিলিফ মানুষকে অলস বানায়। দুর্নীতির প্রসার ঘটায়। তাই আসল কাজ কর্ম সৃষ্টি করা। কাজ দিয়ে মানুষের রোজগার চালু রাখা।
আমাদের দেশ যেহেতু শিল্প ক্ষেত্রে খুব পিছিয়ে তাই আমাদের আসল রোজগারের জায়গা এখনও গ্রাম। অর্থাৎ কৃষি খাতে। কৃষি বলতে শুধু ধানচাষ যেন না বুঝি। কৃষি সংশ্লিষ্ট নানা কাজ। সেটা চালু রাখতে পারলে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের ¯্রােত ঠেকানো সম্ভব হবে। শহরে মানুষের স্রোত ঠেকাতে না পারলে মৃত্যুর হার বেড়ে যাবেই। অতীত রেকর্ড তাই বলে।
মনে রাখতে হবে, রোজগার বাড়লে মানুষের ভোগের ইচ্ছা বাড়ে। কিন্তু রোজগার কমে গেলে ভোগ কমে যাবে। তাই অনেক জিনিসেরই উৎপাদন, বিপণন, ভোগ হোঁচট খাবে। আমরা আশা করব, সরকারের নীতিনির্ধারকগণ বিশেষজ্ঞ পরামর্শ মেনে এই জরুরি কাজগুলো করবেন।
এবার দুনিয়ায় খাদ্যশস্য সরবরাহের প্রধান উৎস হতে পারে এশিয়া। যদি করোনার দ্বিতীয় দফা বিস্তার না হয় তাহলে খাদ্যের জন্য চীনসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়ার দিকে পৃথিবীকে তাকিয়ে থাকতে হবে। আর সে কথা বিবেচনায় রেখেই আমাদের পরিকল্পনা নতুন করে সাজাতে হবে। করোনা মোকাবেলায় ভিয়েতনাম, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া আমাদের আশা জাগায়। মায়ানমারের খবর আমরা জানি না বলাই ভালো। আর বেশি খাদ্য উৎপাদনের বড় দেশ ভারত। কে জানে তারা করোনা লড়াইয়ে কতটুকু সফল হবে? ভারত বাংলাদেশের তুলনায় করোনা লড়াইয়ে এগিয়ে থাকলেও বাংলাদেশে ও পাকিস্তানের অবস্থা সত্যিই খারাপ। তবে আশার কথা, এ বছরের ধান উৎপাদনের সময় শেষ এবং আমাদের এখন ফসল তোলার সময়। আগামি শীত মৌসুমে করোনা হানা না দিলে আমরা হয়ত একটা বড় দুর্যোগ এড়াতে পারব। এ কাজটি আমলা-পরামর্শিত পথে সম্ভব হবে না।
বৈশাখ মাস আমাদের প্রধান ফসল ধান তোলার সময়। আগামি ১৫-২০ দিনের মধ্যে সব ধান তুলে শেষ করতে হবে। কীভাবে তা করা সম্ভব? এ বিষয়ে সরকারে কোন পরিকল্পনা আছে তা জানা যায় নি। আমি মনে করি, মাঠ থেকে সকল ধান তোলার কাজে সরকারের সকল শক্তি নিয়োজিত করতে হবে এখনই। একদিনও নষ্ট করার সময় নেই। জেলা, উপজেলার সংশ্লিষ্ট সরকারি কমকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সমাজের সকল দল ও মতের মানুষকে আস্থায় এনে একযোগে মাঠের ধান তুলতে হবে। ফসল তোলার এ কাজে কৃষকের পাশাপাশি ছাত্র, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী সকলেই একযোগে কাজ করবেন। প্রত্যেককে তার পরিবারের চাহিদা অনুযায়ী মুজুরি/সম্মানি দিতে হবে। কৃষক তার ধান পাবেন। উদ্বৃত্ত ধান সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কিনে সরকার গুদাম ভরবে। মূল্য পরিশোধ করা হবে মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে। কোন ফড়িয়া, টাউট, দলীয় রাজনৈতিক ট্যান্ডেল যেন এই মধ্যে ঢুকতে না পারে তা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আর এই সামগ্রিক কাজ মাঠ পর্যায়ে তদারকি করবে সেনাবাহিনী।
আন কাটা, তোলা, ঝাড়াই প্রতি পর্বে স্বাস্থ্য ঝুঁকি যাতে এড়িয়ে চলা যায় তা নিশ্চিত করতে হবে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা, গ্রামীণ চিকিৎসকদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে হবে। প্রচলিত ভাবে ধান না কেটে আতর ফাঁকা রেখে হাল চাষ করার মত করে অথবা জমির চার দিক থেকে দূরত্ব বজায় রেখে ধান কাটা যায়।
মনে রাখতে হবে পৃথিবীব্যাপী আগামি বছর কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে কমে যাবে। উত্তর গোলার্ধের দেশগুলো শীতের। এর মধ্যে উদ্বৃত্ত খাদ্য শস্য যে সব দেশ উৎপাদন ও বিশ^ব্যাপী বিক্রি করে তারা শ্রমিকের অভাবে সে উৎপাদন করতে পারবে না। সে সব দেশে এখন গরম কাল। ফসল ফলানোর মৌসুম শুরু হচ্ছে। তারা সাময়িক ভাবে শ্রমিক আনে অপেক্ষাকৃত গরিব দেশ থেকে। লকডাউনের কারণে কবে তা শুরু হবে কেউ জানে না। ততদিনে গরমকাল চলে গেলে সে সব দেশ এ বছর ফসল ফলাতে পারবে না। তাছাড়া দুনিয়া জুড়ে গোটা সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ইচ্ছে করলেই তা কালই চালু করা যাবে না, কোন দেশই তা পারবে না।
আমিরুল আলম খান, যশোর শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান
amirulkhan5252@gmail.com