প্রধানমন্ত্রী, তিন ফসলি জমি রক্ষা করুন

তৈমূর আলম খন্দকার
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আপনি প্রায়ই বলে থাকেন, তিন ফসলি জমি ভরাট করা যাবে না, খাল-বিল, নদী-নালা ভরাট করা যাবে না, পরিবেশ নষ্ট করা যাবে না, অপরিকল্পিতভাবে কোনো শিল্প কলকারখানা বা আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা যাবে না। জমি ব্যবহারে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।’ কিন্তু ভূমিদস্যুরা এতই প্রভাবশালী যে, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের কোনো প্রকার তোয়াক্কা না করেই রাজধানীর আশপাশে বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় বিভিন্ন আবাসন প্রকল্পের নামে তিন ফসলি জমি, খাল-বিল, পুকুর, নদী-নালা ভরাট করে ফেলছে। রূপগঞ্জ এলাকায় সবচেয়ে বেশি জমি বালু দিয়ে ভরাট করেছে একটি বৃহৎ গ্রুপ। এ গ্রুপ রূপগঞ্জে তিন ফসলি জমি ভরাট করে আবাসন করার জন্য সরকার বা পরিবেশ অধিদফতর থেকে কোনো অনুমতি গ্রহণ করেনি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, রূপগঞ্জে এখন আর ধান, সবজি ও মাছের চাষ করা যাচ্ছে না, এখন শুধু হচ্ছে ‘বালুর চাষ’। আলোচ্য গ্রুপ নিজেই অনেকগুলো পত্রিকার মালিক। কেউ এই বালু ভরাটের প্রতিবাদ করলে তাদের মালিকানাধীন পত্রিকাগুলোতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির চরিত্র হরণ করে সিরিজ আকারে বানোয়াট রিপোর্ট প্রকাশ করতে থাকে। এ কারণে অবৈধ হলেও বালু ভরাটের বিরুদ্ধে মানুষ ভয়ে কথা বলতে চায় না। রূপগঞ্জের কায়েতপাড়া ইউনিয়নের বালু ভরাটের কার্যক্রম শুরু করার জন্য ৭০টি ড্রেজার বসানো হয়েছে বলে এলাকাবাসী অভিযোগ করেছেন। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা এই বালু ভরাটের বিরুদ্ধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করছেন না। বর্তমানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার বলিষ্ঠ হস্তক্ষেপ ছাড়া তিন ফসলি জমি, খাল-বিল, পুকুর, নদী-নালা ভরাট বন্ধ করা যাবে না।
ভূমিদস্যুরা এতই শক্তিশালী যে, তারা হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞাও মান্য করছে না। অবৈধ ভরাটের বিষয়ে হাইকোর্টে কয়েকটি রিট পিটিশনে নিষেধাজ্ঞা দিলেও তা কার্যকর হয়নি। সাধারণ কৃষকরা এখন অসহায়ত্বের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিজেদের কৃষিজমি বালু দিয়ে ভরাট হয়ে যাচ্ছে, তবুও মানববন্ধন ও জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি দেয়া ছাড়া অসহায় কৃষকরা অন্য কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। সংশ্লিষ্ট কেউ বা জেলা প্রশাসক এ বালু ভরাটের বিরুদ্ধে কৃষকদের পাশে দাঁড়াচ্ছেন না। অসহায় কৃষকরা এখন আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। রাজধানীকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য চারপাশে একটি সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার জন্য সরকার পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। ধান, শাকসবজি উৎপাদনের জন্য রূপগঞ্জ একটি পলিমাটি উর্বর এলাকা। দু’টি নদী শীতলক্ষ্যা ও বালু দ্বারা বেষ্টিত হওয়ায় রূপগঞ্জের মাটি অনেক উর্বর বিধায় তিন ফসলি চাষাবাদের জন্য খুবই উপযোগী। কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থে রূপগঞ্জকে এখন শ্মশানে পরিণত করা হচ্ছে, যা থেকে একমাত্র আপনি উদ্ধার করতে পারেন। আপনি যদি সদয় হয়ে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত টিম রূপগঞ্জে পাঠান, তবেই এর সত্যতা খুঁজে পাবেন। অনেকে তাদের মালিকানাধীন মিডিয়াকে একটি অপশক্তি হিসেবে ব্যবহার করছে, এটিও আপনার দৃষ্টিতে থাকা একান্ত বাঞ্ছনীয়। তিন ফসলি জমি ধ্বংস করে অপরিকল্পিতভাবে যে আবাসন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে তাতে কিন্তু জনগণ লাভবান হচ্ছে না। কারণ রাজধানীতে অনেক বড় বড় অট্টালিকা গড়ে উঠেছে যেখানে পানি ও গ্যাস সংযোগ দেয়া যাচ্ছে না। রাজধানী এবং আশপাশে ভাড়াবিহীন অনেক ফ্লাট পড়ে আছে। এমতাবস্থায় আবাসন প্রকল্পের নামে তিন ফসলি জমি ধ্বংস করা একটি বাতুলতা মাত্র। রূপগঞ্জে সরকারি উদ্যোগে পূর্বাচল শহর গড়ে উঠেছে, সেখানে এখনো পর্যাপ্ত ইমারত গড়ে উঠেনি। রাজউক কর্তৃক উত্তরায় অনেক প্লট বরাদ্দ দেয়া হলেও সেখানে আবাসন প্রকল্প গড়ে উঠেনি এবং আগামী ২০ বছরেও উত্তরাতে আবাসিক এলাকা গড়ে উঠবে কি না তাতে সন্দেহ রয়েছে। সেখানে অনেকে সবজি চাষ করছেন, বাকি প্লটগুলো কাশবনে পরিপূর্ণ। এমতাবস্থায় উল্লিখিত আবাসন প্রকল্পগুলো যেখানে চাহিদা পূরণ করার পরও খালি পড়ে আছে সেখানে তিন ফসলি জমি ধ্বংস করে রূপগঞ্জে এত আবাসন প্রকল্প স্থাপনের যৌক্তিকতা কোথায়?
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে সুবর্ণজয়ন্তী পালন করার জন্য দল মত নির্বিশেষে জাতি ও আপনি উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। ইতঃপূর্বে পাকিস্তানের ২২ পরিবার তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানকে শোষণ করত। সে স্থলে ২২ হাজার শোষক গোষ্ঠী সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সাধারণ মানুষ এখন পর্যন্ত স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে পারছে না। বাংলাদেশে লাভের গুড় এখন পিপড়ায় খায়। শোষকদের বিরুদ্ধে নালিশ করার কোথাও কোনো জায়গা নেই। কারণ দৃশ্যত মনে হচ্ছে- রাষ্ট্রটি যেন কারো কারো পকেটস্থ হয়ে পড়েছে। তাদের মুখের কথাই যেন আইন এবং তাদের বাধ্যগত অহেতুক পরিণত হওয়াটাই যেন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের একমাত্র কামনা ও বাসনা। রাজনীতি ও জাতীয় স্বার্থে ঐকমত্য একটি অপরটির সম্পূরক। কৃষকদের স্বার্থরক্ষা জাতীয় ঐক্যের সাথে সম্পৃক্ত। ‘কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে’ এটি নতুন কোনো স্লোগান নয়। রাষ্ট্রক্ষমতায় যারা বসেছেন, তারা সবাই এ স্লোগানের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু বর্তমানে কৃষকরাই সবচেয়ে অবহেলিত। জমি কৃষকের; অথচ আবাসন প্রকল্প করার জন্য ভরাট করে ফেলে অন্যরা, একটা দেশে এটা কেমন আইন? কৃষক থেকে ন্যায্যমূল্যে জমি কিনবে না, তাকে ন্যায্যমূল্য দেবে না, অথচ ভরাট করে ফেলছে, প্রতিবাদ করলে লাঞ্ছনা বঞ্চনার শেষ নেই, হয় তাকে পুলিশ দিয়ে হয়রানি করবে, নতুবা দুর্বৃত্ত লেলিয়ে দেবে অথবা মিথ্যা সংবাদ প্রচার করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মান ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করবে, টানাটানি করবে প্রতিবাদকারীর ব্যক্তি জীবন নিয়ে। কোথাও গুম করার হুমকি, কোথাও খুন করার হুমকি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি নিশ্চয়ই জানেন, সংবিধানের ৪২(১) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে- ‘আইনের দ্বারা আরোপিত বাধা-নিষেধ সাপেক্ষে প্রত্যেক নাগরিকের সম্পত্তি অর্জন, ধারণ, হস্তান্তর ও অন্যভাবে বিলি ব্যবস্থা করিবার অধিকার থাকিবে এবং আইনের কর্তৃত্ব ব্যতীত কোনো সম্পত্তি বাধ্যতামূলকভাবে গ্রহণ, রাষ্ট্রায়ত্ত বা দখল করা যাইবে না।’
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি সংবিধান সমুন্নত রাখার শপথবাক্য পাঠ করেছেন। অথচ সংবিধানের ৪২(১) অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে রূপগঞ্জে সাধারণ নিরীহ জনগণের জমি দখল হয়ে যাচ্ছে এ মর্মে কি আপনার কোনো কিছু করণীয় নেই? এ জিম্মিদশা থেকে কৃষকদের তিন ফসলি জমি উদ্ধার করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করার কি প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না? জমির ঈযধৎধপঃবৎ পরিবর্তন করতে হলে আইনত জেলা প্রশাসনের অনুমতি লাগে। ইটভাটা করার জন্য জেলা প্রশাসকের অনুমতি লাগবে। কিন্তু তিন ফসলি জমি ভরাট করে জমির ঈযধৎধপঃবৎ পরিবর্তন করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়াই আবাসিক এলাকায় ইটভাটা গড়ে উঠছে। অথচ জেলা প্রশাসক এ মর্মে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন। এটা কিসের আলামত? দেশে অনেক বুদ্ধিজীবী রয়েছেন যারা টকশোতে অনেক কথা বলেন; অনেক সাংবাদিক রয়েছেন যারা নিজেদের ‘জাতির বিবেক’ হিসেবে দাবি করেন, কিন্তু তারা কেউই ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে দু’টি কথা বলেন না, কলমও ধরেন না। এটা কিসের আলামত? দেশে যখন অবিচার-অনাচারের বিরুদ্ধে মানুষ কথা বলার সাহস হারিয়ে ফেলে, তখন মানুষ সাংবাদিকদের কাছে আশ্রয় খোঁজে। ভুক্তভোগী এলাকা রূপগঞ্জে দু’টি প্রেস ক্লাব রয়েছে বলে জেনেছি। ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ওই সাংবাদিকদের ‘কলম’ উঠে না এটা কিসের আলামত? মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন হওয়া একটি জাতির বিবেক কি এমনিভাবে হারিয়ে যাবে? মহান মুক্তিযুদ্ধ করার এই জাতি কি কারো কারো পকেটস্থ হয়ে যাবে? ‘জোর যার মুল্লুক তার’-এ নীতিতেই যদি দেশ ও জাতি চলতে থাকে আইন-আদালত, প্রশাসন, সংবিধানের কী প্রয়োজনীয়তা রয়েছে? এ ধরনের পরিস্থিতি দেখার জন্যই কি জাতি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল? সবলের পক্ষে এবং দুর্বলের বিপক্ষে দাঁড়ানোই কি ‘বিবেকবানদের সংস্কৃতি হয়ে দাঁড়িয়েছে? অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘বুদ্ধিজীবীরা এখন চামচাগিরিতে ব্যস্ত’। অধ্যাপক আবুল কাশেম ফজলুল হক বলেছেন, ‘এ জাতি তাদের বিবেক হারিয়ে ফেলেছে। মানুষের বিবেক ভোঁতা হয়ে গেছে।’ সবাই এখন অর্থের পেছনে দৌড়ায়। যেখানে অর্থ পাওয়া যায় সেখানে কারো সম্মানহানি করার জন্য লেখকের অভাব হয় না। দুর্বলের পক্ষে কলম ধরার লেখক হারিয়ে যাচ্ছেন কেন? এটা কিসের আলামত, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী?
লেখক : রাজনীতিক, কলামিস্ট ও আইনজীবী (অ্যাপিলেট ডিভিশন)
E-mail: taimuralamkhandaker@gmail.com
ভাগ